এখন মহুয়া চক্রবর্তী। শান্তশিষ্ট। বিয়ে করেছে ছ’মাস আগে। ওর বরের নাম তিলক চক্রবর্তী। স্টুডিওতেও এসেও সে টেলিফোনে অন্তত একবার কথা বলে নেয়। আউটডোরে গেলে ও সঙ্গে যায়। ছুটির দিন শুটিং করে না সিনেমা দেখতে যায়। মান-অভিমান হয় বেশি। ক্ষণিকের। বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারে না। এমন, আঘাত পেলে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে। পান খাওয়ার অভ্যেসটা ছাড়তে পারেনি। দাঁত কালো হয়ে যায় পান খেলে—কত উপদেশ শুনেছে, কান দেয়নি। পান না থাকলে গালে, গিসগিস মনেই হয় না, ও বলে।
আমি বলি, আমার বয়সী সব মেয়েরা, বিয়ে কর। জোক করে দিলীপ কি বলেছে...! সে যা খুশি বলুক, বিয়ের মত ঘটনা নেই জীবনে। যারা বিয়ে করেনি তারা বুঝবে না। যারা করেছে তারা বুঝবে। আমার অভিজ্ঞতা হাড়ে হাড়ে বোঝা। সেরকমভাবে বোঝবার সময় হয়নি। হলে সবাইকে নিশ্চয়ই জানাব।
**বিয়ের পর হানিমুন কোথায় হল?
: গাছের নিচে!
**বিয়ের পর বিশেষ কি খাওয়া হল?
: উঃ, ওটা আমি বলব না। আমি বলব, ঝালমুড়ি।
**বিয়ের পর বিশেষ কি কেনা হল?
: কাঁচের চুরি, রঙ-বেরঙের।
**বিয়ের আগে মন কি চেয়েছে?
: উড়ে বেড়াতে।
**বিয়ের আগে মন কি বলেছে?
: আমি ওকে ভালবাসি।
**বিয়ের আগে মন কি পেয়েছে?
: নির্ভরতা। আত্মবিশ্বাস। নিশ্চয়তা।
এই সময় ইন্দ্রপুরী স্টুডিওর চত্বরে গাছের ছায়ায় তুমি একটু স্থির হয়ে বস। মেক-আপ রুম থেকে কয়েকটি লাফ একলা এসে লেগেছে। একটু পরেই ত তুমি বেহুলা-চলে যাবে লক্ষ্মীন্দরের সন্ধানে। এমনিভাবে প্রতিদিন তুমি এক একটা চরিত্র হয়ে যাও। বাউলিয়া গ্রামে তোমাকে দেখলাম কোমর কাপড় বেঁধে গাছে উঠছ। কি যেন ছবির নাম? ‘প্রতিশ্রুতি’। তোমার নায়ক কে?
**বিয়ের আগে মোট কতগুলি ছবিতে অভিনয় করা হয়েছে?
: অত শত গুণে রাখিনি। মোটামুটি বলতে পারি, চৌদ্দ-পনেরোটা হবে।
**কে কে নায়ক ছিল?
: অনেকে। একাধিক ছবিতে ছিল পার্থ মুখোপাধ্যায়। পার্থর সঙ্গে নাকি একটু ভাব-ভালবাসা হয়েছিল?
: একসঙ্গে কয়েকটি ছবিতে কাজ করলে ওরকম হয়।
**বিয়ের পর মোট কতগুলি ছবিতে অভিনয় করা হয়েছে?
: অনেকগুলি। কুড়িটার বেশী।
**কে কে নায়ক?
: অনেকে। একাধিক ছবিতে সন্তু মুখোপাধ্যায়।
**তাহলে ইমেজ একইরকমই আছে?
: কেন থাকবে না। বিয়ে করলেই ত নায়িকারা বুড়ি হয়ে যায় না।
**বিয়ের আগে জীবনটা কেমনভাবে ভাবা ছিল?
: রেলপথের মত। হুশ হুশ করে চলে যাবে। মাঝে কোন স্টেশন থামবে না। একদম সোজা গন্তব্যে পৌঁছে যাবে।
**সিনেমা নামবার কথা মনে হল কেন?
: সত্যি কথা বলতে কি আমার মনে হয়নি কিছুই। বাবার হাত ধরে স্টুডিওতে আসতাম। ছোটবেলা থেকে নাচ শিক্ষার শখ ছিল। শিখেও ছিলাম। কিন্তু তেমনভাবে কাজে লাগল না। ফাংশনে বহুবার নাচ দেখাবার সুযোগ পেয়েছি। প্রশংসাও পেয়েছি। সিনেমায় নামব কোনদিন কল্পনাও করিনি। বাবা ছবির জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অনেকটা সেই সূত্রেই যোগাযোগ। অন্তত ভেবেচিন্তে নামিনি। আশ্চর্যের পর এটা হবে আরেক আশ্চর্য মোটা-মুটি ধারণা ছিল।
**বিয়ের আগে অভিনয় জীবন গড়ে তোলার কথা মনে হয়নি?
: নিশ্চয়ই মনে হয়েছে। প্রথম ছবিতে কাজ করবার পর অভিনয় সম্পর্কে কিছু জানা হল। সবচেয়ে বড় কথা অভিনয় করব—এটা আমার মনে হয়েছিল। নেহাতই পরদা মুখ দেখাতে এসেছি, ভাবলে হাসি পেত। তাই পরপর কয়েকটি ছবিতে কাজ করবার পর ঠিক করে ফেললাম যাঁর আমাকে অভিনেত্রী হতে হয় তাহলে সাধনা করতে হবে। সিনসিয়ারলি কাজ করতে হবে। অভিনয় সম্পর্কে রীতিমত পড়াশোনা করতে হবে। তা না হলে যশ, গ্ল্যামার নিয়ে টিকে থাকা যায় না—অন্তত ভালো ছবির ক্ষেত্রে।
তখন মহুয়া রায়চৌধুরী। অভিনয়কে মনে প্রাণে ভাল-বেসেছে। তার এক নতুন জীবন শুরু হয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাসে, কাঁদে কিংবা পাগলের মত অঙ্গভঙ্গি করে। জীবনকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখায় আগ্রহ তাকে দিনের পর দিন উদ্দীপিত করে।
এখন মহুয়া চক্রবর্তী। অভিনয় আর ব্যপ্তি জীবন পাশাপাশি রেখে এগিয়ে চলেছে। সিঁড়ির কয়েক ধাপ উঠে এসেছে। সামনে অনেক সিঁড়ি। অনেক রাস্তা। অনেক আলো। থমকে দাঁড়িয়ে থাকতে চায় না। পা ফসকে পড়ে যেতে চায় না। এক লাফে সব সিঁড়ি অতিক্রম করতে ধীরে-স্থিরভাবে এগিয়ে যেতে চায়। এগিয়ে যেতে চায়।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন