মহুয়া রায়চৌধুরী সম্পর্কে চলচ্চিত্র জগতের ব্যক্তিত্বদের কিছু আলোচনার অংশ

 সম্পূর্ণ আলোচনাগুলো পাওয়া যাচ্ছে না, এখানে শুধু কিছু অংশ আছে



ওঁকে যেভাবে চরিত্রটা বুঝিয়েছিলাম, তার থেকেও অনেক অনেক ভালো করেছিল মহুয়া। একটি চরিত্রের কতটা গভীরে ঢোকা যায় সেটা ওর অভিনয়েই প্রকাশ পেয়েছিল। রোলটি করে দর্শকেরও প্রচুর প্রশংসা পেয়েছিল। ‘আমার দেখা অন্যতম সেরা অভিনেত্রী। ওাহারা! ওর বয়সটাও তো দেখতে হবে।’

মহুয়ার অভিনয়ের প্রসঙ্গে তরুণ মজুমদারের ছবি ‘দাদার কীর্তি’-র কথা অবশ্যই বলা প্রয়োজন। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনী। এ ছবিতেও সরস্বতী মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রে মহুয়ার অভিনয় দর্শকের প্রশংসা লাভ করে। আসলে কোনও রোলেই দর্শকদের আশাহত করেননি অভিনেত্রী। আর এটাই ছিল তাঁর অভিনয়ের সবথেকে বড় গুণ। সাধারণ একটি চরিত্রকেও অন্য পর্যায়ে অনায়াসে তুলে নিতে পারতেন মহুয়া। ‘দাদার কীর্তি’-তে তাপস পাল ছিলেন তাঁর বিপরীতে। ছবিটি ২৮.১১.৮০-তে মুক্তি পেয়েছিল। বলা বাহুল্য, এ ছবিটিও খুব ভালো চলেছিল। তাপস-মহুয়া জুটি ‘অনুরাগের ছোঁয়া’-ও বক্স অফিসে তুমুল সাড়া ফেলেছিল। টাইটেল ভূমিকায় অভিনয় করেন মহুয়া। ‘এই তো স্বর্গের’ নামে আরেকটি ছবিতেও টাইটেল ভূমিকায় ছিলেন তিনি। মারা যাওয়ার পরেও মহুয়ার বেশ কয়েকটি ছবি মুক্তি পায়।

মহুয়ার আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ছবি হল ‘শেফালিকা’, ‘কবিতা’, ‘দৌড়’, ‘উপলব্ধি’, ‘সাহেব’, ‘পাহাড়ী ফুল’, ‘মাদার’, ‘সুবর্ণগোলক’, ‘প্রতিশোধ’, ‘কপালকুণ্ডলা’, ‘আজ কাল পরশু-র গল্প’, ‘অমৃত কুম্ভের সন্ধানে’, ‘পারমা’, ‘আশীর্বাদ’, ‘রাজপুরুষ’ প্রভৃতি। ‘দৌড়’ ও ‘শেফালিকা’ দুটি ছবির পরিচালকই শঙ্কর ভট্টাচার্য। রবীন্দ্রনাথের ‘শেষরক্ষা’ ছবিতে ইন্দুমতীর চরিত্রে অভিনয় করে বি এফ জে এ পুরস্কার পেয়েছিলেন মহুয়া। তবে সবসময় বলতেন, ‘দর্শকদের ভালোবাসাই আমার সবথেকে বড় পুরস্কার।’ তেরো বছরে প্রায় একশোর কাছাকাছি ছবিতে অভিনয় করেছেন। যা একটি রেকর্ড।

১৯৭৬ সালের ২মে তিলক চক্রবর্তীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন মহুয়া। এক সময় মাষ্টার তিলক নামে কয়েকটি বাংলা ছবিতে অভিনয় করেন। তাঁরাও একটি পুত্রসন্তান। ডাকনাম গোলা, ভালো নাম তমাল। মহুয়ার নয়নের মণি ছিল গোলা। একবার শুটিংয়ের অবসরে আমাকে বলেছিলেন, ‘আমার ছেলের জন্যই আমাকে আরও অনেকদিন বাঁচতে হবে। গোলাকে পড়াশোনা করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করতে হবে। ওর বিয়ে দেব। ঠাকুরমা হওয়ার পরই যেন আমার পৃথিবী ছাড়ার ডাক আসে।’ মহুয়ার এই কথাগুলোর অনুরণন আজও হয় আমার মনে। অদৃষ্টের নিষ্ঠুর পরিহাসে সবকিছু ছেড়ে তাঁকে চলে যেতে হল। মহুয়া যখন মারা যান তখন তাঁর ছেলের বয়স মাত্র সাড়ে চার। আজ পূর্ণ বয়সের এক যুবক। মায়ের কথা নিশ্চয়ই তমালের মনে পড়ে। মহুয়া মারা যাওয়ার ঠিক এক মাসের মাথায় তাঁর ‘আশীর্বাদ’ ছবিটি ২২.৮.৮৬-তে রূপবাণী, অরুণা, ভারতী সহ অনেকগুলো প্রেক্ষাগৃহে একযোগে মুক্তি পায়। পরিচালক বীরেশ চট্টোপাধ্যায় সেই সময় মহুয়ার মৃত্যুতে শোকে মৃয়মান বজ্রাহত। বলার অপেক্ষা

সেই সময় এই সংলাপের সুর ধরে বহু মানুষকে বাসে-ট্রামে আলোচনা করতে শুনেছি— মহুয়া রায়চৌধুরী কি সত্যিই পারিবারিক জীবনে মনোকষ্টে ছিলেন?

মারা যাওয়ার আগের দিন বিকেলে মহুয়ার সঙ্গে নতুন চিত্রনাট্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েছিলেন বীরেশ চট্টোপাধ্যায়। বীরেশদা আমাকে বলেছিলেন, ‘মিষ্টি আলিপুরের যে ফ্ল্যাটে মহুয়া থাকত তার ওপরের ফ্ল্যাটে থাকতেন পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী। পরদিন প্রস্তাবিত ছবির নামে বিমর্ষ ছিল মহুয়া। মহুয়া বলল, চিন্তা কোরো না বীরেশদা সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। কিন্তু কেন জানি না ওঁর মুখ গম্ভীর লাগছিল। মুখের সেই হাসি দেখতে পেলাম না। ওক্‌ অদ্ভুত অস্থির লাগছিল ওকে। তিলকও ঘরে ছিল। কিন্তু আমাকে যেন চিনতেই পারল না। পরদিনই মহুয়ার আগুনে পুড়ে যাওয়ার মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কথা শুনলাম। মহুয়ার চোখো দিনের শুটিং বাকি ছিল। এ অবস্থায় ছবি রিলিজ করা কখনওই সম্ভব নয়। প্রযোজক প্রবীর মজুমদারের তো মাথায় হাত। ছবিটি অনেক কায়দা করে কমপ্লিট করলাম। মুক্তিও পেল। দারুণ চলেছিল। মহুয়া ছিল সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের ঘরানার শিল্পী।’ ১৯৮৬ সালের ১২-১৩ জুলাইয়ের মধ্যরাত। নিজের ফ্ল্যাটেই আগুনে রহস্যজনকভাবে পুড়ে গেলেন মহুয়া। বাক্‌ শক্তি শূন্য। তাঁকে ভর্তি করা হল ক্যালকাটা হাসপাতালে। দশ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন মহুয়া। বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সফল এক নায়িকার বর্ণময় জীবনের এখানেই ইতি।

পুলিশ তদন্ত শুরু করল। মহুয়ার বাড়ি থেকে বলা হল, স্টোভ সরাতে গিয়ে হঠাৎ স্টোভ ফেটে গায়ে আগুন ধরে যায় তাঁর। কিন্তু পরে পুলিশের তদন্তে প্রমাণিত হয় যে, স্টোভ ফেটে গায়ে আগুন লাগার ব্যাপারটা পুরোপুরি বানানো। কারণ, সেটে এক ফোঁটাও কেরোসিন তেল ছিল না। বরং মহুয়াকে যখন হাসপাতালে আনা হয় সেই সময় এমার্জেন্সি বিভাগের চিকিৎসকরা তাঁর সারা শরীর থেকে কেরোসিনের গন্ধ পেয়েছিলেন। মহুয়ার মৃত্যু নিয়ে একবার অভিনেতা ও তৃণমূল বিধায়ক চিরঞ্জিবের সাথে আমার কথা হয়। তাঁরা একসঙ্গে কয়েকটি ছবিতে কাজ করেছিলেন। চিরঞ্জিব আমাকে বলেছিলেন, ‘মহুয়ার মতো মেয়ে নিজে থেকে মরতে পারে না। যতদূর সম্ভব কোনও বড় রহস্য আছে। বা ওর মৃত্যুর সঙ্গে তিলকের ভাগ্য গড়ে উঠেছে?’

মহুয়ার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী অভিনেত্রী শ্রীমতী ভদ্র ঘোষাল এই দুর্ঘটনার পর একের পর বার হাসপাতালে গিয়েছেন। তাঁর মতে এটি নিশ্চিতই দুর্ঘটনা। এমনকী মহুয়াও সি আই ডি অফিসারদের মৃত্যুকালীন জবানবন্দি দিয়েছেন— তাঁর গায়ে আগুন লাগাটা দুর্ঘটনা ছাড়া কিচ্ছু নয়। তবে প্রশ্ন একটাই— কাকে বাঁচাতে গিয়ে আর জীবন বাঁচাই বা মহুয়া এই জবানবন্দি দিতে বাধ্য হন?


বলেছিল, ‘আমার দেখা বাংলা ছবির অন্যতম প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী মহুয়া। ওই বয়সে ওর মতো অভিনেত্রী টালিগঞ্জে কেউ ছিল না। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার বেশিদিন বাঁচল না। যদি বেঁচে থাকত আরও কত কী যে করে দেখাত কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। একের পর এক ছবিতে ওর ভূয়সীপ্রশংসা কাজ গোটা বাংলা ইন্ডাস্ট্রিকে একেবারে হতবাক করে দিয়েছিল। মহুয়ার শটগুলো মনিটরে দেখে ভাবতাম, ওর মতো আমি অভিনয় করতে পারি না কেন? ছোট্ট একটা উদাহরণ দিচ্ছি। কোনও কিছু আমাদের পছন্দ না হলে কখনও কখনও এক ধরনের বিরক্তি আমাদের চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ে। কণ্ঠস্বরে পরিবর্তন ঘটে। আমি জানি না মহুয়া এটা কীভাবে রপ্ত করেছিল, তবে এরকম কোনও সিন থাকলে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ওর চেহারাটাই আমূল বদলে যেত। এটা পারতেন উত্তমদা, সুচিত্রা সেন, সাবিত্রীদির মতো হাতেগোনা কয়েকজন। আসলে ব্যক্তিগত জীবনে মহুয়ার প্রচুর মানসিক জ্বালা-যন্ত্রণা ছিল। যেটা কোনও দিনই কারও কাছে মন খুলে বলতে পারেনি। সেটা প্রকাশ পেত ওর অভিনয়ে। মহুয়ার ক্ষতি অনেকেই অনেকভাবে করেছে। মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকেছে। কিন্তু কারও প্রতি অনুযোগ ছিল না ওর।’

ছবি নিয়েই পার্থর সঙ্গে একবার ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল মহুয়ার। জিজ্ঞাসা করলাম— তোমাদের ভুল বোঝাবুঝি কীভাবে মিটল? বলল, ‘সে অনেক কথা। সংক্ষেপেই বলি, তখন আমি কিছুদিন হল বিয়ে করেছি। একদিন মহুয়া আমাদের ফ্ল্যাটে এসে আমার স্ত্রীকে বলল, তোমাদের ফ্ল্যাটে আমাকে দিনসাতেক থাকতে দেবে? আমার বাড়ির এমনই পরিবেশ যে সেখানে আর থাকতে পারছি না। ওর প্রায় কাঁদো কাঁদো মুখ দেখে আমার খুব খারাপ লেগেছিল। সেই সময় আমরা লাঞ্চ করছিলাম। ইলিশ মাছ দেখে মহুয়াও বলল, আমিও ইলিশ মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাব। ওর প্রিয় মাছ ইলিশ। খুব তৃপ্তি করে খেল। আমাকে বলেছিল, পার্থ তুমি কিছু মনে কোরো না। ‘অবশেষে’ ছবিতে কাজ না করাটা আমার ভুল ডিসিসন। বাস, আমারও ওর ওপর থেকে সব অভিমান দূর হয়ে গেল। মহুয়া খুব সরল-সোজা মানুষ ছিল।’ পার্থ বলল, ‘মহুয়াকে নিয়ে একটা ঘটনার কথা না বলে থাকতে পারছি না। আনোয়ার শা রোডে এন টি টু-তে (নিউ থিয়েটার্স দু’নম্বর স্টুডিও) ‘বেহুলা লখীন্দর’ ছবির শুটিং হচ্ছিল। বেহুলার ভূমিকায় মহুয়া। ও আমাকে লাঞ্চে ডেকেছিল। সেদিন লাঞ্চের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়ে একটা আশ্চর্য ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইলাম। এই ঘটনা আমার মনে কিছুটা আতঙ্কেরও সৃষ্টি করেছিল। তখন সবে শুটিং-ব্রেক হয়েছে। ফ্লোরে গিয়ে দেখলাম, মহুয়ার হাতে কয়েকটা সরু সরু একেবারে জ্যান্ত সাপ! আমাকে দেখে খুশি হয়ে বলল, তুমি এসেছ। সাপগুলোকে দু’হাতে তুলে আমাকে দেখিয়ে হেসে বলল, ভয় পেয়ো না। এগুলোর বিষ নেই। এরপর দেখি, জিভ বার করে সাপগুলোর মুখে ছোঁয়াচ্ছে। চুমু খাচ্ছে। মহুয়ার এসব কাণ্ডকারখানা দেখে তো আমি তাজ্জব! ভয় পাওয়াই কথা। বাইচান্স বিষ থাকলে তখন কী হবে? মহুয়ার কিন্তু কোনও তাপ-উত্তাপ নেই। ও হাসছে আর সাপগুলোকে আদর করছে। পরে লাঞ্চ-ব্রেক হতেই প্রোডাকশনের লোক এসে সাপগুলো নিয়ে গেল। এই হল মহুয়া। কোনও কিছুতেই যেন পরোয়া করত না। ওর মৃত্যুতে

একের পর এক ছবির সাফল্য আর উত্তরোত্তর জনপ্রিয়তা কিন্তু মহুয়ার মাথা ঘুরিয়ে দেয়নি। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েটি দু’হাতে বিস্তর টাকা-পয়সা রোজগার করলেও তাঁর স্বাভাবিক আচার- আচরণে তার বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়েনি। পাশের বাড়ির মেয়ের একটা ইমেজ তাঁর বরাবরই ছিল দর্শকদের মনে। আম জনতার এই অকৃপণ ভালোবাসাই ছিল মহুয়ার আসল চালিকা শক্তি। দর্শকরা চিরকালই তাঁকে বিশেষ স্নেহের চোখেই দেখেছেন। মহুয়ার গানে লিপ দেওয়ার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। আসলে ছোটবেলা থেকেই গানের তালে তালে তাঁর পা দুটোও নেচে উঠত। তাঁর পায়ের ছন্দ, চোখ-মুখের এক্সপ্রেশনে এক অন্য শিল্প ধরা পড়ত। তাঁর সমসাময়িক অভিনেত্রীদের মধ্যে একমাত্র দেবশ্রী রায় ছাড়া নাচ তেমন কেউ জানতেন না। অবশ্য নায়িকা হিসেবে দেবশ্রীর উত্থান মহুয়া চিরবিদায় নেওয়ার পরই। ক্লাসিক্যাল ও মডার্ন ডান্স দুটোতেই সমান পারদর্শিনী ছিলেন মহুয়া। তাঁর আরও একটা বিশেষ গুণ, সায়লেন্ট অ্যাক্টিং। ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’-এ মহুয়াকে দিয়ে এই নীরব অভিনয়টাই করিয়েছিলেন তরুণ মজুমদার। এ ছবিতে মহুয়ার মতো একেবারে আনকোরা অভিনেত্রী ‘সখী ভাবনা কাহারে বলে’ রবীন্দ্রসংগীতে কী সুন্দরই না লিপ দিয়েছিলেন। আবার ‘যে যেখানে দাঁড়িয়ে’ ছবিতে জিপের মধ্যে বসে গাইছেন ‘ওই নীল দিগন্তে ফুলের আগুন লাগল’ কিংবা শুধু রবীন্দ্রসংগীত নয়, এমনি বহু গানও তাঁর লিপে পর্দায় অন্য আবেদন বয়ে এনেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, মহুয়া ছিলেন বর্ণ আর্টিস্ট। জাত শিল্পী। এরকম ন্যাচারাল অ্যাক্ট্রেস বাংলা ছবিতে খুব বেশি আসেননি। তবে একথাও ঠিক, বেশ কিছু আজেবাজে ছবিতে কাজ করে মহুয়া তাঁর অভিনয় প্রতিভার অপচয় ঘটিয়েছেন। তাঁর নামেই এক সময় বাংলা ছবি চলত।

উত্তমকুমার মারা যাওয়ার কয়েক বছর পর বাংলা ছবির মরা গাঙে আবারও জোয়ারের স্রোত এনেছিলেন মহুয়াই। ’৮৪-র ১৫ জুন মহুয়া অভিনীত ‘লাল গোলাপ’ ছবিটির হাত ধরেই বাংলা ছবির বক্স অফিস পুনরায় চাঙ্গা হয়ে ওঠে। আর সে বছরই ৭ ডিসেম্বর প্রয়াত পরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর ‘শত্রু’ বক্স অফিসের সমস্ত হিসেব-নিকেশ উলটে সুপার-ডুপার হয়। এ ছবিতেও মহুয়ার উজ্জ্বল উপস্থিতি ভোলার নয়। ১৯৮৪ সালেই দূরদর্শনের ন্যাশনাল নেটওয়ার্কের জন্য তৈরি তপন সিংহের ‘আদমি অউর ঔরত’ ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রতিভার অনন্য নজির গড়েন মহুয়া। এক দেহাতীর ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয়! তাঁর বিপরীতে ছিলেন অমল পালেকর। মহুয়া সম্পর্কে তপনদার কথাগুলো আজও আমার স্মরণে আছে। ‘মহুয়ার মতো শিল্পী বাংলা ছবির সম্পদ ছিল। বিরল প্রতিভার অধিকারিনী। মাঝে মাঝে স্মিতা মানে অভিনেত্রী স্মিতা পাতিলের কথা আমার মনে পড়ে। দেখো স্মিতাও তো কত তাড়াতাড়ি চলে গেল। ওদের দুজনের অভিনয়, মৃত্যু সবকিছুর মধ্যেই অদ্ভুত একটা মিল যেন খুঁজে পাই। মহুয়া যদি বেঁচে থাকত অভিনেত্রী হিসেবে আজ এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যেত। ‘আদমি অউর ঔরত’-এর কথা কী আর বলব।

উৎস: একটি ম্যাগাজিন থেকে 


২২ জুলাই, ভোর ৩-৪৫-এ বাংলা চলচ্চিত্রের শুকতারা মহুয়া রায়চৌধুরী রূপালী পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রায় অচেতন অবস্থায়, সকলের অজ্ঞাতে ব্যস্ততমা এই নায়িকা বিদায় নিলেন। কাঁদিয়ে গেলেন স্বামী তিলক, শিশুপুত্র তমাল, মা, বাবা, কাকা, দিদি এবং অগণিত চলচ্চিত্রানুরাগীকে।

মহুয়া রায়চৌধুরী গত ১১ জুলাই বৃহস্পতিবার গভীর রাতে নিজের বাড়িতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে ডায়মন্ড-হারবার রোডের কালকাটা মেডিকাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। সুচিত্রা সেনের পর, টালিগঞ্জের স্টুডিও মহলে এইরকম 'পিক পিরিয়ড' প্রবাহকালে কোন নায়িকার নাকি আসেনি। তাই মহুয়ার এই আকস্মিক অগ্নিদগ্ধ হবার ঘটনা স্টুডিওপাড়ার সঙ্গে যুক্ত সব তাঁর ও সাধারণ মানুষকেও হতবিহ্বল করে দেয়। শুরু হয় নানা জল্পনা-কল্পনা এবং ছড়িয়ে পড়ে নানা গুজব। মহুয়ার আগুন হবার মূলে কোন দুরাভিসন্ধি কাজ করেছে, না এটা নিছকই দুর্ঘটনা, কিংবা আত্ম-হত্যার চেষ্টা?

