দেবশ্রী রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
দেবশ্রী রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

দেবশ্রী রায় মহুয়া রায়চৌধুরী নিয়ে কথা বলেছেন তার 37তম মৃত্যুবার্ষিকীতে

মহুয়া রায়চৌধুরীকে আমি ছোট্ট থেকে চিনি। আমি আর আমার দিদি কৃষ্ণা রুমকি-চুমকি নামে নাচ অনুষ্ঠান করতাম। মহুয়াদিও তখন তেমনই শিশু নৃত্যশিল্পী। বাড়ির নাম শিপ্রা। পোশাকি নাম সোনালি রায়চৌধুরী। ওঁর বাবা আমার মাকে বৌদি বলে ডাকতেন। সেই সময়ে একটি অ্যামেচার ক্লাব প্রতি রবিবার ছোটদের নাচের অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। আমরা তো যেতামই। মাঝেমধ্যে মহুয়াদিও অংশ নিতেন। সেই মহুয়াদি অভিনয়ে এলেন আমারই মতো। তরুণ মজুমদারের হাত ধরে। তনুদা ওঁরও নাম বদলে রাখলেন মহুয়া। প্রথম ছবি ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’।


এর পরেই আমরা একসঙ্গে ‘দাদার কীর্তি’ ছবিতে। তত দিনে মহুয়াদির বিয়ে হয়ে গিয়েছে। এক ছেলে গোলা-ও এসেছে কোলে। সে সব মায়ের মুখে শুনেছিলাম। আমাদের বয়সের অনেক ফারাক। তাই দিদি মায়ের সঙ্গে বেশি কথা বলতেন। আমার মা ছিল ওঁর ‘মাসিমা’। আমরা মহুয়াদির বর তিলক চক্রবর্তীকেও চিনতাম। তিলকদা মঞ্চে কিশোরকুমারের গান গাইতেন। সেই থেকেই প্রেম। মাকে বলেছিলেন, ‘‘মাসিমা, আমরা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছি।’’

সেটে কম কথা হলেও একটা জিনিস খেয়াল করতাম। দিদি বেশ মেজাজি। এই হাসিখুশি, কিছু ক্ষণ পরেই বেজায় রেগে গিয়েছেন। খুব রগচটা ছিলেন। আর রেগে গেলে অনেক সময়েই যা মুখে আসত, তা-ই বলতেন। শুনেছি, তখন নাকি গালিগালাজও করে বসতেন অনেককে। মাথা ঠান্ডা হলেই আবার সব ঠিক। এ সব দেখে এক এক সময়ে মনে হত, সংসার জীবনে কি সুখী ছিলেন না মহুয়াদি? প্রায়ই ওঁকে দেখতাম কেমন যেন অশান্ত। কিন্তু রূপটান নেওয়ার পর সে সব ভুলে যেতেন। অভিনয়ে কোনও দিন কোনও খামতি রাখতেন না।

আর ছেলে অন্তপ্রাণ ছিলেন। একমাত্র ছেলেকে চোখে হারাতেন। টালিগঞ্জের খুব কাছেই ভাড়াবাড়িতে থাকতেন ওঁরা। তখন ‘দাদার কীর্তি’র শ্যুট চলছে। এক বার শ্যুটের পরে নাকি তিলকদার বাইকে চেপে মহুয়াদিকে রাস্তায় ঘুরতে দেখেছিলেন সন্ধ্যা রায়। পর দিন মহুয়াদি স্টুডিয়োয় আসতেই তোড়ে বকুনি। সন্ধ্যাদির বক্তব্য, নায়িকাদের পথেঘাটে ঘুরতে দেখা গেলে আকর্ষণ থাকবে? বকুনি খেয়ে মুখ কাঁচুমাচু করে ফের আমার মায়ের কাছেই মহুয়াদি। বিষণ্ণ গলায় বলেছিলেন, ‘‘সন্ধ্যাদি কী বকলেন!’’ মা সে দিন বুঝিয়েছিলেন, সন্ধ্যাদি সবার মায়ের মতো। মায়েরা তো সন্তানদের ভাল-মন্দ বলবেনই, আগলাবেনও।

