মহুয়া, বিয়ের পরে

 এখন মহুয়া চক্রবর্তী। শান্তশিষ্ট। বিয়ে করেছে ছ’মাস আগে। ওর বরের নাম তিলক চক্রবর্তী। স্টুডিওতেও এসেও সে টেলিফোনে অন্তত একবার কথা বলে নেয়। আউটডোরে গেলে ও সঙ্গে যায়। ছুটির দিন শুটিং করে না সিনেমা দেখতে যায়। মান-অভিমান হয় বেশি। ক্ষণিকের। বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারে না। এমন, আঘাত পেলে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে। পান খাওয়ার অভ্যেসটা ছাড়তে পারেনি। দাঁত কালো হয়ে যায় পান খেলে—কত উপদেশ শুনেছে, কান দেয়নি। পান না থাকলে গালে, গিসগিস মনেই হয় না, ও বলে।


আমি বলি, আমার বয়সী সব মেয়েরা, বিয়ে কর। জোক করে দিলীপ কি বলেছে...! সে যা খুশি বলুক, বিয়ের মত ঘটনা নেই জীবনে। যারা বিয়ে করেনি তারা বুঝবে না। যারা করেছে তারা বুঝবে। আমার অভিজ্ঞতা হাড়ে হাড়ে বোঝা। সেরকমভাবে বোঝবার সময় হয়নি। হলে সবাইকে নিশ্চয়ই জানাব।

**বিয়ের পর হানিমুন কোথায় হল?

: গাছের নিচে!

**বিয়ের পর বিশেষ কি খাওয়া হল?

: উঃ, ওটা আমি বলব না। আমি বলব, ঝালমুড়ি।

**বিয়ের পর বিশেষ কি কেনা হল?

: কাঁচের চুরি, রঙ-বেরঙের।

**বিয়ের আগে মন কি চেয়েছে?

: উড়ে বেড়াতে।

**বিয়ের আগে মন কি বলেছে?

: আমি ওকে ভালবাসি।

**বিয়ের আগে মন কি পেয়েছে?

: নির্ভরতা। আত্মবিশ্বাস। নিশ্চয়তা।

এই সময় ইন্দ্রপুরী স্টুডিওর চত্বরে গাছের ছায়ায় তুমি একটু স্থির হয়ে বস। মেক-আপ রুম থেকে কয়েকটি লাফ একলা এসে লেগেছে। একটু পরেই ত তুমি বেহুলা-চলে যাবে লক্ষ্মীন্দরের সন্ধানে। এমনিভাবে প্রতিদিন তুমি এক একটা চরিত্র হয়ে যাও। বাউলিয়া গ্রামে তোমাকে দেখলাম কোমর কাপড় বেঁধে গাছে উঠছ। কি যেন ছবির নাম? ‘প্রতিশ্রুতি’। তোমার নায়ক কে?

**বিয়ের আগে মোট কতগুলি ছবিতে অভিনয় করা হয়েছে?

: অত শত গুণে রাখিনি। মোটামুটি বলতে পারি, চৌদ্দ-পনেরোটা হবে।

**কে কে নায়ক ছিল?

: অনেকে। একাধিক ছবিতে ছিল পার্থ মুখোপাধ্যায়। পার্থর সঙ্গে নাকি একটু ভাব-ভালবাসা হয়েছিল?

: একসঙ্গে কয়েকটি ছবিতে কাজ করলে ওরকম হয়।

**বিয়ের পর মোট কতগুলি ছবিতে অভিনয় করা হয়েছে?

: অনেকগুলি। কুড়িটার বেশী।

**কে কে নায়ক?

: অনেকে। একাধিক ছবিতে সন্তু মুখোপাধ্যায়।

**তাহলে ইমেজ একইরকমই আছে?

: কেন থাকবে না। বিয়ে করলেই ত নায়িকারা বুড়ি হয়ে যায় না।

**বিয়ের আগে জীবনটা কেমনভাবে ভাবা ছিল?

: রেলপথের মত। হুশ হুশ করে চলে যাবে। মাঝে কোন স্টেশন থামবে না। একদম সোজা গন্তব্যে পৌঁছে যাবে।

**সিনেমা নামবার কথা মনে হল কেন?

: সত্যি কথা বলতে কি আমার মনে হয়নি কিছুই। বাবার হাত ধরে স্টুডিওতে আসতাম। ছোটবেলা থেকে নাচ শিক্ষার শখ ছিল। শিখেও ছিলাম। কিন্তু তেমনভাবে কাজে লাগল না। ফাংশনে বহুবার নাচ দেখাবার সুযোগ পেয়েছি। প্রশংসাও পেয়েছি। সিনেমায় নামব কোনদিন কল্পনাও করিনি। বাবা ছবির জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অনেকটা সেই সূত্রেই যোগাযোগ। অন্তত ভেবেচিন্তে নামিনি। আশ্চর্যের পর এটা হবে আরেক আশ্চর্য মোটা-মুটি ধারণা ছিল।

**বিয়ের আগে অভিনয় জীবন গড়ে তোলার কথা মনে হয়নি?

: নিশ্চয়ই মনে হয়েছে। প্রথম ছবিতে কাজ করবার পর অভিনয় সম্পর্কে কিছু জানা হল। সবচেয়ে বড় কথা অভিনয় করব—এটা আমার মনে হয়েছিল। নেহাতই পরদা মুখ দেখাতে এসেছি, ভাবলে হাসি পেত। তাই পরপর কয়েকটি ছবিতে কাজ করবার পর ঠিক করে ফেললাম যাঁর আমাকে অভিনেত্রী হতে হয় তাহলে সাধনা করতে হবে। সিনসিয়ারলি কাজ করতে হবে। অভিনয় সম্পর্কে রীতিমত পড়াশোনা করতে হবে। তা না হলে যশ, গ্ল্যামার নিয়ে টিকে থাকা যায় না—অন্তত ভালো ছবির ক্ষেত্রে।

তখন মহুয়া রায়চৌধুরী। অভিনয়কে মনে প্রাণে ভাল-বেসেছে। তার এক নতুন জীবন শুরু হয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাসে, কাঁদে কিংবা পাগলের মত অঙ্গভঙ্গি করে। জীবনকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখায় আগ্রহ তাকে দিনের পর দিন উদ্দীপিত করে।

এখন মহুয়া চক্রবর্তী। অভিনয় আর ব্যপ্তি জীবন পাশাপাশি রেখে এগিয়ে চলেছে। সিঁড়ির কয়েক ধাপ উঠে এসেছে। সামনে অনেক সিঁড়ি। অনেক রাস্তা। অনেক আলো। থমকে দাঁড়িয়ে থাকতে চায় না। পা ফসকে পড়ে যেতে চায় না। এক লাফে সব সিঁড়ি অতিক্রম করতে ধীরে-স্থিরভাবে এগিয়ে যেতে চায়। এগিয়ে যেতে চায়।

উৎস: একটি ম্যাগাজিন থেকে

মহুয়ার মৃত্যুর পর কয়েকজন চলচ্চিত্র নির্মাতার বক্তব্য

 এখানে মহুয়া রায়চৌধুরী সম্পর্কে কয়েকজন প্রযোজক ও পরিচালকের বক্তব্য রয়েছে:-


মহুয়াকে তাঁর পরপর দুটি ছবিতে ‘হিরোইন’ করেছেন, তিনি আমায় বললেন, ‘দেখুন এসব ডিপ্রেশান-টিপ্রেশানের ব্যাপার নয়। প্রত্যেক আর্টিস্টই এককথায় ডিপ্রেসড, ও কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছিল। একটু শান্তি ও বিশ্রাম চাইছিল।’ টালীগঞ্জের শক্তিমান একজন সেট-মেকার এই প্রসঙ্গে বললেন, ‘মহুয়াকে আমি ওঁর ছোটবেলা থেকে দেখছি। কিন্তু ইদানীং লক্ষ্য করছিলাম, ওকে খুব ডিপ্রেসড মনে হত। ওঁর মুখের দিকে চেয়ে মনে হত ও যেন কাছে থেকেও অনেক দূরে চলে গেছে। কী একটা ফাঁক থেকে বাজিল। যখন অভিনয় করত তখন চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলত, কাজের মধ্যে ডুবে যেত। বাস্তব জীবনের কোথাও যে ওর দ্বন্দ্ব চলছে এটা বোঝা যেত না। কারণ তখন তো ও মহুয়া রায়চৌধুরী নয়, অন্য এক চরিত্র। আর ছোটবেলা থেকে দেখছি বলে, কিছু জিজ্ঞাসাও করতে পারতাম না।’

অপর একজন চলচ্চিত্রকার বললেন, ‘এই ঘটনার দিনকুড়ি কি একমাস আগে টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে জ্যোতিপ্রকাশ রায় ও সুজিত গুহের দুটো ছবির শুটিং ছিল দু শিফটে। কিন্তু মহুয়া এতই অসুস্থ হয়ে পড়েন যে, তাঁকে নিয়ে শুটিং করা সম্ভব হয়নি। এমনকী তাঁকে নার্সিং হোমে ভর্তি করতে হয়। চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত কেউ কেউ বলছেন, এই নার্সিং হোম থেকে ফিরে আসার পরই মহুয়া একটু যেন ‘ডিপ্রেসড’ ছিলেন।

তবে মহুয়ার বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সঙ্গী বলেছেন, ‘মো ডিপ্রেসড ছিলেন অন্য কারণে। বাংলাদেশে উপ্রিলা ছবিতে কাজ করার জন্য মো চুক্তিবদ্ধ ছিল? শুটিং আরম্ভ হবার কথা ছিল ৩ জুলাই থেকে। কিন্তু ১১ জুলাই পর্যন্ত মো বাংলাদেশে যাবার ভিসা পাননি। অথচ ওঁর সেক্রেটারি অসিত দাস, মেক-আপ ম্যান অনুপ (ভুট্টো) গাঙ্গুলী এবং তিলক তিনজনেরই ভিসা হয়ে গেছে, অথচ মো পাননি। স্বভাবতই ওর মনমেজাজ খারাপ থাকবেই।’

মহুয়ার দিদি শান্তা দেবীকেও জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ভিসা না পাওয়ার জন্য মহুয়া খুব ‘ডিপ্রেসড’ ছিলেন কিনা? শান্তা দেবী বলেন, ‘নিশ্চয়ই। কারণ আপনি চিন্তা করে দেখুন, বাংলার ইন্ডাস্ট্রিকে ছেড়ে ও নিজকর বাইরে যাবে না। ১৬ দিনের জন্য বাংলাদেশে ছোট নেওয়া হয়েছে ওর কাছ থেকে। অথচ সে কোন কারণেই হোক ও ভিসা পাচ্ছিল না। সেই কারণে ওর ডিপ্রেসড থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না। আর সবচেয়ে বড় জিনিস সেটা ও খুব ভয় পাচ্ছিল যে ৭ তারিখ হয়ে গেল, কিন্তু ভিসা হাতে এল না। ১৬ দিনের কাজের মধ্যে ৭ দিন চলে গেল। শেষ পর্যন্ত যদি আটকে যায়, যাওয়া না হয়?’

তাই অন্যমনস্কতার জন্যই কি এতবড় ঘটনা ঘটে গেল?

চলচ্চিত্রকার অঞ্জন চৌধুরীকে এই প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করায়, তিনি বললেন, ‘দেখুন বাংলাদেশ বলতে তো আমরা এখনও বিদেশই বুঝি। এখন বিদেশ থেকে কাউকে আমন্ত্রণ জানালে, সবারই তো ইচ্ছে হয় ছবি করি। সেখানে ও একটা সুযোগ পেয়েও যেতে পারছে না। স্বাভাবিকভাবেই খারাপ লাগে, তার দোষটা কখন তার নয়। আমি তাই মহুয়াকে বলেছিলাম তোর এতে পড়ার কি আছে? তুই এতে পড়ছিস কেন? যেখানে তুই আছিস, সেখানে তুই টপ। নাইবা গেলি বিদেশে। 

মহুয়া রায়চৌধুরীকে নিয়ে তাপস পালের শেষ বক্তব্য

নিজের মৃত্যুর 2 বছর আগে, তাপস পাল হঠাৎ একটি সংবাদপত্রের সাথে যোগাযোগ করেন এবং তার প্রিয় অভিনেত্রী মহুয়া রায়চৌধুরী সম্পর্কে কিছু বলতে চান। তার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে দুজনেই একে অপরের সাথে আবেগগতভাবে সংযুক্ত ছিলেন।


মহুয়া আর তাপস দুজনেই আর নেই। তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং তা ভেঙে গেছে কিনা তা অনুসন্ধান করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তারা একে অপরকে পছন্দ করেছিল যা যেকোনো কাজের ক্ষেত্রে খুবই স্বাভাবিক।
মহুয়ার মৃত্যুর এত বছর পর এবং তার নিজের মৃত্যুর ঠিক 2 বছর আগে তাপস পাল অনুভব করলেন যে তাঁর সেরা অভিনেত্রীর প্রতি তাঁর অনুভূতি স্বীকার করতেই হবে।

মহুয়ার মৃত্যুর অনেক পরে তাপস পালের বক্তব্য

উফ! ওই দিনটা আমি কিছুতেই মনে করতে চাই না। আমার কাছে ওটা একটা অভিশপ্ত দিন। কত রাত যে আমি ঘুমোতে পারিনি, হাউহাউ করে কেঁদেছি। মহুয়ার অ্যাক্সিডেন্টের খবর পেয়েই হাসপাতালে দৌড়ে গিয়েছিলাম। তখন আমি ভাল করে গাড়ি চালাতে পারতাম না। সেদিন কিছু না ভেবেই গাড়ি নিয়ে ছুটে গিয়েছিলাম। কীভাবে চালিয়েছিলাম, আজও জানি না। কাচের বাইরে থেকে মহুয়ার যে রূপ দেখেছিলাম, সেটা মনে পড়লেই আজও ঘুমের ভিতর শিউরে উঠি আর চোখের সামনে ভেসে ওঠে মহুয়াকে প্রথম দেখার দিনটা।


‘দাদার কীর্তি’ ছবির রিহার্সালের প্রথম দিন মহুয়াকে প্রথম দেখি তরুণ মজুমদারের বাড়িতে। তখন তো মহুয়া ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ করে বিখ্যাত হয়ে গেছে। আমিও দেখেছিলাম ওই ছবিটা। সেই অসম্ভব সুন্দরী মহিলা আজ আমার সামনে। সামনে থেকে দেখে আমি হাঁ করে তাকিয়েছিলাম ওর দিকে। তখনও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না মহুয়া আমার নায়িকা। একটু নার্ভাসও লাগছিল। আর কেন জানি না ওর সঙ্গে অনেক ছবি করার পরেও ওকে দেখলেই আমার কেমন নার্ভাস লাগত। কোনও কথা হওয়ার আগেই, তনুদা একটা স্ক্রিপ্ট দিলেন, আমরা ওই স্ক্রিপ্ট দেখে পড়তে শুরু করলাম। সেই শুরু হল মহুয়ার সঙ্গে পথচলা।

আমি যখন একা থাকি, তখন অনেক কথাই মনে পড়ে। ‘দাদার কীর্তি’ ছবির শেষের দিকের দৃশ্য। মহুয়া গাইছে, ‘চরণ ধরিতে দিও গো আমারে’। গানটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর মহুয়ার সেই কান্না, সেটা শুধু অভিনয় নয়। তরুণদার নির্দেশ ছিল চোখের জল যেন সকেটে থাকে বাইরে না আসে। শটটা শেষ হওয়ার পর মহুয়া ছুটে ঘরের মধ্যে গিয়ে হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করল। কিন্তু ক্যামেরার সামনে ও চোখ থেকে একফোঁটা জল ফেলেনি। আমি তো তখন নতুন। অবাক হয়ে ওকে কাঁদতে দেখছিলাম। ওর ওই কান্না আমি কোনওদিন ভুলব না। সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম, ও অভিনেত্রী হিসাবে কতটা পাওয়ারফুল আর সাবলীল। অভিনয় ওর রক্তে ছিল।

একদিন স্টুডিওয় বসে আছি। মহুয়ার গাড়ি ঢুকল। তার সঙ্গে অনেকগুলো কুকুর দৌড়ে এল। আর মহুয়া এদের বিস্কুট খাওয়াতে শুরু করল। সবাইকে খুব আপন করে নিতে পারত। 
কাজ করতে করতে আমরা একে অপরের প্রতি মানসিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলাম। আমি অন্য কোনও নায়িকার সঙ্গে কাজ করি এটা মহুয়া পছন্দ করত না। আমিও চাইতাম না ওর অন্য বন্ধু থাকুক। ওর দাবি ছিল যে ছবিতে ও থাকবে সেই ছবিতে আমি না বলতে পারব না।

মহুয়া মারা যাওয়ার পর অনেককে ওর ড্রিঙ্ক করা নিয়ে কথা বলতে শুনেছি। আমি শুধু একবারই দেখেছিলাম। তখন কালিম্পংয়ের ট্যুরিস্ট লজে শুটিং চলছে। হঠাৎ মহুয়া আমাকে জড়িয়ে চুমু খেল। ওই সময় আমি ওর মুখে মদের গন্ধ পেয়ে ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তুমি ড্রিঙ্ক করেছ কেন? ও একবার আমার দিকে তাকিয়ে আবার আমাকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু কোনও উত্তর দিল না। সেদিন রাতে ও আবার আমাকে ওর ঘরের দরজার কাছে জড়িয়ে ধরেছিল। আমি শুধু বলেছিলাম, মহুয়া তুমি অনেক ড্রিঙ্ক করেছ, ঘরে যাও। ওকে এই অবস্থায় দেখে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। অভিমানও হয়েছিল। কিন্তু আমি কখনও জিজ্ঞেস করিনি ও কেন এভাবে বদলে যাচ্ছে। আমি চেয়েছিলাম ও নিজে আমাকে বলুক। সেই সুযোগ আর হয়নি।

আমার সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝিও হয়েছে। কিন্তু সেটা ওই মিটিয়েছে। ‘পারাবত প্রিয়া’ শুটিংয়ের সময় বাসে করে একটা স্পটে যাচ্ছিলাম। মহুয়া বসেছিল সিটে ও কে ক্রস করার সময় আমার পিছন দিকটা ওর দিকে ছিল। হঠাৎ মহুয়া রেগে গিয়ে আমাকে যা-তা বলল। আমিও দু’কথা শুনিয়ে দিলাম। বেশ কিছুদিন আমাদের কথা বন্ধ ছিল। তারপর একদিন ওর একটা চিঠি পেলাম। তাতে লেখা ছিল, ‘প্রিয় তাপস, আমাদের আজ শুটিং শেষ। আমরা ফিরে যাচ্ছি। যা হয়েছে ভুলে যাও, ক্ষমা করে দিও, জীবনটা খুব ছোট, কিছু মনে রেখো না।’ চিঠিটা আমার কাছে এখনও আছে। এই তো সেদিনও চিঠিটা বের করে পড়েছিলাম।

আমার প্রথম ছবির নায়িকা মহুয়া আর ওর সঙ্গে আমার শেষ ছবি ‘আশীর্বাদ’। ওই ছবির একটা নাচের দৃশ্য ছিল, মহুয়াকে জড়িয়ে ধরে ঘুরছিলাম। তখনও বুঝিনি খুব তাড়াতাড়ি ও আমার কাছ থেকে অনেক দূরে চলে যাবে। লালকুটিতে আমাদের একটা শট ছিল। খুব সম্ভবত ‘অনুরাগের ছোঁয়া’-র। গাড়িতে আমার পাশে মহুয়া আর আমি গাড়ি চালাচ্ছি। আমি এত জোরে গাড়ি চালিয়েছিলাম যে চাকা স্কিড করে গিয়েছিল। হঠাৎ দেখি মহুয়া চিৎকার করছে “আমায় মেরে ফেলল, আমায় মেরে ফেলল।” মৃত্যুকে ও এতটাই ভয় পেত।

যেদিন দুর্ঘটনা ঘটে, তার আগের দিনও আমরা শুটিং করেছি। যার শেষ সংলাপ “আশিস, তাড়াতাড়ি এসো, আমি ভাল নেই।”

আর একটা গানের দৃশ্যের কথা মনে পড়ছে ‘অনুরাগের ছোঁয়া’-র। মহুয়া শুয়ে আছে আমি আস্তে আস্তে ওর কাছে এলাম। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে ‘আমি যে কে তোমার তুমি তা বুঝে নাও’। ওই সময় ওর মুখের যে এক্সপ্রেশন আমি কোনওদিন ভুলব না। ভুলব না পরের লাইনগুলো ‘ওপারের ডাক যদি আসে ... মরণ তোমায় কোনওদিন পারবে না কেড়ে নিতে।’আমি পারিনি। মরণ ওকে সত্যিই কেড়ে নিল। মহুয়া অসময়ে চলে যাওয়ায় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যে ধাক্কা পেয়েছিল তার থেকেও বিরাট ধাক্কা পেয়েছিল তাপস পাল।

তখন কালিম্পংয়ের ট্যুরিস্ট লজে শুটিং চলছে। হঠাৎ মহুয়া আমাকে জড়িয়ে চুমু খেল। ওই সময় আমি ওর মুখে মদের গন্ধ পেয়ে ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তুমি ড্রিঙ্ক করেছ কেন? ও একবার আমার দিকে তাকিয়ে আবার আমাকে জড়িয়ে ধরল। কোনও উত্তর দিল না


উৎস: সংবাদ প্রতিদিন




মহুয়া রায়চৌধুরী: স্মৃতির পাতায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

 বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন মহুয়া রায়চৌধুরী। তাঁর অভিনয়, প্রাণবন্ত হাসি, সৌন্দর্য এবং সহজ-সরল ব্যবহার আজও অসংখ্য মানুষের স্মৃতিতে অমলিন। তাঁর অকালপ্রয়াণ বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করেছিল। তাঁকে কাছ থেকে দেখা, তাঁর সঙ্গে কথা বলা কিংবা পারিবারিকভাবে তাঁকে জানার সৌভাগ্য যাঁদের হয়েছিল, তাঁদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে এক অন্য মহুয়া—অত্যন্ত সাধারণ, আন্তরিক, মিশুকে এবং মাটির কাছাকাছি একজন মানুষ।এখানে মহুয়ার কয়েকজন ভক্তের বক্তব্য তুলে ধরা হলো। উল্লিখিত বক্তব্যগুলির সত্যতা যাচাই করা হয়নি। তাই এগুলি সত্য নাকি মিথ্যা, সে বিষয়ে আমরা কোনো দাবি করছি না।



### টিনা সিংহা: মহুয়া ম্যাম ছিলেন আমার তবলার স্যারের কাকিমা। তবলার স্যারের বাবা ছিলেন বড় ভাই, আর তিলক চক্রবর্তী ছিলেন ছোট ভাই।

একদিন আমি তবলার স্যারের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেখানে মহুয়া ম্যামের অনেক ছবি দেখেছিলাম এবং তবলার স্যারের মায়ের কাছ থেকে মহুয়া ম্যাম সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছিলাম। এমনকি মৃত্যুর আগে যখন তিনি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, তখনও তাঁর সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছিলাম।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঠিক আগে মহুয়া ম্যাম বারবার আমার তবলার স্যারের মাকে—অর্থাৎ তাঁর জাকে—বলেছিলেন, “আমার গলা দেখো দিদি।”

আরও অনেক গল্প শুনেছিলাম। কিন্তু আজ আর লিখতে ইচ্ছে করছে না। মনটা খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

### তাপসী দাসগুপ্ত: আমি ছোটবেলা থেকেই তাঁকে খুব কাছ থেকে চিনি। তাঁর ডাকনাম ছিল টুটুন। মৃত্যুর সময় আমরা কয়েকজন তাঁর শেষযাত্রায় উপস্থিত ছিলাম।

### : মহুয়া আমার মায়ের আত্মীয় ছিলেন। মানুষ হিসেবে তিনি খুব ভালো ছিলেন। তবে তাঁর স্বামী ছিলেন অত্যন্ত নিয়ন্ত্রণকারী স্বভাবের। সম্ভবত তাঁর মৃত্যুর পেছনে তাঁর হাত ছিল।

### ঝর্ণা চক্রবর্তী: মহুয়া ছিলেন আমার প্রিয় নায়িকা। কত সিনেমা দেখেছি তাঁর! তখন আমি স্কুলে পড়তাম। শুনেছিলাম, মহুয়া ইমামবাড়ায় শুটিং করতে আসছেন। কী ভিড় হয়েছিল! সেখানেই চিন্ময় রায়কে খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম।

তখন ব্রাঞ্চ স্কুলের মাঠটি খোলা ছিল। সেখানেও শুটিং হয়েছিল। মহুয়াকে কী সুন্দর দেখতে লাগত!

এভাবে তাঁর চলে যাওয়া আজও মেনে নেওয়া যায় না। শিল্পী এভাবেই বেঁচে থাকুন আমাদের মধ্যে—তাঁর প্রাণবন্ত, মুক্তঝরা হাসি এবং অসাধারণ অভিনয়ের মাধ্যমে।

আজও তাঁর অভিনীত ছবি দেখে আমরা আনন্দ পাই, তাঁকে মনে করি।

### রৌনক ঘোষ: মহুয়া আমার মায়ের আত্মীয় ছিলেন। মায়ের মুখে শুনেছি, তিনি সত্যিই খুব ভালো মানুষ ছিলেন। একজন নামকরা অভিনেত্রী হয়েও তাঁর মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না। আমার মামার বাড়িতে এলে তিনি সবার মতোই রান্নাঘরে ঢুকে কাজ করতে যেতেন।আমার মা তখন বেশ ছোট ছিলেন। সম্পর্কে মহুয়া তাঁর দিদি হতেন।

###  আঞ্জু দাস (Anju Das): আমরা তখন নিউ আলিপুর কলেজে পড়ি। সেদিন ছিল শনিবার। মহুয়া বেবি-পিঙ্ক রঙের শাড়ি পরে একটি দোকান থেকে কী যেন কিনছিলেন। সবার আগে আমিই তাঁকে দেখতে পাই এবং বন্ধুদের নিয়ে তাঁর কাছে যাই। কোনো সাজসজ্জা ছিল না। শুধু বাঁ হাতে একটি সোনার নোয়া। কিন্তু কী সুন্দরই না লাগছিল তাঁকে! 

আমাদের সঙ্গে প্রায় আধঘণ্টা গল্প করেছিলেন। সেদিন টেলিভিশনে ‘লালগোলাপ’ সিনেমাটি দেখানো হবে—সেটাও তাঁকে বলেছিলাম। তখন তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমার সিনেমা কি ভালো লাগে?”

আমি বলেছিলাম, “হ্যাঁ, রঞ্জিতদাকেও ভালো লাগে।”

কত গল্প করলেন আমাদের সঙ্গে! তারপর বললেন, “আসি ভাই,” এবং চলে গেলেন। কোনো অহংকার নেই, কোনো বিরক্তি নেই—কী সহজেই না আমাদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন! এত মিশুকে, এত সহজ-সরল মানুষটি কয়েক দিনের মধ্যেই চলে গেলেন।

তাঁকে খারাপ কারা বলে? তারাই কি ভালো? একজন মৃত মানুষকে নিয়ে যারা কাটাছেঁড়া করেন, তাঁর চরিত্র নিয়ে আঙুল তোলেন, তাঁরা কখনোই প্রকৃত অর্থে মানুষ হতে পারেন না।

### নাসিফা রহিম: মহুয়া ছিলেন আমার ভীষণ প্রিয়—আমার ভালোবাসার নায়িকা। আমি তখন একাদশ শ্রেণিতে পড়তাম। একদিন বান্ধবীর সঙ্গে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে নিউ মার্কেটে গিয়েছিলাম। মার্কেটের মধ্যে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দেখি মহুয়া রায়চৌধুরীকে। কিন্তু তাঁকে এতটাই সাধারণ দেখতে লাগছিল যে সন্দেহ হচ্ছিল—সত্যিই কি উনি মহুয়া? পরনে ছিল লালপাড় সাদা সুতির শাড়ি। পিঠে বেণী ঝুলছে। কোনো মেকআপ নেই। তবুও তিনি তো মহুয়া—মহুয়াই!

আমি এখনও তাঁকে ভীষণ ভালোবাসি। যেমন সাধারণ, পাশের বাড়ির মেয়ের মতো সাজে ছিলেন, তাঁর ব্যবহারও ছিল ঠিক তেমনই সহজ-সরল।

আমি সাহস করে কাছে গিয়ে বললাম, “আপনি কি মহুয়া?” তিনি মিষ্টি হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, কেন?” আমি বললাম, “এত সাধারণভাবে আছেন, তাই ভাবছি সত্যিই কি না।” তিনি আবার হাসলেন। আমি বললাম, “আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে। আপনি কি কিনতে এসেছেন?” তিনি বললেন, “কস্টিউম জুয়েলারি।” তারপর হেসে বিদায় নিলেন।


কী সহজ-সরল ব্যবহার! ভাবলে এখনও মন ভরে যায়। ঘटनাটি ১৯৭৮ সালের। তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। আমরা একজন অসাধারণ উজ্জ্বল নক্ষত্রকে হারিয়েছিলাম। 


### রাজেশ রায়: কিছুদিন মহুয়া দমদমের গোলপার্কে থাকতেন। তখনই তাঁর ছেলে গোলার সঙ্গে আমার ক্ষণিকের আলাপ হয়েছিল। এত বছর পর হয়তো তাঁর মনে নেই। আমি এবং গোলা তখন দুজনেই বেশ ছোট। মহুয়া শুধু শিল্পী ছিলেন না—তিনি ছিলেন অসাধারণ মিষ্টি মনের একজন মানুষ।


### সুচিত্রা গাঙ্গুলী: টুটুনদির দিদি শান্তার শ্বশুরবাড়ি আমাদের পাড়ায় ছিল। দুই বোন দেখতে এবং স্বভাবে একেবারে বিপরীত ছিলেন। কিন্তু দুজনেই দেখতে খুব সুন্দর ছিলেন। একজন যেন দুর্গা, আর অন্যজন কালী।

টুটুনদির শান্ত, চুপচাপ মুখটা খুব মনে পড়ে। আমাদের বাড়িতে কয়েকবার এসেছিলেন।


### তাপসী দাসগুপ্ত: আমরা টুটুনদিকে ডাকনামেই ডাকতাম। তিনি আমার মা-বাবাকে দিদি ও জামাইবাবু বলে ডাকতেন। আমরা পাশাপাশি থাকতাম। প্রথম সিনেমার শুটিং চলাকালীন একদিন হঠাৎ তিনি আমাদের ঘরে এসে লুকিয়ে ছিলেন—কারণ তিনি শুটিংয়ে যেতে চাইছিলেন না। তাঁকে নিয়ে কত কথাই যে মনে পড়ে! তাঁর মা টেলিফোন ভবনে চাকরি করতেন।

মহুয়া রায়চৌধুরী আজ আমাদের মধ্যে শারীরিকভাবে নেই। কিন্তু তাঁর অভিনয়, তাঁর হাসি, তাঁর সৌন্দর্য এবং সবচেয়ে বড় কথা—তাঁর সহজ-সরল মানবিক ব্যবহার তাঁকে আজও মানুষের হৃদয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে।

কেউ তাঁকে দেখেছেন পর্দায়, কেউ কাছ থেকে; কেউ তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন, কেউ তাঁর পরিবারের সূত্রে তাঁকে চিনেছেন। কিন্তু স্মৃতিগুলির মধ্যে একটি বিষয় বারবার ফিরে আসে—মহুয়া শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন প্রাণবন্ত, আন্তরিক এবং অসাধারণ মনের মানুষ।

আমার মায়ের স্মৃতির পাতা থেকে — মহুয়া স্মৃতিকথা মৌমিতা রায় চৌধুরী: আমার মা তখন কিশোরী বধূ। ১৯৮০ সালেই আমার মা-বাবার বিয়ে হয়েছিল। মা তখন সদ্য অষ্টাদশী। মহুয়া রায়চৌধুরীর অভিনয় আর পাঁচজন বাঙালির মতোই মায়েরও অত্যন্ত প্রিয় ছিল।

বরানগরের জেলেপাড়ায় ১৯৮০/৮১ সালে, সম্ভবত কালীপুজোর মুখে, একটি জলসার আয়োজন করা হয়েছিল। তখন তো পাড়ায় পাড়ায় এমন জলসা হতো। সারারাত ধরে বাঙালিরা সপরিবারে জলসা উপভোগ করতেন। সবাই হয়তো সারারাত জেগে থাকতে পারতেন না, কিন্তু কিছুটা সময় হলেও জলসা দেখতেন। বিশেষ করে প্রিয় শিল্পী থাকলে তো কথাই নেই!

মা ও সেবার জলসা দেখতে গিয়েছিলেন। মহুয়া আসবেন—এই খবরেই অষ্টাদশী বধূটির মনে আনন্দের ঢেউ উঠেছিল। একেবারে সামনের সারিতে বসেই মা সেই সুন্দর, স্বর্ণালী সন্ধ্যার জলসা উপভোগ করেছিলেন। ভূপেন হাজারিকার গান মা মুগ্ধ হয়ে শুনেছিলেন। তিনিও সেদিনের জলসার অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন। এছাড়াও আরও অনেক নামী-দামী শিল্পী উপস্থিত ছিলেন। অবশেষে উপস্থিত সকল দর্শকের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মঞ্চ আলো করে উপস্থিত হলেন মহুয়া রায়চৌধুরী।

তাঁর আলোকিত উপস্থিতিতে সেদিন যেন উদ্বেল হয়ে উঠেছিল গোটা পরিবেশ। মায়ের কাছ থেকেই শুনেছি—কী মিষ্টি তাঁর হাসি! অপরূপ সুন্দর দেখতে লাগছিল তাঁকে। পরনে ছিল সাদা-কালো প্রিন্টের সিল্কের শাড়ি। অসামান্য সুন্দর লাগছিল তাঁকে। দুই কানে ছিল সোনার চেইন লাগানো দুল, যার নিচের দিকে মুক্তো ঝুলছিল। নাকে হীরের নাকছাবিতে উঠছিল আলোর ঝিলিক।

তিনি সকলকে সুমিষ্ট কণ্ঠে বলেছিলেন— “আপনারা সকলে ভালো আছেন তো? সবাই খুব ভালো থাকবেন…” অপরূপা মহুয়াকে সেদিন এতটাই নয়নমনোহর লাগছিল যে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। মঞ্চে তিনি তাঁর অভিনীত কয়েকটি ছবির সংলাপ বলেছিলেন। দর্শকদের অনুরোধে তাঁর ছবির কয়েকটি গান থেকে দু-কলিও গেয়েছিলেন। সেদিন উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধতা আবারও প্রমাণ করে দিয়েছিল—তিনি সকলের নয়নের মণি, প্রিয় নায়িকা এবং অত্যন্ত পছন্দের অভিনেত্রী।মায়ের মতোই সেদিন উপস্থিত সকলেই তাঁকে এত কাছ থেকে দেখতে পেয়ে ভীষণ আনন্দিত হয়েছিলেন।

পরবর্তীকালে আমার বাবা, শ্রী নারায়ণ রায়, এই শহরের একজন নামকরা অর্গানাইজার হয়ে ওঠেন। সেই সূত্রে মুম্বই ও কলকাতার এমন কোনো বড় শিল্পী নেই, যাঁদের মা কাছ থেকে দেখেননি। শুধু তাই নয়, বহু শিল্পীর সঙ্গেই তাঁর বেশ ঘনিষ্ঠ আলাপও হয়েছিল। পরবর্তীতে বাবা চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হন এবং অভিনয়ও করেন। টলিউডের বহু নায়ক, নায়িকা ও শিল্পীর সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সম্পর্কও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এত কিছুর পরেও নববধূ মায়ের চোখে আজও সেই দিনের জলসায় দেখা সপ্রতিভ, অসামান্য রূপসী নায়িকা মহুয়া মন জুড়ে রয়েছেন। এত সহজ, হাসিখুশি একজন মানুষ—সত্যিই যেন সুবাসিত মহুয়া ফুল তিনি। তাঁর মিষ্টি সুবাসে আজও যেন আকাশ-বাতাস সুরভিত।

মা বললেন— “বড় ভালোবাসতাম তাঁর অভিনয় দেখতে। ভগবানের প্রিয় ছিলেন বলেই হয়তো এত তাড়াতাড়ি কাছে টেনে নিলেন তাঁকে। যেখানেই থাকুন, পরম শান্তিতে থাকুন—এটাই শুধু চাইব।” মায়ের সেই স্মৃতির কথাগুলো শুনতে শুনতে মনে হয়, মহুয়া রায়চৌধুরী শুধু পর্দার একজন জনপ্রিয় নায়িকা ছিলেন না—তিনি ছিলেন মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব।

আজও তাঁর হাসি, তাঁর সৌন্দর্য, তাঁর অভিনয় এবং তাঁর সহজ-সরল উপস্থিতির স্মৃতি মানুষের মনে জীবন্ত। সময় চলে গেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু মহুয়ার সেই মিষ্টি সুবাস আজও বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে অমলিন।

বায়োপিক গুনগুন করে মহুয়া - সন্ধ্যা রায়ের ভূমিকায় অভিনয় করবেন অভিনেত্রী রিধিমা ঘোষ

 বায়োপিক গুনগুন করে মহুয়া—যা কিংবদন্তি বাংলা অভিনেত্রী মহুয়া রায়চৌধুরী-এর জীবনকাহিনি নিয়ে তৈরি হচ্ছে—এর শুটিং বর্তমানে চলছে। এই ছবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রবীণ অভিনেত্রী সন্ধ্যা রায়-এর চরিত্রায়ণ, যিনি মহুয়ার গুরু ও ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর অন্যতম পথপ্রদর্শক হিসেবে পরিচিত। এই ভূমিকায় অভিনয় করবেন অভিনেত্রী রিধিমা ঘোষ


ছবির কাস্টে রয়েছেন অঙ্কিতা মল্লিক, যিনি মহুয়ার প্রাপ্তবয়স্ক চরিত্রে অভিনয় করবেন, এবং দিব্যাণী মণ্ডল, যিনি মহুয়ার তরুণ বয়সের ভূমিকায় থাকবেন। পাশাপাশি, তথাগত মুখোপাধ্যায় মহানায়ক উত্তম কুমার-এর চরিত্রে অভিনয় করবেন এবং লোকনাথ দে মহুয়ার বাবার ভূমিকায় থাকবেন।

মহুয়ার কর্মজীবনের শীর্ষ সময়ে তিনি বাংলা চলচ্চিত্র জগতে নিজের স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি করেছিলেন। তাঁর এই উত্থানের পেছনে বড় ভূমিকা ছিল সন্ধ্যা রায়ের, যিনি তাঁকে অভিনয়ের ক্ষেত্রে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই বায়োপিকে তাঁদের গভীর পেশাগত সম্পর্ক ও আবেগঘন বন্ধনের দিকগুলো তুলে ধরা হবে।

এক পুরনো সাক্ষাৎকারে সন্ধ্যা রায় রায় জানিয়েছিলেন, মহুয়া শুধু প্রতিভাবান অভিনেত্রীই ছিলেন না, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই তাঁর নাচের দক্ষতাও ছিল অসাধারণ। পরিচালক তরুণ মজুমদার তাঁর এই প্রতিভায় মুগ্ধ হন এবং মাত্র ১৩ বছর বয়সেই একটি ছবির জন্য তাঁর লুক টেস্ট করানো হয়। পরে তরুণ মজুমদারই সন্ধ্যা রায় রায়কে মহুয়াকে গড়ে তোলার দায়িত্ব দেন।

রিধিমা ঘোষ এই চরিত্রে কাজ করার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত। তিনি জানিয়েছেন, তিনি ইতিমধ্যেই সেই সময়কার নায়িকাদের নিয়ে পড়াশোনা করছেন এবং সন্ধ্যা রায় রায় ও মহুয়ার সম্পর্ক নিয়ে গভীরভাবে গবেষণা করছেন, যাতে চরিত্রটি যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়।

গুনগুন করে মহুয়া ছবিতে মহানায়ক উত্তম কুমারের চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যাবে তথাগত মুখোপাধ্যায়কে

 রানা সরকারের প্রযোজনায় তৈরি হচ্ছে নতুন বাংলা চলচ্চিত্র ‘গুনগুন করে মহুয়া’। এই ছবিতে মহানায়ক উত্তম কুমারের চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যাবে তথাগত মুখোপাধ্যায়কে। বিষয়টি নিজেই নিশ্চিত করেছেন অভিনেতা।


তিনি বলেন, “মহানায়ক উত্তম কুমারের মতো অসাধারণ একজন শিল্পীকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা আমার কাছে শুধু অভিনয় নয়, এটি এক গভীর মানসিক দায়িত্ব এবং শ্রদ্ধার জায়গা। তাঁর ব্যক্তিত্বের আলাদা বৈশিষ্ট্য, অভিনয়ের সংযত সৌন্দর্য আর আবেগের সূক্ষ্ম প্রকাশ—সবকিছুকে সম্মান জানিয়েই ‘গুনগুন করে মহুয়া’ ছবিতে আমি তাঁকে নতুনভাবে অনুভব করার চেষ্টা করেছি। আমার মনে হয়, তাঁকে হুবহু অনুসরণ করা সম্ভব নয়। বরং তাঁর অনুভূতি ও অন্তরের স্পন্দনকে নিজের মধ্যে ধারণ করে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই ছিল আমার মূল উদ্দেশ্য। এই পুরো যাত্রায় আমি চেষ্টা করেছি তাঁর প্রতি সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করতে। মহানায়ক হিসেবে তাঁর যে স্বকীয় গরিমা, সেই সৌন্দর্য ও মর্যাদাকে পর্দায় তুলে ধরার আন্তরিক প্রয়াস করেছি।”

এরই মধ্যে তথাগতর সঙ্গে শুটিংয়ের একটি ছবি রানা সরকার তাঁর সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেছেন। যদিও সেখানে তথাগতর মুখ স্পষ্টভাবে দেখানো হয়নি, তবু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায়—তিনি উত্তম কুমারের চরিত্রেই বসে আছেন। এমনকি আগে থেকে কিছু না জানলেও দৃশ্যটি দেখে আন্দাজ করা কঠিন নয় যে তিনি তথাগতই। গত কয়েক দিন ধরে উত্তর কলকাতার হেদুয়া এলাকার কাছাকাছি একটি বাড়িতে ছবিটির শুটিং চলছে। শুটিংয়ের শুরুতেই কলাকুশলীদের সঙ্গে কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গে ইমপা অফিসে সাংবাদিক সম্মেলনও করেন রানা সরকার ও ইমপা সভাপতি পিয়া সেনগুপ্ত। পরে ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের মধ্যস্থতায় সমস্যার সমাধান হয়। এরপর গত শনিবার থেকে পুরোদমে শুটিং শুরু হয়েছে, আর সেদিনই তথাগতর অংশের কাজ সম্পন্ন করা হয়।

এই ছবির পরিচালক রাজদীপ ঘোষ এবং কাহিনি ও চিত্রনাট্যের দায়িত্বে রয়েছেন অর্কদীপ মল্লিকা নাথ। মহুয়া রায়চৌধুরী যখন চলচ্চিত্র জগতে আসেন, তখন মহানায়ক উত্তম কুমারের ক্যারিয়ার ছিল তুঙ্গে—তিনি তখন ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম প্রধান অভিভাবক। বিভিন্ন সময়ে দেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, তিলক চক্রবর্তীর সঙ্গে বিয়ের পর মহুয়া রায়চৌধুরীকে নিয়ে তাঁর বন্ধুরা মহানায়কের বাড়িতে যান, যেখানে সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়া ও আনন্দে সময় কাটান।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ছবিতে মহুয়ার চরিত্রে অভিনয় করবেন অঙ্কিতা মল্লিক। পাশাপাশি, মহুয়ার তরুণ বয়সের ভূমিকায় দেখা যাবে দিব্যাণী মণ্ডলকে। এছাড়া, মহুয়ার বাবা নীলাঞ্জন রায়চৌধুরীর চরিত্রে অভিনয় করতে পারেন অভিনেতা লোকনাথ দে।

মহুয়া রায়চৌধুরীর বায়োপিকে অঙ্কিতার সঙ্গে থাকছেন দিব্যাণী ও দেবলীনা

 দেবলীনা এর আগেও অভিনয় করেছেন। এই ছবিতে নায়িকার গাওয়া গানের জন্য কণ্ঠ দেওয়ার পাশাপাশি তিনিও অভিনয়ে থাকছেন। পর্দায় মহুয়ার কোন বয়সের চরিত্রে অভিনয় করবেন দিব্যাণী?


মহুয়া রায়চৌধুরীর বায়োপিকে দেবলীনা নন্দী থাকছেন গায়িকা ও অভিনেত্রী—দু’টি ভূমিকাতেই! শোনা যাচ্ছে, প্রয়াত অভিনেত্রীর বোনের চরিত্রে দেখা যেতে পারে তাঁকে।

এতেই শেষ নয় চমক। এই ছবিতে একই চরিত্রে অভিনয় করবেন ছোট পর্দার দুই জনপ্রিয় নায়িকা—অঙ্কিতা মল্লিক ও দিব্যাণী মণ্ডল!

এই ছবিতে মহুয়া রায়চৌধুরীর চরিত্রের জন্য গান গাইবেন দেবলীনা। খবর ছড়াতেই সোশ্যাল মিডিয়া ও টলিউডে হইচই পড়ে যায়। প্রযোজকের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে টলিউড।

দিব্যাণীকে পর্দায় তরুণ মহুয়া রায়চৌধুরীর চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যাবে। অন্যদিকে, অঙ্কিতা প্রাপ্তবয়স্ক মহুয়া রায়চৌধুরীর ভূমিকায় অভিনয় করবেন।

টুটুন থেকে মহুয়াঃ একজন প্রতিবেশীর চোখে

 

মহুয়াকে আমি চিনতাম আমাদের পাড়ার নীলুদার মেয়ে হিসাবে। সে তখন ছিল টুটুন, ভাল নাম ছিল শিপ্রা । নাচত। রেকর্ড ড্যান্স, অর্থাৎ রেকর্ড চালি তার সঙ্গে নাচত। হিন্দি বাংলা সব গানের সঙ্গেই। বিভিন্ন শিল্পীর নাচ নিখুঁতভাবে অনুকরণ করতে পারত। পাড়ার মেয়ে, স্বাভাবিকভাবেই পাড়ার সব অনুষ্ঠানেই ওর উপস্থিতি ছিল অপরিহার্য। বহু অনুষ্ঠানে টুটুনকে নিয়ে গিয়েছি। কখনও কিছু পারিশ্রমিক দিয়ে, কখনও কিছু না দিয়েই। ওর বাবার পাশে চুপটি করে বসে থাকত। রোগা ছিপছিপে চেহারা, কতই বা বয়স, দশ কিংবা এগার হবে।



নীলুদা একসময় উদয়শঙ্করের দলে ছিলেন, নাচগানের খুব শখ ছিল, ছবির জগতের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। সেই কারণেই বোধহয় নীলুদা চেয়েছিলেন তাঁর মেয়ে টুটুন নাচগান শিখুক, অভিনয় জগতে একজন সত্যিকারের শিল্পী হয়ে উঠুক। একদিন টুটুন তাই হয়েছে, তার পেছনে ছিল টুটুনের নিষ্ঠা আর নীলুদার প্রেরণা।


দমদম ক্লাইড হাউসের কাছে টেলিফোন কোয়ার্টারে ওরা থাকত। মা ছিলেন টেলিফোন অফিসের কর্মী। ছকবাঁধা জীবন, তাই বাবাই ছিলেন এর সর্বক্ষণের সঙ্গী। নাচের অনুষ্ঠানে কিংবা টালিগঞ্জ- গাড়ায় ছবিতে সুযোগের আশায় ও নীলুদার সঙ্গেই ঘোরাফেরা করত। বাবার হাত ধরে পরিচালক প্রযোজকদের কাছে যাওয়া-আস করতে করতেই ওর মনেও একজন বড় অভিনেত্রী হবার বাসনা দানা বেঁধে ওঠে। অভিনয়কে ভীষণভাবে ভালবেসে, নিজেকে তৈরি করতে থাকে। এরই মধ্যে দমদমের রাধাশ্রী সিনেমা হলে একটা হিন্দি ছবি মুক্তি পেল, নাম 'প্যার'। পরিচালক প্রহ্লাদ শর্মা। সেই ছবিতে নাকি টুটুন আছে! সারা দমদমে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল, সবাই ছুটল টুটুনকে ছবির পর্দায় দেখতে। ছবিটা খুবই নিম্নমানের, কারোরই ভাল লাগল না, তবু টুটুনকে ভাল লাগল। দমদমের মানুষের মনে কিছুটা অহমিকা বোধ জাগিয়ে দিল টুটুন ।


স্মৃতি সাঁতাই বড় বেদনার। আজ লিখতে বসে অনেক কথাই মনে পড়ছে। যদিও ঘনিষ্ঠতা বলতে যা বোঝায় তা ওর বা পরিবারের সঙ্গে আমার ছিল না, তবুও কোথায় যেন একটা আত্মিক যোগাযোগ ছিল। পাড়ার মেয়ে বলেই হয়তো ওর প্রতি আমার একটা আলাদা দুর্বলতা ছিল। দমদমেরই এক ভদ্রলোক একটা কিশোর প্রেমের গল্প লিখলেন। সেই গল্প নিয়ে ছবি করব, এই ভাবনা মাথায় চাপল । টুটুন হবে নায়িকা, নায়ক হবে পার্থ। একদিন আমি আর ক্যামেরাম্যান সুনীল চক্রবর্তী গেলাম ওদের বাড়ি। নীলুদা বাড়িতে ছিলেন না, বউদির সঙ্গেই কথা হল। বউদির মুখেই শুনলাম, তরুণ মজুমদার টুটুনের স্ক্রীন টেস্ট নিয়েছেন তাঁর পরের ছবি 'শ্রীমান পৃথ্বীরাজ'-এর জন্য। সুনীলবাবু ক্যামেরাম্যানের দৃষ্টি দিয়ে ওকে একবার দেখতে চাইলেন। ছাদে পিকনিক করছিল পাড়ার বাচ্চাদের নিয়ে। কিছুক্ষণ পর সারা গায়ে ঝালঝোল মাখা অবস্থায় এসে দাড়াল একটা টেপফ্রক পরা ছোট মেয়ে। সুনীল- বাবু দেখে বললেন, 'ইয়ারে এ যে একেবারেই বাচ্চা'। ঘটনাটি ১৯৭০ সালের গোড়ার। এই হল টুটুন। কোনো এক দৈনিক পত্রিকার দেখলাম লিখেছে ওর বয়স নাকি ৩০ বছর। কী করে হল, হিসাব মেলাতে পারছি না। তরুণবাবুর সেই ছবিতেই ও সুযোগ পেল। শিপ্রা হল মহুয়া রায়চৌধুরী। তারপর ওর এগিয়ে চলার ইতিহাস সকলেরই জানা। ছবির পর ছবি, যশ, খ্যাতি, প্রতিপত্তি।

তারপর ওকে আবার কাছ থেকে দেখবার সুযোগ হল সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে। ও তখন বাংলা চলচ্চিত্রের উঠতি নায়িকা। আমরা তখন বউবাজার অঞ্চলের বাসিন্দা, ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার সামনে একটা রেস্তোরায় আমাদের আড্ডা। বন্ধুবান্ধব সকলের মনেই চলচ্চিত্রকে ঘিরে নানা স্বপ্ন, কেউ অভিনেতা হতে চায়, কেউবা কাহিনীকার, কেউবা 'পরিচালক। সেই ব্যাঙ্ক অব ইণ্ডিয়াতেই চাকরি করে তিলক। এককালের শিশু অভিনেতা মাস্টার তিলক, কিশোর কন্ঠের সুগায়ক তিলক চক্রবর্তী। স্বাভাবিক- ভাবেই তাই তিলকের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ। আমাদের এক বন্ধু সুবোধ নাটক লিখল, 'ভোম্বল ঘটকের কেরামতি (পরে 'ঘটকালি' নামে চলচ্চিত্রে রূপায়িত )। সেই নাটকের মহড়া চলে, অভিনয় হয়, এই সময় তিলকের মনের মানুষ হিসাবে সেখানে টুটুনের আবির্ভাব। টুটুন তখন মহুয়া রায়চৌধুরী|

তারপর একদিন অনেক মানসিক টানা- পোড়েন, ঝড়ঝাপটার মধ্য দিয়ে ওদের বিয়ে হয়। মতাদা, বুড়োদা দাড়িয়ে থেবে সব কিছুর ব্যবস্থা করলেন। বিডন স্ট্রিটে ওরা প্রথম ঘর বাধে। তখনও আমরা গিয়েছি, দেখেছি তিলক-মহুয়ার সুখের সংসার। মহুয়া তখন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, অনেক সময় অনেক অনুরোধ, আবদার নিয়ে আমরা গিয়েছি, কথা রেখেছে, এতটুকু অহমিকাবোধ ওদের মধ্যে দেখিনি। কখনও কোনো অনুষ্ঠানে অতিথি- শিল্পী হয়েছে, কখনও 'ঘটকালি' নাটক করবে বলে বউবাজারের খোলা ছাদের ওপর ঘণ্টার পর ঘন্টা মহড়া দিয়েছে, মুড়ি-চানাচুর ভাগাভাগি করে খেয়েছে, নিজের পয়সা দিয়ে সিঙ্গাড়া মিষ্টি এনে খাইয়েছে। অভিনয়কে মনপ্রাণ দিয়ে ভালবেসেছে, কোনো মোহ বা উচ্চাশায় নয়, অভিনয়কে ভালবেসেই ও বড় অভিনেত্রী হয়েছে।

এরই মাঝে সুবোধের 'ঘটকালি' ছবি হয়েছে। মহুয়া তাতে নায়িকা হয়েছে। আমি একটা ছবি করেছিলাম 'চুপি চুপি', তাতে মহুয়াকে নিতে পারিনি, নিয়েছিলাম সোনালিকে। ছবির শুটিং চলাকালীন এক- দিন স্টুডিও-র মেকআপ রুমে হাসতে হাসতে বলেছিল 'কী ব্যাপার ! দমদমের লোকের ছবিতে আমিই বাদ।' ওকে কিছু বলিনি, হেসে কথাটা হজম করেছিলাম। মনের মধ্যে ইচ্ছা ছিল ভবিষ্যতে ছবি করবার সুযোগ পেলে ওকে নায়িকা করব। কিন্তু মানুষের সব আশা পূর্ণ হয় না, আমারও হল না।

মহুয়া রায়চৌধুরীর কথা বললেন অভিনেত্রী দেবিকা মুখোপাধ্যায়

 মহুয়ার ডাগর-ডোগর মুখটা ক্লোজ আপে কী মিষ্টি লাগত! মহুয়ার রূপে কোনও উগ্রতা ছিল না। গায়ের রং কিন্তু শ্যামলা।  মহুয়ার খুব সাধারণ মধ্যবিত্ত মানসিকতার চেহারা ছিল কিন্তু ক্যামেরার সামনে গ্ল্যামার নিয়ে আসত। এক সাক্ষাৎকারে, দেবিকা মহুয়া সম্পর্কে এই কথাগুলো বলেছিলেন


মহুয়া রায়চৌধুরীর ৪০ তম প্রয়াণ বার্ষিকীতে তাঁর কথা বললেন অভিনেত্রী দেবিকা মুখোপাধ্যায়। ৪০ বছর পর এই প্রথম মহুয়াকে নিয়ে মুখ খুললেন 'ছোট বৌ' দেবিকা। 

মহুয়ার সঙ্গে দেবিকা বললেই তো মনে পড়ে 'আবির' ছবির কথা। যে ছবি মহুয়ার মৃত্যুর দু বছর পর রিলিজ করেছিল। একটু গল্প বলুন না?


আমাকে আগে কেউ কোনওদিন জিজ্ঞেসও করেননি এই বিষয়ে। অথচ মহুয়া আর আমি সহকর্মী ছিলাম এই ইন্ডাস্ট্রিতে।

'আবির' ছবির অফার নিয়ে কিন্তু পরিচালক কাজল মজুমদার মহুয়া মারা যাবার  আমার কাছে এসেছিলেন। মহুয়ার সঙ্গে আমি এই ছবিতে কোনও শুটিং করিনি। কারণ ছবিটা যখন শুরু হয় আমি কোনও গল্পেই ছিলাম না। মহুয়া ছবিটা শেষ করে যেতে পারেনি। তখন ছবিটা শেষ করতে পরিচালক গল্পে আর একটি নায়িকা চরিত্র আমাকে নিয়ে এলেন। 'আবির' ছবিতে দেখা যায় আমার আর মহুয়ার একসঙ্গে দৃশ্য, বেশ কয়েকটা। কিন্তু ওগুলো সব সুচতুর এডিটিং। মহুয়া মারা যাবার পর তো ডিরেক্টর আমায় এই ছবির অফার দেন। আমি এই ছবিতে মহুয়ার সঙ্গে শুটিং করিনি। সেটা দর্শকরা ধরতে পারবেন না। 'আবির' ছবিটা ভালই চলেছিল। অল্প টাকার ছবি, আমরাও তো বেশি টাকা পাইনি সেসময়। কিন্তু চলেছিল। এই ছবিতে মাদ্রাজের একটা বিখ্যাত ট্রেনড কুকুর 'মোতি' ছিল। সে হিন্দি সিনেমাও অনেক করেছিল। যাকে দেখেতেও 'আবির' ছবিটা জনপ্রিয় হয়েছিল।

মহুয়ার সঙ্গে আর কোনও ছবিতে আপনি কাজ করেছিলেন?

হ্যাঁ তপন সিনহার 'রাজা'। একই ছবিতে আমরা দু'জন ছিলাম। তপন সিনহার সঙ্গে কাজ করা আমার কাছে একটা স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। তার আগে 'বাঞ্ছারামের বাগান', 'আদালত ও একটি মেয়ে' করেছি। তবে তপনদার আর একটা ছবিতে আমি হিরোইন ছিলাম। যে রোলটা হিন্দিতে মহুয়া করেছিল। 'আদমি অউর অউরাত' ছবিতে অমল পালেকর আর মহুয়া রায়চৌধুরী ছিল। এই হিন্দি ছবিটার গল্প নিয়ে একটা বাংলা ছবিও হয়েছিল 'মানুষ'। মহুয়ার রোলটা আমি করি আর আমার বিপরীতে ছিলেন শমিত ভঞ্জ। মহুয়া মারা যাবার পর এই বাংলা 'মানুষ' ছবির আমার কাছে আসে। এই ছবিটা মুক্তিও পেয়েছিল পরে। কিন্তু এখন আর কোনও চর্চায় নেই। আমাকে শুধুই 'ছোট বৌ' বলা হয় চিরকাল। অথচ তপন সিনহার এতগুলো ছবি করেছি। 'মানুষ' ছবিতে হিরোইন আমি, তবু কজন আর জানল? ছবিটাই তো পাওয়া যায় না।

মহুয়া আমার থেকে একটু সিনিয়র ছিল। তবে আমার দু'জন দু'জনকে তুই করেই বলতাম। ওঁর চলে যাওয়া বড় মাপের নায়িকার প্রস্থান। ভীষণ ইমোশনাল অ্যাকট্রেস ছিল মহুয়া। গ্লিসারিন ছাড়া কাঁদতে পারত। যেটা এখন কেউ জানেই না, পারেই না। সব চোখে ড্রপ দিয়ে দিয়ে কাঁদে। নিজের বাস্তব জীবনের কষ্টটা মহুয়ার মনে পড়ত। তাই বলত 'কান্নার সিনে আমার গ্লিসারিন লাগে না'। একটা মেয়ে যখন ক্যামেরার সামনে হাউহাউ করে কাঁদতে পারে তখন তো তাঁর ভেতরের যন্ত্রনাগুলো বেরিয়ে আসে। আমিও পারতাম সেটা।আমি মহুয়াকে বলতাম 'আমার ছোটবেলায় বাবা মারা গেছে, বাবার কথা ভেবে আমি কেঁদে ফেলি'। মহুয়াও তখন বলত 'আমার জীবনেও অনেক কষ্ট আছে। সেগুলোর কথা ভেবে আমি কেঁদে ফেলি'।

ওঁর মৃত্যুর ৪০ বছর পরও অমন অভিনেত্রী আর পাওয়া যাবে না। মহুয়ার ডাগর-ডোগর মুখটা ক্লোজ আপে কী মিষ্টি লাগত! মহুয়ার রূপে কোনও উগ্রতা ছিল না। গায়ের রং কিন্তু শ্যামলা।  মহুয়ার খুব সাধারণ মধ্যবিত্ত মানসিকতার চেহারা ছিল কিন্তু ক্যামেরার সামনে গ্ল্যামার নিয়ে আসত। ক্যামেরাতে ভীষণ ( ভীষণে জোর দিলেন দেবিকা) ভাল আসত। কিন্তু খুব ঘর-গেরস্থর মেয়ে ছিল। ওঁকে সামনে দেখলে কেউ বলবে না সিনেমা আর্টিস্ট। একটু ক্ষ্যাপাও ছিল। বাইরে কোথাও রাতে শো করে এসে, স্টুডিওর বাথরুমে স্নান করে নিল। আমি বললাম, 'বাড়ি যাবি না?' বলল 'দূর বাড়ি গিয়ে আবার স্নান কে করে!' স্টুডিওটাকেই মহুয়া ওঁর ঘর সংসার ভেবে ফেলত।

আমরা সহকর্মী ছিলাম। আমার সঙ্গে ওঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল না। রত্না দির (ঘোষাল) যেটা ছিল। কাজ করতে গিয়ে টুকটাক ব্যক্তিগত কথা যা হত। একবার টেকনিশিয়ান স্টুডিওর মেকআপ রুমের ভিতর ঢুকে দেখলাম মহুয়া মেকআপ করছে। আমিও মেকআপে বসব। ওঁর আর আমার আলাদা ছবি ছিল। কিন্তু আমরা এক মেকআপ রুম শেয়ার করছিলাম। তখন দেখি মহুয়ার মুখে মারের দাগ। ঠোঁটের কাছে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। মুখ মার খেয়ে ফুলে রয়েছে। কাটার দাগ। মেকআপ ম্যানকে মুখের দাগগুলো ঢেকে দিতে বলছিল মহুয়া। তখন মহুয়াকে বললাম 'এই অবস্থা তোর কে করল?' বলল 'তিলক, আমার বর!' আমি বললাম তোদের এত ঝগড়া, মারপিট হয় কেন? এত মার খাবি কেন? তখন বলল 'আমি একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছিলাম। সারাক্ষণ টাকা চায়। তাই মারপিট হয়ে যায়।' এটা তো আমি একদিনের ঘটনা বলছি, যা দেখেছিলাম। কিন্তু স্টুডিওপাড়ায় শুনতাম লোকমুখে ওঁরা স্বামী-স্ত্রী দু'জন হামেশাই মারপিট করত। আসলে বেশি জিজ্ঞেস করিনি। আমার তখন অত ম্যাচিউরিটি ছিল না। মহুয়ারও ছিল না। ব্যক্তিগত সংসার জীবন আর প্রফেশনাল জীবন এক করে ফেলত। আমি তাও ওঁকে বুঝিয়েছিলাম। কিন্তু আমার জ্ঞান সেদিন মহুয়া শোনেনি। সংসারে শান্তিটা ওঁর ছিল না। সেটা আমি ওকে দোষ দেব না। ওঁর স্বামীকেও চিনতাম না। আমি বলব আমি জানিনা। যা দেখেছিলাম সেটা খুব কষ্টের। কিন্তু আমি সবসময় ওঁর ভালটা তুলে ধরব। আমি নিজে একজন অভিনেত্রী হয়ে ওঁকে গুণী অভিনেত্রী হিসেবেই দেখব।

আমি তো গিয়েছিলাম তখন মহুয়ার এস এন রায় রোডের বাড়িতে। আমাদের ফিল্মের লোকজন অনেকেই ছিলেন। কিন্তু মহুয়ার মুখ তো ঢাকা ছিল। আগুনে পোড়া শরীর সম্পূর্ণ কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল। শবদেহটা দেখেছিলাম কিন্তু আমি তো মহুয়ার মুখ দেখতে পাইনি। সেখানে ওঁর বর, বাবা, ছেলে গোলা সবাইই ছিল। কী ভাবে আগুন লাগল আমি জানিনা। শুনেছিলাম সুইসাইড বা এতটাই অতিরিক্ত মদ্যপান করেছিল যে ছেলের দুধ গরম করতে গিয়ে কখন আগুন লেগে গিয়েছে গায়ে নিজেই বুঝতে পারেনি। ওরকম মৃতদেহর সামনে কী আর এত প্রশ্ন করা যায়! আমি কিছু জিজ্ঞেস করিনি। আমি ভাবতেই পারছিলাম না। ভগবান যাকে যখন নিয়ে নেন। ওঁর মতো অভিনেত্রী আর এল না ইন্ডাস্ট্রিতে।

অদ্বিতীয়া মহুয়া : ছ'জন অভিনেত্রীর চোখে


রত্না ঘোষাল

এগারোই জুলাই বিকেলে মৌ আমার বাড়িতে এসেছিল। এই ঘরে বসেই অনেক আড্ডা হল। সেদিন হেস্পতিবার, 'তপন থিয়েটারে' আমাদের 'নাগপাশ' নাটকের চারশো নাইট-এর উৎসব। সাড়ে পাঁচটার সময় দুজনে একসঙ্গে বেরোলাম। ও বাড়ি চলে গেল। সেদিন মাঝরাতে হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়া! ধড়ফড় করে উঠে জানলা দিয়ে দেখি তিলক, মৌ-এর স্বামী। আগুনে ভয়ঙ্করভাবে পুড়ে যাওয়া মৌকে হাসপাতালে পৌঁছে তিলক এসেছে আমাকে নিয়ে যেতে। তখুনি বেরিয়ে পড়লাম । রাত তখন আড়াইটে। শুনলাম, রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ খাবার গরম করতে গিয়ে কেরোসিনের স্টোভ বার্স্ট করে নাকি এই দুর্ঘটনা !

ক্যালকাটা মেডিক্যাল রিসার্চ ইন্সটিটিউটে যমে মানুষে টানাটানি চলল এগারো দিন। ডাক্তার-নার্সদের চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। ওর বাড়ির লোকেদের, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির মানুষদের, ওর ভক্ত আর দর্শকদের এত পুজো, মানত এবং আশীর্বাদ, ভালবাসা বিফলে গেল । প্রাথমিক বিপদটা কিন্তু কেটে গিয়েছিল। প্রায় রোজই কথাবার্তা হয়েছিল আমার সঙ্গে শরীরের নাইনটি পার্সেন্ট অংশ পুড়ে গেলেও, দুর্ঘটনার বাহাত্তর ঘণ্টা পর ডাক্তাররা বলেছিলেন, এর সুস্থ হয়ে ওঠার চান্স যথেষ্ট। প্লাস্টিক সার্জারি করে শরীরের পোড়া জায়গা আগের মতো স্বাভাবিক করে ফেলাও কঠিন নয়। রোববার, একুশে জুলাই সকালেও দেখা করেছি এর সঙ্গে, অনেক কথা হয়েছে । তখন একবারও মনে হয়নি, সেটাই শেষ দেখা। সোমবার সকালে টেলিফোন পেলাম, ভোর পাঁচটা পঞ্চান্নতে মৌ চলে গেছে।

আমার ডাকনাম মাটু। মৌ ছিল 'মা' বলতে অজ্ঞান। সুখে-দুঃখে, আনন্দ-বেদনায় একে অপরের কাছে সঁপে দিতাম নিজেদের। যে-কোনো সামান্য সমস্যাতেও মৌ ছুটে আসত আমার কাছে। সেটা বোধহয় ঊনসত্তর সাল, পাইকপাড়ায় আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল ওর মামার বাড়ি। একদিন এসে আলাপ করল আমার সঙ্গে। शি- টারে, সিনেমায় আমার অভিনয় নাকি এর খুব ভাল লাগে। বেশ লাগল মেটোকে ওর ছটফটানি, হুড়মুড় কলা, ছেলে- 1. সহজে যে কোনো মানুষকে আপন করে নেওয়ারও আশ্চর্য ক্ষমতা! বাহাত্তর- তিয়াত্তর সালে মৌ ान । তরুণ মজুমদারের 'শ্রীমান পৃথ্বীরাজ' ছবিতে। তারপর যখন উনিশশো ছিয়াত্তর সালের এপ্রিল মাসে 'তপন থিয়েটারে' সত্য বন্দ্যো পাধ্যায়ের 'নহবত' নাটকে অভিনয় করল, ঘনিষ্ঠতা ও অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব হল। পঞ্চাশ-ষাট নাইট অভিনয় করেছিল আমাদে সঙ্গে, বিয়োর কনে রেখার ভূমিকায়।

মৌ-কে ঘিরে কত স্মৃতি, কত ফোটো। সবই কেমন অগোছালো হয়ে আছে। স্মৃতি হাতড়ে এখন খুঁজে বেড়াচ্ছি আমার প্রিয় বোন, বান্ধবীকে। 'ভারতী' সিনেমার টিকিট কেটে 'দাদার কীর্তি' দেখতে যাওয়া, নিউ মার্কেটে হৈ হৈ করে মার্কেটিং, লেক-মহাদানের মেলায় নাগরদোলায় চাপা--1 ফোটোগুলোও সব অ্যালবামে সাজিয়ে রাখা হয়নি। জানেন, মৌ যখন প্রেম করছে তিলক চক্রবর্তীর সঙ্গে, আমিই ছিলাম ওর গাইড আস্ত ফিলসফার। তর বাবার মত ছিল না এই বিয়েতে। মৌ এসে চেপে ধরল, আমরাই তোড়জোড় করে বিয়েটা দিলাম। ছিয়াত্তর সালের পয়লা মে রেজি সময় দু-পক্ষের অভিভাবক হিসেবে সই করেছিলেন বুড়োদা মানে তরুণকুমার এবং মতাদা। ওহ, মৌ-এর আট বছরের ছেলে তমাল ওরফে গোলা-র জন্য ভীষণ মন খারাপ লাগছে ।...... সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার, থা জুলাই ওর বাংলাদেশে চলে যাবার কথা ছিল, 'উশিলা' ছবির শুটিং করতে। ভিসা না পাওয়ায় যাওয়া হল না। ঢাকায় চলে গেলে হয়তো এভাবে মরতে হত না ওকে। দোসরা জুলাই রাতে মৌ লাস্ট শর্ট দিয়েছে বীরেশ চট্টোপাধ্যায়ের আশীর্বাদ' ছবিতে।

অভিনেত্রী মহুয়া রায়চৌধুরীর তুলনা মহুয়া নিজেই। মৌ হয়তো তথাকথিত গ্ল্যামার-স্টার ছিল না, ওর চেয়ে জনপ্রিয় অভিনেত্রীও টালিগঞ্জে আছেন, কিন্তু শুধুমাত্র অভিনয়ের দিক থেকে ওর ধারে-কাছে আসতে পারেন, এমন নায়িকা এখন বাংলা ছবিতে নেই। নানারকম চরিত্রেই ওকে মানাত, অসাধারণ কাজও করত। সুচি সেন, মাধব মুখোপাধ্যায়, অপর্ণা সেনের পর রোমান্টিক নায়িকা হিসেবেও মৌ-এর তুলনা হয় না। কল্পতরুর 'পরবেশ' বা আরো দু-একটা ছবি ছাড়া, ওর সঙ্গে অভিনয়ের সুযোগ সেভাবে পাইনি, কিন্তু একজন দর্শক হিসেবে ওর ফিল্ম পারফরমেন্স দেখে আমি মুগ্ধ। শঙ্কর ভট্টাচার্যর 'শেষরক্ষা', তরুণ মজুমদারের 'দাদার কীর্তি', পিনাকী মুখোপাধ্যায়ের 'কপালকুণ্ডলা', সলিল দত্তর 'রাজেশ্বরী' বা তপন সিংহর 'আদমি আউর আউরত' ছবিতে মৌ-এর অভিনয় ভুলতে পারব না। কোনোদিন।

দেবশ্রী রায়

কিছু ভাল লাগছে না। বাংলা ছবিতে নায়ক-নায়িকার এত অভাব, তার মধে মহুয়াদির মতো পাওয়ারফুল অ্যাকট্রেস চলে গেলেন। খানিক আগে তনুদা এসেছিলেন। খুব ভেঙে পড়েছেন। রমাপ্রসাদ চক্রবর্তীর 'রেজার সাহেব' ছবিতে প্রথম অভিনয় করেছিলাম মহুয়াদির সঙ্গে। তখন আমি নেহাতই ছোট। অনুদার 'দাদার কীর্তি' ছবির শিমুলতলার আউটডোরেই মহুয়াদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা।

সহশিল্পী হিসেবে অভিনয়ের অনেক খুটিনাটি ব্যাপার শিখতেও পেরেছি এর কাছ থেকে। রোম্যান্টিক চরিত্রে দারুণ লাগত মহুয়াদিকে।

ছেলেবেলায় আমি এবং আমার দিদি মা যখন রুমকি কুকি নামে রেকর্ড-ড্যান্স করতাম বিভিন্ন ফাংশানে মহুয়াদিও তখন রেকর্ড-ড্যান্স প্রোগ্রাম করতেন। মাঝে মাঝেই দেখা হয়ে যেত। ওঁর আসল নাম শিল্পা। সোনালি নামে নাচতেন। অত-শত মনে নেই, মাঝের কাছে শুনেছি, ভীষণ ভাল পারফরমেন্স ছিল মহুয়াদির। यদ অন না আসতেন, হয়তো নৃত্য- শিল্পী হিসেবেই নাম করতেন।'

রুমা গুহঠাকুরতা


মৌ-এর মৃত্যুর খবর পেয়ে বোবা হয়ে গিয়েছিলাম। তারপর তো দেখা দেখতে গেলাম। সেদিন থেকেই মেন্টালি বড্ড ডিস্‌টার্ব বোধ করছি। মৌ নেই, বিশ্বাস হচ্ছে না। এটা আমার পার্সোনাল লস ও তো আমার বড় মেয়ে, সত্যি সত্যিই মেয়ে আমাকে রুমা-মা বলে ডাকত।

নির্মল মিত্রের 'পরিচয়' ছবির শুটিংয়ে মৌ-এর সঙ্গে আলাপ। এই শিমুলতলার আউটডোরেই ওকে ভালবেসে ফেলেছিলাম । ভারী মিষ্টি মেয়ে, চোখে-মুখে কথা বলত, সহজে আপন করে নিতে পারত সবাইকে। একসঙ্গে প্রথম ছবিতে কাজ করেই বুঝে- ছিলাম, অভিনয়ের সহজাত ক্ষমতা আছে ওর। অসম্ভব প্রতিভাময়ী। পরে আরো দুটো ছবিতে কাজ করেছিলাম ওর মায়ের ভূমিকায় – শঙ্কর ভট্টাচার্যর 'দৌড়', ও তনুবাবুর 'দাদার কীর্তি'। আর এই তো, জুন মাসের শেষাশেষি জহর বিশ্বাসের 'অনুরাগের ছোঁয়া' ছবিতে ওর শাশুড়ির রোল করলাম। একটা ভীষণ সত্য কথা সরাসরি বলা দরকার। রিসেন্ট টাইমস--- ধরা যাক, ষাট দশকের গোড়া থেকে এই পঁচাশি সাল পর্যন্ত যদি হিসেব করি, মাধব মুখোপাধ্যায় ও অপর্ণা সেনের পর এত বড় মাপের অভিনেত্রী বাংলা ছবিতে আর আসেনি। ইয়ং এজে দারুণ দেখতে ছিল আর অপর্ণা তো রূপসী বটেই। মৌ সে তুলনায় খুবই সাধারণ চেহারার। গ্ল্যামারাস সুন্দরী তো ছিল না। তবে ওর আটপৌরে লাবণার টানটাই ছিল অসাধারণ । আর কী চমৎকার, মিষ্টি হাসি! হয়তো শাবানা আজমি বা স্মিতা পাতিলের থেকেও ভাল অভিনেত্রী ছিল মৌ। নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ সেভাবে বড্ড দুঃখী মেয়ে ছিল অনেক চাপা কষ্ট, গোপন বেদনা ছিল ওর মনের গভীরে। আমাকে কখনোই বলেনি কিছু। হয়তো বলতে চায়নি। কিন্তু আমি তো ওর মা ঠিক বুঝতে পারতাম ।


সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়

মহুয়া নিজেই জানত না ও কত বড় অভিনেত্রী ছিল। শঙ্করবাবুর 'দৌড়', তনুদার 'দাদার কীর্তি', নবোদু চট্টোপাধ্যায়ের "আজ কাল পরশুর গল্প' বা তপনদার 'আদমি আউর আউরত' ছবিতে অভিনয়ের জন্য আমাদের মধ্যে চিরকাল বেঁচে থাকবে মহুয়া। সহশিল্পী হিসেবেও বারে বারে টের পেয়েছি এর অসাধারণত্ব। মহুয়ার সঙ্গে আমার পরিচয় নির্মল মিত্রের 'পরিচয়' ছবির শিমুলোর শুটিংয়ে, বোধহয় পঁচাত্তর সালে। তারপরেও যে কত ছবিতে কাজ করেছি একসঙ্গে। শঙ্করবাবুর 'শেষরক্ষা', দীনেন গুপ্তর 'প্রিয়তমা' ও 'শঠে শাঠাৎ', বিমল রায়ের 'শেষ বিচার', শচীন অধিকারীর 'সমা', অমল দত্তর 'বোধন', অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের 'প্রায়শ্চিত্ত' ও 'কেনারাম বেচারাম',

, বিমল ভৌমিকের 'আমার পৃথিবী', শান্তিময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'তিল থেকে তাল', উমানাথ ভট্টাচার্যর 'প্রেম ও পাপ' বোধহয় আরো দু-চারটে ছবি। নানা রকমের রোল করেছে মহুয়া। কোনো বিশেষ চরিত্রে স্ট্যাম্পড হয়ে যায়নি। হতে দেয়নি। যে কোনো চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যেতে পারত অনায়াসে। চরিত্রগুলোর আলাদা ডায়মেনশন দিতে পারত।

কাজ করতে গিয়ে অনেক সময়েই মতের মিল হয়নি মহুয়ার সঙ্গে। ছোটখাটো ঝগড়া বা মনোমালিন্যও হয়েছে। সেসর ভুলে যেতে কিন্তু কারোরই বেশি সময় লাগত না। মহুয়া ছিল একাধারে আমার বোন এবং বান্ধবী। ওর মনটাও ছিল বড়, বিশাল। পশুপাখিদেরও কী ভালবাসত !

অপর্ণা সেন

মধুয়ার মৃত্যু আমাকে কতটা মর্মাহত করেছে, বোকাতে পারব অ্যাকটিং-এর এরকম ম্যাচিওরিটিতে পৌঁছে মেয়েটা চলে গেল। ভাবা যায় না! পঁচাত্তর সালে ইন্দর সেনের 'অসময়' ছবিতে যখন

প্রথম একসঙ্গে কাজ করি, তখনই টের পেয়েছিলাম, মহুয়া খুব ট্যালেন্টেড মেয়ে। কিছুদিন আগে দিলীপ রায়ের 'নীলকণ্ঠ ছবিতেও আবার কাজ করলাম একসঙ্গে। মহুয়া অভিনয় করত একেবারে ভেতর থেকে। হয়তো খুব একটা ভাবনা-চিন্তা না করেই। স্পন্টেনিয়াস। অভিনয়টা এর সহজাত। টাইমিং সেন্স বা সেন্স অব রিদম ছিল অসাধারণ । বেজায় ডাকাবুকো মেয়ে ছিল। নিয়ম-কানুন মেনে চলা পছন্দ করত না। নিয়ম ভাঙতেই যেন আনন্দ । এবং অসম্ভব প্রাণ-প্রাচূর্যে ভরা। এমনিতেই বাংলা ছবি কম দেখি। মহুয়ার অনেক ছবিই দেখিনি। তবে 'অসময়' বা 'দাদার কীর্তি দেখে আই ওয়াজ হাইলি ইমপ্রেসড। নিজের পরিচালিত ছবিতে ওকে ভীষণভাবে ইউজ করার কথা ভেবেছিলাম । সে সুযোগ আর পাব না। তবে আমার 'পরমা' ছবিতে যখন এক বিধবা পাগলি মেয়ের ছোট্ট চরিত্রে কাজ করার অফার দিলাম, রাজি হয়ে গেল। সেটা হয়তো আমার প্রতি ওর শ্রদ্ধা, ভালবাসা বা থে থেকে। ছোট হলেও চরিত্রটা ে গুরুত্বপূর্ণ, সেটা ও টের পেয়েছিল। অভিনয় জানা কোনো মেয়োর দরকার ছিল চরিত্রায়। অ্যাও শি ডিড ইট ভেরি হ্যাপিলি ।

ইন্দর সেন পরিচালিত 'পিপাসা' ছবিতে মহুয়া রায়চৌধুরী ও দীপঙ্কর দে আমাদের ঠিক পরের ব্যাচে যারা এসেছে টালিগঞ্জে, এই ফ্রম দ্য রে আি সেভেন্টিজ, তাদের মধ্যে মহুয়া ছিল সবচেয়ে ট্যালেন্টেড অভিনেত্রী। বেস্ট অব দ্য ট সত্যিই অদ্বিতীয়া।


মাধবী চক্রবর্তী

আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না। মহুয়া নেই। ভাবতেই পারছি না ওর হাসি দেখতে পাব না, ওর রাগ দেখতে পাব না। কিছুতেই মনে করতে পারছি না মহুয়া মা বলে ডাকবে না। প্রতিদিন রাত সাড়ে দশটায় মহুয়া কেমন আছে জানবার জে অপেক্ষা করতাম। রত্নার কাছে টেলিফোন করতাম। ওর কাছ থেকে সব খবর নিতাম। আস্তে আস্তে আশা হচ্ছিল ও নিশ্চয়ই ভাল হয়ে যাবে। বেঁচে যাবে। মহুয়াকে হস্ত ভালবাসতাম। ও ছিল আমার বড় মেয়ে। ওকে প্রথম দেখি 'পৃথ্বীরাজ' ছবিতে। সেই ছবিতেই মহুয়াকে আমার ভাল ল তারপর তারকেশ্বরে একটা সিনেমা হাউস উদ্বোধন করতে গিয়ে সরাসরি দেখি মহুয়াকে। দেখলাম ও একমুখ পান নিয়ে চিবুচ্ছে। মুখটা কেমন টকটকে লাল করে একটা ছোট্ট মেয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছে। ভারী সুন্দর দেখাচ্ছিল। এরপর সুভাষ ইনস্টিটিউটে 'কলার' নাটক করতে গিয়ে মহুয়ার সঙ্গে আবার দেখা এবং সেই থেকে ঘনিষ্ঠতা শুরু। আমি 'সুবর্ণলতা' ছবির জন্যে মেয়ের ভূমিকায় একটি নতুন মেয়ে দু' বারবার মহুয়ার কথাই আমার মনে হয়েছিল।