এমন সন্দেহ সকলের মনেই জেগে ওঠে। সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয় বিভিন্ন সংবাদপত্রে মহুয়ার স্বামী তিলক চক্রবর্তী এবং বাবা নীলাঞ্জন রায়চৌধুরীর পরস্পরবিরোধী বিবৃতিতে। যদিও এদের দুজনের মধ্যে কেউই আগুন লাগার সময় মহুয়ার সামনে ছিলেন না। ছিলেন নিজেদের ঘরে ঈষৎ তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায়। মহুয়ার চিৎকারে প্রথমে তাঁর স্বামী এবং স্বামীর ডাকাহাকে মহুয়ার বাবা জেগে ওঠেন। তবুও মহুয়ার স্বামী তিলকবাবু কোন সংবাদপত্রের প্রতিনিধিকে নাকি বলেছিলেন, 'স্টোভ বার্স্ট' করে মহুয়ার গায়ে আগুন লেগেছে। পুলিশ তাঁদের প্রাথমিক তদন্তে এই 'স্টোভ বার্স্ট'-এর কথা উড়িয়ে দেন। গত ১৪ জুলাই, রবিবার বেহালা থানায় যখন যোগাযোগ করতে যাই তখন একজন পদস্থ পুলিশ অফিসারের কাছ থেকে জানতে পারি, 'স্টোভ বার্স্ট করার মত সাক্ষ্য-প্রমাণ আমরা পাইনি।' মহুয়ার বাবা নীলাঞ্জন রায়চৌধুরীর কথায় 'স্টোভে তরকারি গরম করতে গিয়ে আগুন লাগে।'

এরপর প্রায় পাঁচদিন বাদে অবস্থার একটু উন্নতি হলে মহুয়া নিজেই গোয়েন্দা অফিসারদের জানিয়েছিলেন যে স্টোভ থেকেই তাঁর গায়ে আগুন লেগেছিল, অগ্নিদগ্ধ মহুয়াকে প্রথম দেখেছেন তাঁর স্বামী তিলক চক্রবর্তী। সে কারণে গত ১৪ জুলাই সকালে ৪৭/১/এ এস এন রায় রোডে মহুয়ার ফ্ল্যাটে তিলকবাবুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সে ফ্ল্যাটে সপুত্র মহুয়া এবং তিলক ছাড়াও থাকেন মহুয়ার বাবা নীলাঞ্জন রায়চৌধুরী। সেখানে তিলকবাবুর সঙ্গে দেখা করতে না পেরে নীলাঞ্জনবাবুকে জিজ্ঞাসা করি, তাঁর মেয়ের শরীরে কীভাবে আগুন লাগে?

নীলাঞ্জনবাবুর দু হাতের আঙু-লেই বার্নলের প্রলেপ ভেদ করে পোড়াজনিত ফোস্কা উঁকি মারছে। নীলাঞ্জনবাবু বলেন, 'আমার মেয়ে, জামাই, ওর মেক-আপম্যান, হেয়ার ড্রেসার এখানে বসে রাত্রি দশটা অবধি ভিডিও দেখেছে। ভিডিও দেখে মাংস-রুটি খেয়েছে, খেয়ে মেক-আপম্যান ও হেয়ার ড্রেসার চলে গেছে। এরমধ্যে একটা ছবির পরিচালকও এসেছিলেন।
ওর নাচের রিহার্সালের ব্যাপারে কথা বলতে। তারপর সবাই চলে গেলে ওরা (মহুয়া এবং তিলক) ওপরে অঞ্জনএর (চৌধুরী) ফ্ল্যাটে গেছে। গল্পসল্প করে তারা সাড়ে এগারোটার সময় এসেছে। নিজেরা হাসতে হাসতে ঢুকেছে, আমি সব শুনেছি। তিলক আমার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ওকে বলল, 'আমি খাব না, শুয়ে পড়ছি। তুমি তাড়াতাড়ি করে শুয়ে পড়।' এখন মেয়েদের তো জানেন, টুকটাক কাজ থাকে। ও সব কাজ করছে। আমি শুয়ে শুয়ে সব টের পাচ্ছি। এই করতে করতে আমার চোখটা ঘুমে জুড়ে এসেছিল। বোধহয় মিনিট পনের হবে। তিলকেরও বোধহয় চোখটা একটু লেগে এসেছিল। কিন্তু ওর (তিলকের) গায়ে আগুনের তাপ লাগামাত্রই ও জেগে উঠে চিৎকার করে উঠেছে, 'মেসো মশাই শিখনগিরি আসেন, সর্বনাশ হয়ে গেছে।' আগুন ধরার সঙ্গে সঙ্গে টুটুন (মহুয়ার ডাক নাম) দৌড়ে গিয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে। আমি গিয়ে প্রথমে তো হতভম্ভ। হাত দিয়ে আগুন নেভাতে গেছি। কিন্তু ছ্যাঁকা লাগতেই আমার সেন্স ফিরে এসেছে। আমি মনে মনে ভাবছি, এ আমি কী করছি। এইভাবে তো আগুন নেভানো যায় না। তখনই বিছানার হেডকভারের নিচে লেপ পাতা ছিল, আমি সরে গিয়ে তাড়াতাড়ি করে লেপটা দিয়ে ওকে জাপটে ধরেছিলাম।'

কিন্তু আগুন কীভাবে লেগেছিল? নীলাঞ্জনবাবু একটু ভেবে নিয়ে বললেন, 'আমার যতদূর সম্ভব মনে হয়, আমি যখন পরে রান্নাঘরে গেছি, গিয়ে দেখছি স্টোভের নিচেটা কাত হয়ে গেছে। আর স্টোভের ওপরের যে জিনিসগুলো, সব নিচে পড়ে আছে। আর এই স্টোভটাতে রান্না করতে গেলে মাঝে মাঝেই বার্স্ট করার মত ভুপ করে আগুন জ্বলে পলতে ধরনের জায়গাটা ওপরের দিকে উঠে যায়। আমাদের কাজের মেয়েটা দু-তিন দিন আমাকে বলেছে, 'দাদু, স্টোভটা বড় গোলমাল করে, রান্না করতে করতে হঠাৎ হঠাৎ দপ করে ওপরে উঠে যায়।' এই স্টোভেই মহুয়া একটা সসপ্যানে তরকারি গরম করতে গিয়েছিল। সসপ্যানটারও একটা গোলমাল আছে। হাতলটা হেভি তো, সসপ্যানটা ঠিকমত না রাখলে কাৎ হয়ে যায়। আমার মনে হয় সেদিন সসপ্যানটা কাৎ হয়ে গোঁফল এবং তখন সরাতে গিয়ে এই কাণ্ড ঘটেছে। আমার মনে হয়, যেটাতে স্টোভের পলতে থাকে, সেটা উল্টে গিয়ে, আগুন সুদ্ধ পলতে ওর গায়ে পড়ে এই কাণ্ড ঘটেছে।'