‘দাদার কীর্তি’র পর আরও একাধিক ছবিতে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। ‘সুবর্ণ গোলক’ ছবিতে আবার আমরা দুই বোন। ‘পারাবত প্রিয়া’য় মহুয়াদি নার্স হয়েছিলেন। যত ভাল অভিনেত্রী, সম্ভবত ততটাও সংসারী ছিলেন না। এক দিন স্টুডিয়োয় এসে সটান আমার ঘরে। আমি তখন ‘ভালবাসা ভালবাসা’-র শ্যুট করছি। বললেন, ‘‘বললেন, কল শো-তে গিয়ে আমার মেকআপ বক্স হারিয়ে ফেলেছি। তোরটা একটু দিবি? নইলে শ্যুট করতে পারব না!’’ শুনে একটু অবাকই হয়েছিলাম। সে দিন আমার সঙ্গে, তনুদার সঙ্গে অনেক গল্প করেছিলেন। অদ্ভুত ভাবে খুব শান্ত! তার পরে মেকআপ বক্স নিয়ে শ্যুট করতে গেলেন।

পর্দায় আমরা দুই বোন। কিন্তু বাস্তবে একদম বিপরীত। ভাল অভিনয়ের খিদে দু’জনেরই। পর্দা ভাগ করতে গিয়ে দু’জনেই সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করতাম। ফলে, সুস্থ প্রতিযোগিতা ছিল। প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা তলায় তলায় রাজনীতি করা— মাথাতেই আসত না। আরও একটি বিষয়ে মিল। আমার মতো মহুয়াদিও পশুপ্রেমী ছিলেন। স্টুডিয়োয় এসেই প্রথমে সমস্ত কুকুরদের খাওয়াতেন। তার পর কাজ শুরু করতেন। আমার প্রথম হিন্দি ছবি ‘জাস্টিস চৌধুরী’ মুক্তি পেল। তখন ছবির ভিডিয়ো ক্যাসেট পাওয়া যেত। রূপসজ্জাশিল্পী বুড়োকে ডেকে বলেছিলেন, ‘‘তুই আমার বাড়িতে আয়। একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করে আমরা চুমকির ছবিটা দেখব। ও তো আমাদের ঘরের মেয়ে।’’ এই সব গুণের জন্যই আমার মতো মহুয়াদিকেও ইন্ডাস্ট্রি ভীষণ ভালবাসত। ওঁর ‘আদমি ঔর অওরত’ আমার প্রিয় ছবি।

এ সবের মধ্যেই ১৯৮৫ সালে সর্বনাশা ২২ জুলাই। কী করে গায়ে আগুন লাগল? পুড়ে গিয়েছিলেন, না কি অন্য কিছু? সব উত্তর অজানা রেখেই বড্ড অসময়ে চলে গেলেন মহুয়াদি। অনেক কাজ বাকি ছিল। অনেক সম্মানও পাওনা ছিল। সেটে এসেও ছেলের কথা কিছুতেই ভুলতে পারতেন না। সব শিশুর মধ্যেই নিজের ছেলেকে খুঁজতেন। তাই বাচ্চাদের দেখলেই কাজ ফেলে খেলায় মেতে উঠতেন দিব্যি। নিজের ছেলে গোলাকে নিজের হাতে আর মানুষ করাই হল না মহুয়াদির! 


সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা

দেবশ্রী রায় মহুয়া রায়চৌধুরীকে যেভাবে দেখেন

 

দাদার কীর্তিতে মহুয়া ও দেবশ্রী

প্রবীণ অভিনেত্রী, দেবশ্রী রায় মহুয়া রায় চৌধুরীর সাথে কিছু মুহূর্ত স্মরণ করেন যিনি 22 জুলাই পর্যন্ত বাংলা সিনেমার শীর্ষ তারকা ছিলেন।

দেবশ্রী রায় বলেন, “আমরা শৈশবে জনপ্রিয় নৃত্যশিল্পী ছিলাম।” তরুণ মজুমদার তাকে শ্রীমন পৃথ্বীরাজ ছবিতে কাস্ট করেছিলেন এবং তার নাম পরিবর্তন করে মহুয়া রাখেন। বিয়ে করার সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৭। মহুয়া রায়চৌধুরী তিলক চক্রবর্তীকে বিয়ে করেছিলেন, যিনি শিশু শিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে কাজ করেছিলেন কিন্তু এরপর সিনেমায় তেমন একটা ক্যারিয়ার গড়তে পারেননি। এইভাবে মহুয়া রায়চৌধুরী তার পরিবারের উপার্জনকারী হয়ে ওঠেন। মহুয়া রায়চৌধুরী মাঝে মাঝে বিষণ্ণ থাকতেন।

দেবশ্রী রায় বলেন, "মহুয়া-দি খুব মেজাজি ছিল. কখনও কখনও তিনি অত্যন্ত হাসিখুশি এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ হতেন এবং অন্য সময় তিনি কথাও বলতেন না, আমি তার থেকে বেশ জুনিয়র ছিলাম এবং তাই সে প্রায়ই আমাকে বলত কি করতে হবে আর কি করা উচিত নয়।"

দেবশ্রী রায় একটি আউটডোর শ্যুটের কথা স্মরণ করেছেন যেখানে তিনি মহুয়া রায়চৌধুরীর সঙ্গে ছিলেন। “আমরা শিমুলতলায় শুটিং করছিলাম। সেখানে বৈদ্যুতিক সংযোগ না থাকায় আমরা একটি জেনারেটর নিয়ে গিয়েছিলাম। আমরা একটি প্রাসাদ বাড়িতে থাকতাম এবং পুরো পরিবেশটি বেশ রোমাঞ্চকর ছিল। ঠাকুরের তৈরি আশ্চর্যজনক খাবার ছিল বলে আমরা একসাথে কিছু খুব ভাল সময় কাটিয়েছি। সন্ধ্যা রায়ও আমাদের সাথে ছিলেন এবং তিনি প্রায়ই আমাদের গাইড করতেন এবং বকাঝকা করতেন।”

সুবর্ণ গোলক (1981) ছবিতেও দেবশ্রী রায় মহুয়া রায়চৌধুরীর সাথে কাজ করেছিলেন। "আমি একরকম অনুভব করেছি যে সে কখনই সুখী ছিল না," সে বলেছিল। "সে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিল কিন্তু তারপর শান্তি পায়নি। সম্ভবত সে কারণেই তার এমন মেজাজ পরিবর্তন ছিল।"

দেবশ্রী রায় মনে করেন যে তার মৃত্যুর রহস্যের সমাধান হয়নি। "প্রকৃতপক্ষে, আমরা এখনও তার মৃত্যুর সত্য সম্পর্কে অন্ধকারে রয়েছি। এটা আমাদের জন্য বেশ হতবাক ছিল. সে সময় অনেক ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন এবং শুটিংয়ে বাংলাদেশে যাওয়ারও কথা ছিল।

1983 সালে, দেবশ্রী একটি হিন্দি ছবি করেছিলেন - জাস্টিস চৌধুরী, মহুয়া বিখ্যাত মেকআপ শিল্পী অরূপ গাঙ্গুলীকে ডেকে বলেন "বুড়ো [গাঙ্গুলীর ডাকনাম], দেবশ্রী, আমাদের কলকাতার মেয়ে, বোম্বেতে একটা ফিল্ম করেছে, আপনি কি আমাকে ক্যাসেটটা দিতে পারেন?" এটা শুনে বেশ আনন্দ হয়েছিল যে পরে তারা সবাই একসাথে বসে আমার ফিল্ম দেখেছিল।

মহুয়ার সাথে শেষ দেখা হওয়ার কথাও দেবশ্রী দুঃখের সাথে স্মরণ করে। তিনি বলেন, "তাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন মানুষ মনে হচ্ছিল।" সে সময়ের অন্যান্য শিল্পীর মতো মহুয়া ওয়ান ওয়াল, যাকে এখন যাত্রা বলা হয়, অংশ নিতেন। আমি ভালোবাসা ভালোবাসা (1985) এর শুটিং করছিলাম এবং সে ওয়ান ওয়াল করছিল, যখন সেটে আমাদের দেখা হয়েছিল। আশ্চর্যজনকভাবে, তিনি নিজেই আমার মেকআপ রুমে এসেছিলেন এবং জিজ্ঞাসা করেছিলেন আমি কেমন আছি। আমি তাকে একটি আসন অফার করেছিলাম।"

তখন মহুয়া রায়চৌধুরী বলেন, তিনি বেশ বিরক্ত। দেবশ্রী কেন জিজ্ঞাসা করেছিলেন এবং তিনি উত্তর দিয়েছিলেন যে তিনি একটি যাত্রা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে হবে এবং তার পুরো মেকআপ কিটটি চুরি হয়ে গেছে এবং সেখানে তার দামী জিনিস ছিল। "তারপর তিনি আমাকে ভালোবাসা ভালোবাসায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করার জন্য অভিনন্দন জানালেন এবং হঠাৎ আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন" 

"সেদিন তিনি এতটাই স্নেহশীল ছিলেন যে এটি আমার জন্য আশ্চর্যজনক ছিল কারণ বেশিরভাগ সময়ই তিনি আমার সাথে বেশ কঠোর ছিলেন," দেবশ্রী রায় বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন। "তবে, সেদিন সে আমার সাথে খুব নরম ছিল। এবং কিছু দিন পরে, আমরা দুঃখজনক খবর পেলাম!"