ওকে বলতেই ও দারুণ খুশি। 'সুবর্ণলতা'র শুটিংয়ে ওকে আমি প্রতিদিন নিজের হাতে সাজিে দিতাম। 'সাহেব' ছবির শুটিং চলছে। হঠাৎ মহুয়া এসে প্রণাম করল। বললাম, হঠাৎ প্রণাম কেন ? মহুয়া মিষ্টি হেসে বলল, মা, আজ সবচেয়ে বেশি টাকার একটা কনটাক্ট সই করলাম। তাই তোমায় প্রণাম করলাম। মধুয়া ও তিলক যখন-তখন আমার বাড়িতে আসত। শুটিং শেষে ক্লান্ত হয়েও আসত মহুয়া থেকেছে। খেয়েছে। আমার মেয়েদের সঙ্গে এক খাটে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি সকালবেলায় ডেকে দিয়েছি। সকালে খাবার খাইয়ে স্টুডিয়ো পাঠিয়েছি। এমন অনেক ছোট্ট ছোট্ট স্মৃতি মনে পড়ছে। এ তো গেল আমার মেয়ে মহুয়ার কথা। শিল্পী মহুয়ার কথা বলতে গেলে বলতে হয় ওর মতো সুন্দর মুখ আমি আর খুজে পাচ্ছি না। এর অভন ক্ষমতা যে রানি ছিল ा ধারা 'আদমি আউর আওরত' দেখেছেন তারা বুঝতে পারবেন। ও বেঁচে থাকলে আমার থেকে অনেক বড় শিল্পী হতে পারত। মহুয়ার চলে যাওয়ায় বাংলা সিনেমা শিল্পের বড় ক্ষতি হয়ে গেল। মধুয়ার থেকে ভাল শিল্পী আসতে পারে কিন্তু মধুয়া আসবে না। উত্তমবাবু চলে গিয়ে বড় ফাক রেখে গেছেন। মহুয়াও গ্যাপ সৃষ্টি করে গেল। তবে উত্তমবাবু অনেক কিছু দিয়ে গেছেন। আর এই মেয়েটা যখন সবে কাজ শুরু করেছিল তখনই চলে গেল।

এ মৃত্যু বড় কষ্টদায়ক। এর কোনো সান্ত্বনা নেই।

এর সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল অক্ষয় তৃতীয়ার দিন একটি ছবির মহরত অনুষ্ঠানে। দুর্ঘটনার পর প্রথমদিন হাসপাতালে গিয়ে- ছিলাম। রত্না বলল, 'তুমি দেখো না। দৃশ্য তুমি সহা করতে পারবে না।" ভাই ভেতরে না ঢুকেই চলে এলাম।

আশা ও ভালবাসার জোরে সব সময় ভেবেছি ভাল হবে। কিন্তু আর দেখা হল না । মৃত্যুর পরও ওর মুখখানা দেখতে পেলাম না। সাদা চাদর দিয়ে মেয়েটার গোটা শরীরটা ছিল ঢাকা।

দু-সপ্তাহ আগে আমার বাবা ও মাসিকে চিরতরে হারিয়েছি। এদের মৃত্যুর ব্যাপারে আমার মানসিক প্রস্তুতি ছিল, কিন্তু মহুয়া আমায় দারুণ আঘাত দিয়েছে। এখনো পর্যন্ত মহুয়ার চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না। কাজকর্ম কিছু ভাল লাগছে না। করতে হয়, করে যা


মহুয়ার মৃতদেহের পাশে টেকনিসিয়ান স্টুডিওতে অশ্রুসজল চোখে উৎপলেন্দু চক্রবর্তী, রুমা গুহঠাকুরতা, মাধবী চক্রবর্তী ও আরও অনেকে


নিজের সম্পর্কে মহুয়া রায়চৌধুরীর বক্তব্য

  



আমার বাবা নীলাঞ্জন রায়চৌধুরী। অভিনয়ের প্রতি তার একটা অনুরাগ ছিলই, ফিল্মের কাজকর্মের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। তিনি তাঁর নিজের জীবনে যে স্বপ্ন দেখতেন তার অনেকটাই পূরণ করতে চেয়েছিলেন আমার মধ্য দিয়ে। আর তাছাড়া বলতে কি, আমাদের সংসারের অবস্থা তখন খুব একটা ভাল ছিল না। হয়ত ভেবেছিলেন আমি সিনেমায় চান্স পেয়ে গেলে তার আর্থিক দিকেরও কিছু সুরাহা হবে। আমি তখন নাচ শিখতাম—ইচ্ছে ছিল নৃত্যশিল্পী হব। সেটা আর হল না। ফিল্মসেন্স তো দূরে থাক, আমার যখন অভিনয় সম্পর্কেই বিশেষ কিছু আগ্রহ জন্মায়নি, বাবা তখন থেকেই আমাকে সিনেমার নামাবার জন্যে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। বলা বাহুল্য সেই সময়েই মেয়ের জনে। তাঁকে কিছু গল্পনা-লাঞ্ছনা সইতে হয়েছিল। ছেলেমানুষ হলেও সেটা বোঝার মত বয়েস আমার ছিল। যেমন ধরুন, বাবা আগেভাগে কথা বলেই কোনো পরিচালকের কাছে আমাকে নিয়ে গিয়েছেন-তো তিনি আমাকে দেখে একেবারেই বিরূপ আশাহত মন্তব্য করে বসলেন- এই আপনার ে কি হবে একে দিয়ে ভাল করে লেখাপড়া শেখান বিয়েথা দিন ইত্যাদি ।


বাবা আমার কাছে ধরা দিতে না চাইলেও লক্ষ্য করতাম প্রায় ধিকার প্ররূপ। । এইসব মন্তব্য শুনে বাবার মুখ শুকিয়ে যেত। তার কিছু নয়, সেটা দেখে আমার আত্মসম্মানে য লাগত। বাবাকে বলতাম- হ্যাঁ গো তুমি কি? আমাকে এইভাবে লোকের কাছে নিয়ে যাও, তারা আমার সঙ্গে তোমাকেও অপমান করে। চল বাড়ি চল, আমার কোনো দরকার নেই সিনেমা করবার।

কতদিন এমন হয়েছে, প্রায় কান্না এসে গেছে চোখে। বাবা কিন্তু দমতেন না, বরং আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে হাসতে হাসতে বলতেন—দূর কে কি বলল তাতেই এত চটে যেতে হয় নাকি তোর আবার এইটুকু বয়েসেই বেশি প্রেস্টিগমন। হয়ত সেটা ছিল, তাই ছোটবেলায় আমাকে সবাই ডাকত 'প্রেস্টিজ কুকার' বলে। বাবাও এই বলে খ্যাপাতেন তখন । আর বলতেন-কে তোকে ফিরিয়ে | দিল তাতেই তোর কিছু হবে না এটা ধরে আসলে তার নিজের মনের জেদটাকেই ফিরিয়ে আনার জানো। আর সেটা শেষ পর্যন্ত ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন বলেই তো এই আজকের আমি জানবেন, পারিবারিক দিক থেকে এই আমি সম্পূর্ণই আমার বাবার। তার স্বপ্ন কতটা সার্থক করতে পেরেছি জানি না, তবে নিশ্চয়ই কিছুটা পেরেছি। এটা ভেবে আমার আনন্দ হয়, অন্যদিকে কখনও-সখনও একটু মন খারাপ হয় বইকি, যখন ভাবি আমার মা। মাধবীলতা রায়চৌধুরী কিন্তু আমাকে একেবারেই অন্যভাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। আমাকে ঘিরে আমার মা-বাবার স্বপ্ন ছিল একেবারেই বিপরীতমুখী।

মা নিজে যথেষ্ট শিক্ষিতা, মহিলা হয়েও অনির্ভর, এখনও চাকরি করেন। তিনি চেয়েছিলেন আমি মন দিয়ে লেখাপড়া করি। আমার ফিল্ম লাইনে আসাটা আদৌ পছন্দ ছিল না তার। অনেকেই জানেন না, আমি খুব ছোট বয়েসে দুটি হিন্দি ছবিতে নেমেছিলাম—সেসব 'শ্রীমান পৃথ্বীরাজ'-এরও আগে। এই ছবি দুটিতে আমার নাম দেওয়া হয়েছিল বেবি সোনালি আসলে আমার নাম শিপ্রা। মেয়ের নাম সিনেমায় ব্যবহার হবে, মা এটা চাননি। আমার 'মহুয়া' নামটা তো আমার আরেক জন্মদাতার, আপনারা জানেন স্টুডিয়োর লোকজনদের কাছে, যিনি "তনুবাবু' নামে পরিচিত অর্থাৎ তরুণ মজুমদারের দেওয়া। কোন দূরদর্শিতায় জানি না, উনিই তো প্রথম আমার সম্ভাবনার কথা টের পেয়েছিলেন। 


মহুয়ার জীবন অবলম্বনে তৈরি হচ্ছে বায়োপিক যেখানে নামভূমিকায় অভিনয় করবেন অঙ্কিতা মল্লিক

 টলিউডের একসময়ের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন মহুয়া রায়চৌধুরী। তাঁর অভিনয় জীবনে দর্শকদের উপহার দিয়েছেন একের পর এক সফল ও স্মরণীয় সিনেমা। যদিও তাঁর আকস্মিক প্রয়াণ এখনও ভোলেননি বাংলা সিনেমার অনুরাগীরা। মৃত্যুর চার দশক পেরিয়ে গেলেও, আজও দর্শকমনে তিনি সমান উজ্জ্বল ও প্রাসঙ্গিক।


তাঁর অকাল মৃত্যু ঘিরে আজও তৈরি হয় অসংখ্য প্রশ্ন, যা ঘোর কাটায় না অনুরাগীদের। ঠিক কী হয়েছিল সেই রাতে? কী ছিল মহুয়া রায়চৌধুরীর অকাল মৃত্যুর নেপথ্যে?

এই রহস্য ও আবেগঘন অধ্যায় নিয়েই এবার বড় পর্দায় আসছে তাঁর জীবনীচিত্র—যা তুলে ধরবে সেই অধরা সত্যের খোঁজ।

অভিনেত্রী মহুয়া রায়চৌধুরীর ৬৭তম জন্মদিনে এক বড় ঘোষণার মাধ্যমে চমক দিলেন পরিচালক সোহিনী ভৌমিক। মহুয়ার জীবন অবলম্বনে তৈরি হচ্ছে বায়োপিক, যেখানে নামভূমিকায় অভিনয় করবেন টেলিভিশনের জনপ্রিয় মুখ ‘জগদ্ধাত্রী’ খ্যাত অঙ্কিতা মল্লিক।

এই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত অঙ্কিতা। সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালের সঙ্গে কথায় তিনি বলেন, “রানা দা-র কাছ থেকেই অফারটা পাই। তিনি আমাকে এই চরিত্রের জন্য ভেবেছেন—এটাই আমার কাছে অনেক বড় ব্যাপার। এমন একটি চরিত্রে, তাও আবার নিজের প্রথম ছবিতে কাজ করার সুযোগ পাওয়া সত্যিই সৌভাগ্যের। মহুয়া রায়চৌধুরীর মতো একজন আইকনিক অভিনেত্রীর চরিত্রে অভিনয় করা একদিকে যেমন সম্মানের, অন্যদিকে তেমনই চ্যালেঞ্জেরও।”

তবে কবে থেকে শুটিং শুরু হবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। ধারাবাহিকের পাশাপাশি সিনেমার কাজ কীভাবে সামলাবেন, তা এখনই ভাবছেন না অঙ্কিতা। আপাতত তিনি শুধু নিশ্চিত—“ছবিটা করছি, এটুকুই জানি।”

পর্দায় মহুয়া রায়চৌধুরীর চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ—অঙ্কিতা মল্লিকের কাছে নিঃসন্দেহে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। প্রথম ছবিতেই এতটা গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে আপ্লুত ‘জগদ্ধাত্রী’ খ্যাত অভিনেত্রী।

উল্লেখযোগ্য, জি বাংলার জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘জগদ্ধাত্রী’-তে জ্যাস সান্যাল চরিত্রে ইতিমধ্যেই দর্শকের মনে পাকাপোক্ত জায়গা করে নিয়েছেন অঙ্কিতা। ড্রয়িং রুমের চেনা মুখ এবার বড়পর্দায় ধরা দেবেন এক নতুন, গভীরতর চরিত্রে। মহুয়া রায়চৌধুরীর মতো এক আইকনিক অভিনেত্রীর ভূমিকায় তাঁকে দেখার অপেক্ষায় এখন অনুরাগীরা।

নিজের চরিত্র এবং প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত অঙ্কিতা। দর্শকদের সামনে এক ভিন্ন ছায়ায় ধরা দিতে চলেছেন তিনি। টেলিভিশনের গণ্ডি পেরিয়ে এবার বড়পর্দায় এক নতুন চমক দিতে প্রস্তুত এই তরুণ অভিনেত্রী।

শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ মুক্তির বছরখানেক পর মহুয়া রায়চৌধুরীর দীর্ঘ সাক্ষাৎকার

 বাংলা ছবির সেই সময়কার অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকা ছিলেন তিনি। তাঁর নামে প্রেক্ষাগৃহ হাউজ়ফুল হতো। প্রথম ছবি ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ মুক্তির বছরখানেক পর মহুয়া রায়চৌধুরীর দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন নির্মল ধর।



নির্মল ধর: ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ ছবিতে যখন অভিনয় করেন, তখন আপনার বয়স কত?

মহুয়া: তখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। বয়স আর কত হবে? আটান্ন সালে জন্ম। (জন্ম তারিখ জিজ্ঞাসা করায় পাশে বসা বাবা বললেন ছাপান্ন সাল। মা বললেন, না আটান্ন) আসলে বয়স বাড়িয়ে বা লুকিয়ে বলার কারণ কি জানেন? আমাকে সকলেই খুব বেশি বয়সী বলে ভেবে নেয়। আমার এখন সতেরো চলছে। কালকেই (২৬ সেপ্টেম্বর) জন্মদিন গেল।

প্রশ্ন: ফিল্মে কাজ করতে এসে পড়াশুনোর ক্ষতি হচ্ছে না?

মহুয়া: অসুবিধা তেমন কিছু হচ্ছে না। কাজের চাপে স্কুল ছেড়ে দিতে হয়েছে, এই আর কী! বাড়িতে টিউটরের কাছে নিয়মিত পড়ছি। সেভেনটি ফাইভে স্কুল ফাইনাল দেব। স্টুডিয়োয় যখন কাজ করি, কাজই করি। পড়াশোনার সময় পড়াশোনা। অসুবিধে কী হবে?

প্রশ্ন: ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’-এর শেষে আপনার এবং অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা চুম্বন দৃশ্য ছিল। সেটা সাজেশনে দেখিয়েছেন পরিচালক তরুণ মজুমদার। ওই দৃশ্যে অভিনয়ের আগে তরুণবাবু আপনাকে কীভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন?

মহুয়া: সত্যি কথা বলতে কী তরুণবাবু আমার কাছে কিছুই লুকোননি। পায়ের ওপর পা দিয়ে দাঁড়ালে দৃশ্যটার যে কী মিনিং হবে তা আমাকে বলে দিয়েছিলেন। আমারও খুব একটা অসুবিধা হয়নি। কারণ, এটা তো ঠিক, আগেকার দিনের ওই বয়সের মেয়ের চাইতে আজকালকার মেয়েরা অনেক বেশি জানে এবং বোঝে। প্রথমটায় একটু দ্বিধা-লজ্জা নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু আনন্দও কম ছিল না।

প্রশ্ন: বাংলা ছবিতে তাহলে চুম্বন দৃশ্য আসুক আপনি চান?

মহুয়া: হ্যাঁ, চাইব না কেন? তবে সুন্দরভাবে আসুক, অশ্লীলভাবে নয়। ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’-এই যেমন সিম্বল দিয়ে দেখানো হয়েছে, তেমন করেই হোক। ক্ষতি কি? ফেস-টু-ফেস কিসিং দেখাতেই হবে এমন তো কথা নেই! শৈল্পিক ভঙ্গিতে দেখানো চুম্বন দৃশ্য খারাপ লাগবে না।

প্রশ্ন: তরুণ অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ফিল্ম ইনস্টিটিউট বা ওই জাতীয় কোনও প্রতিষ্ঠান থেকে ফর্মাল ট্রেনিং থাকা কি অবশ্য দরকার?

মহুয়া: না, মোটেই না। আগেকার সব বিখ্যাত শিল্পীরা প্রায় কেউই কোনও ট্রেনিং পাননি। তাঁরা অভিনয় শিখেছেন কি করে? আসলে দরকার অভিনয়-ক্ষমতা। ওই জিনিসটা থাকলেই চলবে। না হলে সবই ফক্কা। প্রতিবছর তো পুণে ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে গুচ্ছের ছেলেমেয়ে পাশ করছে। বলুন তো, তাদের মধ্যে সবাই কি দাঁড়াতে পারছে? তবে হ্যাঁ, একটা তকমা থাকলে চান্স পাওয়া যায় মাঝেমধ্যে।

প্রশ্ন: অভিনয় সম্পর্কে থিয়োরিটিকাল বা প্র্যাকটিকাল কোনও অভিজ্ঞতারই প্রয়োজন নেই, আপনি এ কথাই বলতে চান?

মহুয়া: হ্যাঁ, মোটামুটি তাই বলতে চাই। পড়াশুনো করে যেটুকু জানার সেটা না জানলে খুব একটা ক্ষতি আছে কি? বরং অভিনয়ের প্র্যাকটিস করতে পারলে কাজ হয়।

প্রশ্ন: স্কুলে নিশ্চয়ই ‘তোমার জীবনের লক্ষ্য কী’ বা ওই জাতীয় কোনও রচনা লিখেছেন। কী লিখেছিলেন তখন?

মহুয়া: ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছি স্কুলে। নাইনে উঠে ছেড়ে দিয়েছি। ‘তোমার জীবনের লক্ষ্য’ নামে কোনও রচনা সৌভাগ্যক্রমে আমাকে লিখতে হয়নি। তবে ছোটবেলায় ভয়ানক ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হব। ডাক্তারদের বেশ থ্রিলিং লাইফ, তাই না?

প্রশ্ন: ডাক্তার তো হতে পারলেন না। আপশোস হচ্ছে না?

মহুয়া: হচ্ছে তো বটেই। কিন্তু এখন তো আর ডাক্তার হতে পারব না। ফিল্ম লাইনে চলে এসেছি। জেনারেল পড়াশুনাই চালাতে হচ্ছে প্রচণ্ড খেটে। তার ওপর আবার ডাক্তারি! হবে না। তবে কী জানেন, আমি অঙ্কে আর বিজ্ঞানে খুব ভালো ছিলাম। অঙ্কে আটের ঘরে আর বিজ্ঞানে ছয়ের ঘরের নীচে কোনওদিন নম্বর পাইনি। কিন্তু কী আর হবে! ভাগ্য সব পাল্টে দিচ্ছে!

প্রশ্ন: ফিল্মে অভিনয় করার ব্যাপারে বাড়ির কারওর  অমত ছিল? বা এখনও আছে কি?

মহুয়া: তেমন জোরাল কোনও অমত কারওর ছিল না। বলতে গেলে বাবার আপ্রাণ চেষ্টাতেই আজ আমি ফিল্মে চান্স পেয়েছি এবং পাচ্ছি। প্রথমটায় মায়ের একটু অমত ছিল। মৃদু আপত্তিও জানিয়েছিলেন। এখন অল কোয়ায়েট ইন দ্য হোম ফ্রন্ট বলতে পারেন।

প্রশ্ন: অভিনয়ের প্রতি আপনার আকর্ষণ এল কীভাবে বা কার কাছ থেকে?

মহুয়া: ছোটবেলায় পাড়ায় বিভিন্ন ফাংশনে নাচতাম। স্কুলেও নাটক করেছি দু’-একটা। বাবা আমার এই নাচের ব্যাপারটাকে বেশ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আমাকে ফিল্মে নামাবার জন্য তিনিই বহুদিন ধরে বহু লোকের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন। তাঁর চেষ্টা আজ সফল হতে চলেছে, এটাই আমার আনন্দের বিষয়।

প্রশ্ন: যদিও বেশিদিন কাজ করছেন না, তবুও এই অল্প ক’দিনে ফিল্ম লাইন সম্পর্কে আপনার কী ধারণা হয়েছে যদি অল্পকথায় বলেন?

মহুয়া: ফিল্ম লাইন সম্পর্কে বাইরের লোক হিসেবে খুব একটা পরিষ্কার ধারণা আমার ছিল না। এখনও যে ধারণাটা খুব স্পষ্ট, তা বলতে পারছি না। তবে এ লাইনে ভালো লোক যেমন আছেন, খারাপ লোকেরও অভাব নেই। খুব সাবধানে চলতে হচ্ছে। অনেকেই কথা দিয়ে কথা রাখেন না। এটাই খারাপ লাগে। এই তো কিছুদিন আগে একজন পরিচালক তাঁর ছবির জন্য আমাকে ঠিক করলেন। ক’দিন রিহার্সালও দিলাম। তারপর হঠাৎ কাগজে দেখলাম শিল্পী তালিকায় আমার নাম নেই। তা নিয়ে আমি কোনওদিন অভিযোগ করিনি কারওর কাছে। সেই পরিচালককেও কিছু বলিনি। আমার রিঅ্যাকশন তাঁকে বুঝতেই দিইনি। যা আছে আমার মনের মধ্যেই আছে। বরং একদিন রাস্তায় সেই পরিচালককে হন্যে হয়ে ট্যাক্সি খুঁজতে দেখে আমার গাড়িতে লিফট দিয়েছি। উনি সেদিন গাড়িতে বসে আমাকে বলেছিলেন, ‘মহুয়া, তোমাকে নিলেই বোধহয় ভালো হত। ছবিটা রিলিজ় করে যেত এতদিনে।’ এই ধরনের কথা দিয়ে কথা না রাখা ব্যাপারটা বড় খারাপ লাগে।

প্রশ্ন: ফিল্মের কোনও হিরো আপনাকে প্রেম নিবেদন করেছে এখনও পর্যন্ত?

মহুয়া: হ্যাঁ, সেরকম প্রস্তাব পেয়েছি। কিন্তু নামটা আমি বলতে পারব না। কাইন্ডলি অনুরোধ করবেন না।

প্রশ্ন: আপনার রিঅ্যাকশন কীরকম?

মহুয়া: ফিল্ম হিরোদের প্রেম সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই। এদের বেশিরভাগেরই চোখে একটা রঙিন চশমা আঁটা থাকে। আজ এই হিরোইনকে ভালো লাগে, কাল আমাকে, পরশু অন্য কাউকে। আসলে এদের চাহিদাটা একটা জায়গাতেই সীমাবদ্ধ। ফিল্ম হিরোর সঙ্গে প্রেম আমি ভাবতেই পারি না।

প্রশ্ন: তাহলে আপনার প্রেমের লাইফ ফিল্ম লাইনের বাইরেই থাকছে?

মহুয়া: হ্যাঁ, তাই।

প্রশ্ন: ফিল্ম লাইনের বাইরে কেউ আপনাকে প্রেম নিবেদন করেছে কি?

মহুয়া: আপাতত তেমন কেউ নেই। থাকলেও বুঝতে পারছেন ব্যাপারটা একান্তই ব্যক্তিগত এবং গোপনীয়। এর চাইতে বেশি আর কিছু বলতে পারব না।

প্রশ্ন: বাড়িতে আপনার বাবা-মা কি আপনাকে ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন?

মহুয়া: এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলি। আমার বাবা-মা কেউই তেমন অতিআধুনিক মাইন্ডেড নন। কিছু সংস্কার তাঁদের মধ্যে আছেই। তবুও আমার জীবনের কোনও ডিসিশন নেওয়ার আমার যেমন অধিকার আছে, বাবা-মায়ের মতকেও একেবারে উড়িয়ে দিতে পারব না। কিছু করার আগে একটু ভাবব। তবে কী না সবকিছুই সময়ের ওপর নির্ভর করে।

প্রশ্ন: উত্তমকুমার সম্পর্কে আপনার নিশ্চয়ই একটু বেশিই ঔৎসুক্য ছিল। এখন তো তাঁর সঙ্গে অভিনয় করছেন। ভাবতে কেমন লাগছে?

মহুয়া: সত্যি কথা বলতে কী, উত্তমকুমার বলতে মেয়েরা যেমন পাগল হয়ে যায়, আমি তেমন কোনওদিনই ছিলাম না। আমাদের পাড়ায় বহু ছবির শুটিং হয়েছে। পাড়ার সবাই ঝেঁটিয়ে গিয়েছে উত্তমকুমারকে দেখতে। মেয়েদের মধ্যে সে কী উত্তেজনা! আমি কিন্তু তেমন উৎসাহ পেতাম না। এখন তাঁর সঙ্গে অভিনয় করছি। ভাবলে আনন্দ লাগে অবশ্যই। ওঁর সঙ্গে কাজ করে আমি শিখছিও অনেক কিছু।


প্রশ্ন: কথায়-কথায় আসল ব্যাপারটা জানা হল না। ফিল্ম লাইনে আগে থেকে তো আপনার জানাশোনা কেউ ছিল না। তাহলে সুযোগ পেলেন কীভাবে?

মহুয়া: কোথা থেকে শুরু করব তাই ভাবছি। ঘটনা তো অনেক। ‘নয়া মিছিল’ ছবির একটা চরিত্রের জন্য মেক-আপ টেস্ট দিতে গিয়েছিলাম। পরিচালক পীযূষ গঙ্গোপাধ্যায়ের পছন্দ হল না। তখন মেক-আপম্যান জামাল সাহেব আমাকে তরুণবাবুর কাছে পাঠালেন। গেলাম। উনি দেখে-টেকে বললেন, ‘খবর দেব।’ এর আগেই অবশ্য গায়িকা বনশ্রী সেনগুপ্ত আমার একখানা ছবি তরুণবাবুকে দিয়েছিলেন। খবর পেলাম তরুণবাবু আমাকেই সিলেক্ট করেছেন। অবশ্য এতসব যোগাযোগের পিছনে বাবার আপ্রাণ পরিশ্রমটাই কাজ করেছে বেশি।

প্রশ্ন: আপনার সমসাময়িক নতুন নায়িকাদের সঙ্গে আপনি কোনও প্রতিযোগিতার ভাব বুঝতে পারছেন কি?

মহুয়া: না, তেমন কিছু আমি ফিল করিনি এখনও। আমার বয়স তো খুবই অল্প আর যাঁরা আছেন তাঁদের সঙ্গে এখনও আমার কম্পিটিশনের ব্যাপারটা আসেনি। যে ধরনের চরিত্র আমি করছি, সেখানে আমার বয়সি শিল্পীই বা কোথায়? অনেকেই আমার চাইতে বয়সে ও অভিজ্ঞতায় বড়।

প্রশ্ন: আপনার সাফল্য-ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?

মহুয়া: ছবিতে কাজ করছি, সবাই ভালো বলছেন। এটাই ভালো লাগছে। তবে আমি নিজে সন্তুষ্ট নই। বেশি আর কী বলতে পারি!

মহুয়া, বিয়ের পরে

 এখন মহুয়া চক্রবর্তী। শান্তশিষ্ট। বিয়ে করেছে ছ’মাস আগে। ওর বরের নাম তিলক চক্রবর্তী। স্টুডিওতেও এসেও সে টেলিফোনে অন্তত একবার কথা বলে নেয়। আ...