যদিও স্টুডিওপাড়ার বেশ কিছু ব্যক্তি, বিভিন্ন সংবাদপত্র এবং এস এন রায় রোডের বাসিন্দা কয়েকজন যুবকের অভিমত মহুয়া আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু স্বয়ং মহুয়াই যেখানে বলেছেন, স্টোভ থেকেই তাঁর গায়ে আগুন লেগেছিল, সেখানে এই বিষয়ে আর কোন প্রশ্ন না তোলাই স্বাভাবিক। মহুয়ার দিদি শান্তা দেবীও আত্মহত্যার চেষ্টা কথা উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, 'সব মোস্ট ফালতু কথা।' আর বাবা নীলাঞ্জন রায়চৌধুরী বলেছেন, 'আমার মেয়ে ও তিলক যে সুন্দরভাবে জীবনযাপন করছে, সেই সুন্দর দুটো জীবনকে নষ্ট করার জন্য কিছু লোক এটা করছে এবং আমার যতদূর ধারণা কিছু লোক পুলিশকে এটার জন্য খোঁচাচ্ছে।' মহুয়ার দিদি ও বাবা মহুয়ার মতোই বলেছেন, এটা একটা দুর্ঘটনা ছাড়া আর কিছুই নয়।

মহুয়ার পাড়া-প্রতিবেশী বেশ কয়েকজন মহুয়ার স্বামী তিলক সম্পর্কে কিছু বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন, কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রের একজন প্রবীণ অভিনেতা কথা প্রসঙ্গে বলেন, 'এটা একদম বাজে কথা। তিলকের মত ভাল ছেলে হয় না।' মহুয়ার দিদি শান্তা দেবীও বলেন, 'দুটো বাসোন এক জায়গায় থাকলেও তো ঠুং-ঠাং করে। কিন্তু টুটুনদের তো অলস সংসার ছিল না। ও তো ভালভাবেই সংসার করছিল। ওরা কোন কারণেই অসুখী ছিল না।'

তিলকবাবুর সঙ্গে মহুয়ার সম্পর্ক কেমন ছিল জানতে হাজির হয়েছিলাম, মহুয়ার ফ্ল্যাটেরই দোতলায় ডান দিকের ফ্ল্যাটে। এখানে থাকেন চলচ্চিত্র পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার অঞ্জন চৌধুরী। অঞ্জনবাবুর বাড়ি থেকে ঘুরে আসার পরই মহুয়া অগ্নিদগ্ধ হন। অঞ্জনবাবু বললেন, 'না, আমি অন্তত বেশ কয়েক মাস এখানে বাস করছি। কোনদিন মারামারির ব্যাপার হয়েছে বলে শুনিনি বা জানি না। তবে খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে ঝগড়া তো সব স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই হয়। কেউ যদি বলেন, না আমার স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া হয় না, সেটা মিথ্যা কথা বলা হয়। কারণ রাগ থেকেই তো অনুরাগ আসে। তাই খুঁটিনাটি ঝগড়া থেকেও এতদূর টেনে নিয়ে যাবে বলে মনে হয় না। এটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট। আর তাছাড়া মহুয়ার বাবা যেখানে রয়েছেন,
রাতে ও যখন আমার বাড়িতে এসেছিল, তখন কিন্তু ও ভীষণ গো মুডে ছিল। আমার একটা ছবিতে ও চুক্তিবদ্ধ হবার পর, তিলকই বলেছিল, দাদা, কালকে একটা খাওয়া-দাওয়া করা যাক। কারণ ওই রোলটা প্রথমে ঠিক ছিল বম্বের এক নায়িকাকে দিয়ে করানো হবে। আমিই প্রোডিউসারকে সাজেস্ট করেছিলাম ওটা মহুয়াকে দিয়ে করানোর জন্য। তিলক আমাকে বলেছিল, 'অঞ্জনদা, রোলটা মারাত্মক ভাল। যদি রোলটা মৌ পায়, তাহলে আমি খরচ করব, খাওয়াব।' তা সেইজন্য তিলক পরদিন খাওয়া-দাওয়ার কথা বলেছিল। মহুয়া বলল, গৌতম (আমার ভাই) মাংস আনবে, আমার স্ত্রী রাঁধবে। এই নিয়ে ও একটা প্রচণ্ড মেজাজে ছিল। ওকে আমি অনেকদিন পর এত মেজাজে দেখেছিলাম।'


মহুয়া হাসপাতালে ভর্তি হবার পরদিন, অর্থাৎ শুক্রবার বেলা ১২টা নাগাদ সমিত ভঞ্জের সঙ্গে মহুয়ার মেক-আপ ম্যান ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি অরূপ (বুড়ো) গাঙ্গুলি হাসপাতালে যান। অরূপ বলেন, 'আগের দিন রাত দশটা অবধি আমরা মৌ-র সঙ্গে কাটিয়েছি। সন্ধেবেলা ভিডিও দেখেছি। তারপর ১০টা নাগাদ আমি ও অসীমান্ত উঠে পড়ি। তার আগে দুটি মাংস খেয়েছি ওর বাড়িতে। তাই বুড়ুদা (সমিত) যখন আমাকে খবরটা দিল, তখন বিশ্বাসই পারিনি। তারপর বুড়ুদার সঙ্গে হাসপাতালে এলাম। আমরা ঢুকতেই মৌ বুড়ুদাকে বলল, মনখারাপ করিস না। ভালভাবে পার্ট করিস। বুড়ুদা বলল, বুড়ো এসেছে, মৌ বলল—ওকে ডাক। আমি ঢুকতেই, মৌ ওর দুটো হাত তুলে বলল, দ্যাখ, দেখেছিস, পারবি তো মেক-আপ করতে? আমাকে তো অনেক মেক-আপ করেছিস।

মহুয়ার পুলিশকে বিবৃতি দানের পরও অনেকে আত্মহত্যার চেষ্টা কে এখনও উড়িয়ে দিচ্ছেন না। কিন্তু একটু সুস্থ হতে না হতেই মহুয়া তো তাঁর ভাইকে বলেন, 'ভাইয়া, আমাকে তোরা তাড়াতাড়ি বাড়ি নিয়ে চল। আমাকে ভাল হয়ে উঠতেই হবে। প্রোডিউসারদের না জানি কত ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।'

একদিকে এরকম কাজের প্রতি সিনসিয়ারিটি, অন্যদিকে স্বামী তিলক এবং ছেলে তমাল বা গোলার জন্য হাসপাতালের ৫২২ নং ঘরে শুয়ে শরীরের অসহ্য জ্বলুনি নিয়েও চিন্তার শেষ নেই, সেই মহুয়া কখন হত্যাকারীর মত আত্মহননের পথ কি বেছে নিতে পারেন? এই প্রসঙ্গে এক-জন প্রবীণ অভিনেতার মন্তব্য, 'দেখ, মানুষের জীবনে স্যাচুরেশন পয়েন্টে পৌঁছে অনেক কিছুই মনে হতে পারে বা সে করে ফেলে। তার মানে এই নয় যে মহুয়া রায়চৌধুরী হুট করে কিছু করে ফেলেছে।' আবার একজন টেকনিসিয়ান বলেন, 'হয়ত নিজের সন্তানের মারা যা কর্তব্য নিষ্ঠার থেকেও বড় কোন ব্যাপারে মহুয়াকে এত বেশি যন্ত্রণা দিয়েছে যে... '

কিন্তু এক নবীন চলচ্চিত্র পরিচালক বলেন, 'মৌ-র মত সিনসিয়ার, কো-অপারেটিভ আর্টিস্ট খুব কমই পাওয়া যায়। মৌ অসুস্থ অবস্থাতেও আমার ছবিতে কাজ করতে এসেছে। গায়ে হাত দিয়ে দেখেছি গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। বলেছি, মৌ তুই এই অবস্থায় এসেছিস কেন, চলে যা। উত্তর কি বলেছে জানেন, আমি মরে যাই যাব, কিন্তু প্রোডিউসারদের মরতে দেব না। বলুন, এমন ডেডিকেটেড আর্টিস্ট হুট করে আত্মহত্যার মত কাজ কি করতে পারে?'

বাংলা চলচ্চিত্রানুরাগীদের কাছে শুধু মৃত্যুরই খবর নিয়ে আসে। শোকস্তব্ধ জনতার ভিড়ে দাঁড়িয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের জনৈক অভিনেতা অস্ফুটে বললেন, 'এমন জুলাই যেন আর না আসে।'

জুলাই মানে শ্রাবণের ধারা। ক্যালকাটা মেডিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট চত্বরে দাঁড়িয়ে শোকাক্লান্ত সকলেই যেন কাঁদছেন। স্তব্ধ সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় হঠাৎ বলে উঠলেন, 'এতো আমি নিজের লোককেই হারালাম।' তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন তরুণকুমার ও শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়। তাঁর শোকের সঙ্গী ছিলেন রত্না ঘোষাল, চিন্ময় রায়, সমিত ভঞ্জ, সন্তু মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।

মহুয়া চলে গেলেন। তাঁর বিদায় বাংলা ছবির অনেক প্রযোজককে হতাশায় আচ্ছন্ন করবে। কিন্তু এক বিপুল প্রাণোচ্ছলতা নিয়ে যিনি জীবন কাটিয়ে গেলেন সেই স্বল্প জীবনের মধ্যে দাঁড়িয়ে, প্রযোজকদের জন্য তিনি আমৃত্যু অভিনয় করেছেন। নিজের সত্তা মিশিয়ে ফেলেছেন নানান চরিত্রের সঙ্গে এবং মনে হয় আজ মৃত্যুর পরে 'আদালত ও ইনসাফ'-এর সেই নারী চরিত্রের মত তিনিও আল্লার কাছে চলচ্চিত্রের জন্য 'দোওয়া' মাঙবেন।



উৎস: একটি ম্যাগাজিন থেকে (পরিবর্তন )




মহুয়া, বিয়ের পরে

 এখন মহুয়া চক্রবর্তী। শান্তশিষ্ট। বিয়ে করেছে ছ’মাস আগে। ওর বরের নাম তিলক চক্রবর্তী। স্টুডিওতেও এসেও সে টেলিফোনে অন্তত একবার কথা বলে নেয়। আউটডোরে গেলে ও সঙ্গে যায়। ছুটির দিন শুটিং করে না সিনেমা দেখতে যায়। মান-অভিমান হয় বেশি। ক্ষণিকের। বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারে না। এমন, আঘাত পেলে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে। পান খাওয়ার অভ্যেসটা ছাড়তে পারেনি। দাঁত কালো হয়ে যায় পান খেলে—কত উপদেশ শুনেছে, কান দেয়নি। পান না থাকলে গালে, গিসগিস মনেই হয় না, ও বলে।


আমি বলি, আমার বয়সী সব মেয়েরা, বিয়ে কর। জোক করে দিলীপ কি বলেছে...! সে যা খুশি বলুক, বিয়ের মত ঘটনা নেই জীবনে। যারা বিয়ে করেনি তারা বুঝবে না। যারা করেছে তারা বুঝবে। আমার অভিজ্ঞতা হাড়ে হাড়ে বোঝা। সেরকমভাবে বোঝবার সময় হয়নি। হলে সবাইকে নিশ্চয়ই জানাব।

**বিয়ের পর হানিমুন কোথায় হল?

: গাছের নিচে!

**বিয়ের পর বিশেষ কি খাওয়া হল?

: উঃ, ওটা আমি বলব না। আমি বলব, ঝালমুড়ি।

**বিয়ের পর বিশেষ কি কেনা হল?

: কাঁচের চুরি, রঙ-বেরঙের।

**বিয়ের আগে মন কি চেয়েছে?

: উড়ে বেড়াতে।

**বিয়ের আগে মন কি বলেছে?

: আমি ওকে ভালবাসি।

**বিয়ের আগে মন কি পেয়েছে?

: নির্ভরতা। আত্মবিশ্বাস। নিশ্চয়তা।

এই সময় ইন্দ্রপুরী স্টুডিওর চত্বরে গাছের ছায়ায় তুমি একটু স্থির হয়ে বস। মেক-আপ রুম থেকে কয়েকটি লাফ একলা এসে লেগেছে। একটু পরেই ত তুমি বেহুলা-চলে যাবে লক্ষ্মীন্দরের সন্ধানে। এমনিভাবে প্রতিদিন তুমি এক একটা চরিত্র হয়ে যাও। বাউলিয়া গ্রামে তোমাকে দেখলাম কোমর কাপড় বেঁধে গাছে উঠছ। কি যেন ছবির নাম? ‘প্রতিশ্রুতি’। তোমার নায়ক কে?

**বিয়ের আগে মোট কতগুলি ছবিতে অভিনয় করা হয়েছে?

: অত শত গুণে রাখিনি। মোটামুটি বলতে পারি, চৌদ্দ-পনেরোটা হবে।

**কে কে নায়ক ছিল?

: অনেকে। একাধিক ছবিতে ছিল পার্থ মুখোপাধ্যায়। পার্থর সঙ্গে নাকি একটু ভাব-ভালবাসা হয়েছিল?

: একসঙ্গে কয়েকটি ছবিতে কাজ করলে ওরকম হয়।

**বিয়ের পর মোট কতগুলি ছবিতে অভিনয় করা হয়েছে?

: অনেকগুলি। কুড়িটার বেশী।

**কে কে নায়ক?

: অনেকে। একাধিক ছবিতে সন্তু মুখোপাধ্যায়।

**তাহলে ইমেজ একইরকমই আছে?

: কেন থাকবে না। বিয়ে করলেই ত নায়িকারা বুড়ি হয়ে যায় না।

**বিয়ের আগে জীবনটা কেমনভাবে ভাবা ছিল?

: রেলপথের মত। হুশ হুশ করে চলে যাবে। মাঝে কোন স্টেশন থামবে না। একদম সোজা গন্তব্যে পৌঁছে যাবে।

**সিনেমা নামবার কথা মনে হল কেন?

: সত্যি কথা বলতে কি আমার মনে হয়নি কিছুই। বাবার হাত ধরে স্টুডিওতে আসতাম। ছোটবেলা থেকে নাচ শিক্ষার শখ ছিল। শিখেও ছিলাম। কিন্তু তেমনভাবে কাজে লাগল না। ফাংশনে বহুবার নাচ দেখাবার সুযোগ পেয়েছি। প্রশংসাও পেয়েছি। সিনেমায় নামব কোনদিন কল্পনাও করিনি। বাবা ছবির জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অনেকটা সেই সূত্রেই যোগাযোগ। অন্তত ভেবেচিন্তে নামিনি। আশ্চর্যের পর এটা হবে আরেক আশ্চর্য মোটা-মুটি ধারণা ছিল।

**বিয়ের আগে অভিনয় জীবন গড়ে তোলার কথা মনে হয়নি?

: নিশ্চয়ই মনে হয়েছে। প্রথম ছবিতে কাজ করবার পর অভিনয় সম্পর্কে কিছু জানা হল। সবচেয়ে বড় কথা অভিনয় করব—এটা আমার মনে হয়েছিল। নেহাতই পরদা মুখ দেখাতে এসেছি, ভাবলে হাসি পেত। তাই পরপর কয়েকটি ছবিতে কাজ করবার পর ঠিক করে ফেললাম যাঁর আমাকে অভিনেত্রী হতে হয় তাহলে সাধনা করতে হবে। সিনসিয়ারলি কাজ করতে হবে। অভিনয় সম্পর্কে রীতিমত পড়াশোনা করতে হবে। তা না হলে যশ, গ্ল্যামার নিয়ে টিকে থাকা যায় না—অন্তত ভালো ছবির ক্ষেত্রে।

তখন মহুয়া রায়চৌধুরী। অভিনয়কে মনে প্রাণে ভাল-বেসেছে। তার এক নতুন জীবন শুরু হয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাসে, কাঁদে কিংবা পাগলের মত অঙ্গভঙ্গি করে। জীবনকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখায় আগ্রহ তাকে দিনের পর দিন উদ্দীপিত করে।

এখন মহুয়া চক্রবর্তী। অভিনয় আর ব্যপ্তি জীবন পাশাপাশি রেখে এগিয়ে চলেছে। সিঁড়ির কয়েক ধাপ উঠে এসেছে। সামনে অনেক সিঁড়ি। অনেক রাস্তা। অনেক আলো। থমকে দাঁড়িয়ে থাকতে চায় না। পা ফসকে পড়ে যেতে চায় না। এক লাফে সব সিঁড়ি অতিক্রম করতে ধীরে-স্থিরভাবে এগিয়ে যেতে চায়। এগিয়ে যেতে চায়।

উৎস: একটি ম্যাগাজিন থেকে

মহুয়ার মৃত্যুর পর কয়েকজন চলচ্চিত্র নির্মাতার বক্তব্য

 এখানে মহুয়া রায়চৌধুরী সম্পর্কে কয়েকজন প্রযোজক ও পরিচালকের বক্তব্য রয়েছে:-


মহুয়াকে তাঁর পরপর দুটি ছবিতে ‘হিরোইন’ করেছেন, তিনি আমায় বললেন, ‘দেখুন এসব ডিপ্রেশান-টিপ্রেশানের ব্যাপার নয়। প্রত্যেক আর্টিস্টই এককথায় ডিপ্রেসড, ও কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছিল। একটু শান্তি ও বিশ্রাম চাইছিল।’ টালীগঞ্জের শক্তিমান একজন সেট-মেকার এই প্রসঙ্গে বললেন, ‘মহুয়াকে আমি ওঁর ছোটবেলা থেকে দেখছি। কিন্তু ইদানীং লক্ষ্য করছিলাম, ওকে খুব ডিপ্রেসড মনে হত। ওঁর মুখের দিকে চেয়ে মনে হত ও যেন কাছে থেকেও অনেক দূরে চলে গেছে। কী একটা ফাঁক থেকে বাজিল। যখন অভিনয় করত তখন চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলত, কাজের মধ্যে ডুবে যেত। বাস্তব জীবনের কোথাও যে ওর দ্বন্দ্ব চলছে এটা বোঝা যেত না। কারণ তখন তো ও মহুয়া রায়চৌধুরী নয়, অন্য এক চরিত্র। আর ছোটবেলা থেকে দেখছি বলে, কিছু জিজ্ঞাসাও করতে পারতাম না।’

অপর একজন চলচ্চিত্রকার বললেন, ‘এই ঘটনার দিনকুড়ি কি একমাস আগে টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে জ্যোতিপ্রকাশ রায় ও সুজিত গুহের দুটো ছবির শুটিং ছিল দু শিফটে। কিন্তু মহুয়া এতই অসুস্থ হয়ে পড়েন যে, তাঁকে নিয়ে শুটিং করা সম্ভব হয়নি। এমনকী তাঁকে নার্সিং হোমে ভর্তি করতে হয়। চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত কেউ কেউ বলছেন, এই নার্সিং হোম থেকে ফিরে আসার পরই মহুয়া একটু যেন ‘ডিপ্রেসড’ ছিলেন।

তবে মহুয়ার বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সঙ্গী বলেছেন, ‘মো ডিপ্রেসড ছিলেন অন্য কারণে। বাংলাদেশে উপ্রিলা ছবিতে কাজ করার জন্য মো চুক্তিবদ্ধ ছিল? শুটিং আরম্ভ হবার কথা ছিল ৩ জুলাই থেকে। কিন্তু ১১ জুলাই পর্যন্ত মো বাংলাদেশে যাবার ভিসা পাননি। অথচ ওঁর সেক্রেটারি অসিত দাস, মেক-আপ ম্যান অনুপ (ভুট্টো) গাঙ্গুলী এবং তিলক তিনজনেরই ভিসা হয়ে গেছে, অথচ মো পাননি। স্বভাবতই ওর মনমেজাজ খারাপ থাকবেই।’

মহুয়ার দিদি শান্তা দেবীকেও জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ভিসা না পাওয়ার জন্য মহুয়া খুব ‘ডিপ্রেসড’ ছিলেন কিনা? শান্তা দেবী বলেন, ‘নিশ্চয়ই। কারণ আপনি চিন্তা করে দেখুন, বাংলার ইন্ডাস্ট্রিকে ছেড়ে ও নিজকর বাইরে যাবে না। ১৬ দিনের জন্য বাংলাদেশে ছোট নেওয়া হয়েছে ওর কাছ থেকে। অথচ সে কোন কারণেই হোক ও ভিসা পাচ্ছিল না। সেই কারণে ওর ডিপ্রেসড থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না। আর সবচেয়ে বড় জিনিস সেটা ও খুব ভয় পাচ্ছিল যে ৭ তারিখ হয়ে গেল, কিন্তু ভিসা হাতে এল না। ১৬ দিনের কাজের মধ্যে ৭ দিন চলে গেল। শেষ পর্যন্ত যদি আটকে যায়, যাওয়া না হয়?’

তাই অন্যমনস্কতার জন্যই কি এতবড় ঘটনা ঘটে গেল?

চলচ্চিত্রকার অঞ্জন চৌধুরীকে এই প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করায়, তিনি বললেন, ‘দেখুন বাংলাদেশ বলতে তো আমরা এখনও বিদেশই বুঝি। এখন বিদেশ থেকে কাউকে আমন্ত্রণ জানালে, সবারই তো ইচ্ছে হয় ছবি করি। সেখানে ও একটা সুযোগ পেয়েও যেতে পারছে না। স্বাভাবিকভাবেই খারাপ লাগে, তার দোষটা কখন তার নয়। আমি তাই মহুয়াকে বলেছিলাম তোর এতে পড়ার কি আছে? তুই এতে পড়ছিস কেন? যেখানে তুই আছিস, সেখানে তুই টপ। নাইবা গেলি বিদেশে। 

মহুয়া রায়চৌধুরীকে নিয়ে তাপস পালের শেষ বক্তব্য

নিজের মৃত্যুর 2 বছর আগে, তাপস পাল হঠাৎ একটি সংবাদপত্রের সাথে যোগাযোগ করেন এবং তার প্রিয় অভিনেত্রী মহুয়া রায়চৌধুরী সম্পর্কে কিছু বলতে চান। তার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে দুজনেই একে অপরের সাথে আবেগগতভাবে সংযুক্ত ছিলেন।


মহুয়া আর তাপস দুজনেই আর নেই। তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং তা ভেঙে গেছে কিনা তা অনুসন্ধান করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তারা একে অপরকে পছন্দ করেছিল যা যেকোনো কাজের ক্ষেত্রে খুবই স্বাভাবিক।
মহুয়ার মৃত্যুর এত বছর পর এবং তার নিজের মৃত্যুর ঠিক 2 বছর আগে তাপস পাল অনুভব করলেন যে তাঁর সেরা অভিনেত্রীর প্রতি তাঁর অনুভূতি স্বীকার করতেই হবে।

মহুয়ার মৃত্যুর অনেক পরে তাপস পালের বক্তব্য

উফ! ওই দিনটা আমি কিছুতেই মনে করতে চাই না। আমার কাছে ওটা একটা অভিশপ্ত দিন। কত রাত যে আমি ঘুমোতে পারিনি, হাউহাউ করে কেঁদেছি। মহুয়ার অ্যাক্সিডেন্টের খবর পেয়েই হাসপাতালে দৌড়ে গিয়েছিলাম। তখন আমি ভাল করে গাড়ি চালাতে পারতাম না। সেদিন কিছু না ভেবেই গাড়ি নিয়ে ছুটে গিয়েছিলাম। কীভাবে চালিয়েছিলাম, আজও জানি না। কাচের বাইরে থেকে মহুয়ার যে রূপ দেখেছিলাম, সেটা মনে পড়লেই আজও ঘুমের ভিতর শিউরে উঠি আর চোখের সামনে ভেসে ওঠে মহুয়াকে প্রথম দেখার দিনটা।


‘দাদার কীর্তি’ ছবির রিহার্সালের প্রথম দিন মহুয়াকে প্রথম দেখি তরুণ মজুমদারের বাড়িতে। তখন তো মহুয়া ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ করে বিখ্যাত হয়ে গেছে। আমিও দেখেছিলাম ওই ছবিটা। সেই অসম্ভব সুন্দরী মহিলা আজ আমার সামনে। সামনে থেকে দেখে আমি হাঁ করে তাকিয়েছিলাম ওর দিকে। তখনও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না মহুয়া আমার নায়িকা। একটু নার্ভাসও লাগছিল। আর কেন জানি না ওর সঙ্গে অনেক ছবি করার পরেও ওকে দেখলেই আমার কেমন নার্ভাস লাগত। কোনও কথা হওয়ার আগেই, তনুদা একটা স্ক্রিপ্ট দিলেন, আমরা ওই স্ক্রিপ্ট দেখে পড়তে শুরু করলাম। সেই শুরু হল মহুয়ার সঙ্গে পথচলা।

আমি যখন একা থাকি, তখন অনেক কথাই মনে পড়ে। ‘দাদার কীর্তি’ ছবির শেষের দিকের দৃশ্য। মহুয়া গাইছে, ‘চরণ ধরিতে দিও গো আমারে’। গানটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর মহুয়ার সেই কান্না, সেটা শুধু অভিনয় নয়। তরুণদার নির্দেশ ছিল চোখের জল যেন সকেটে থাকে বাইরে না আসে। শটটা শেষ হওয়ার পর মহুয়া ছুটে ঘরের মধ্যে গিয়ে হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করল। কিন্তু ক্যামেরার সামনে ও চোখ থেকে একফোঁটা জল ফেলেনি। আমি তো তখন নতুন। অবাক হয়ে ওকে কাঁদতে দেখছিলাম। ওর ওই কান্না আমি কোনওদিন ভুলব না। সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম, ও অভিনেত্রী হিসাবে কতটা পাওয়ারফুল আর সাবলীল। অভিনয় ওর রক্তে ছিল।

একদিন স্টুডিওয় বসে আছি। মহুয়ার গাড়ি ঢুকল। তার সঙ্গে অনেকগুলো কুকুর দৌড়ে এল। আর মহুয়া এদের বিস্কুট খাওয়াতে শুরু করল। সবাইকে খুব আপন করে নিতে পারত। 
কাজ করতে করতে আমরা একে অপরের প্রতি মানসিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলাম। আমি অন্য কোনও নায়িকার সঙ্গে কাজ করি এটা মহুয়া পছন্দ করত না। আমিও চাইতাম না ওর অন্য বন্ধু থাকুক। ওর দাবি ছিল যে ছবিতে ও থাকবে সেই ছবিতে আমি না বলতে পারব না।

মহুয়া মারা যাওয়ার পর অনেককে ওর ড্রিঙ্ক করা নিয়ে কথা বলতে শুনেছি। আমি শুধু একবারই দেখেছিলাম। তখন কালিম্পংয়ের ট্যুরিস্ট লজে শুটিং চলছে। হঠাৎ মহুয়া আমাকে জড়িয়ে চুমু খেল। ওই সময় আমি ওর মুখে মদের গন্ধ পেয়ে ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তুমি ড্রিঙ্ক করেছ কেন? ও একবার আমার দিকে তাকিয়ে আবার আমাকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু কোনও উত্তর দিল না। সেদিন রাতে ও আবার আমাকে ওর ঘরের দরজার কাছে জড়িয়ে ধরেছিল। আমি শুধু বলেছিলাম, মহুয়া তুমি অনেক ড্রিঙ্ক করেছ, ঘরে যাও। ওকে এই অবস্থায় দেখে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। অভিমানও হয়েছিল। কিন্তু আমি কখনও জিজ্ঞেস করিনি ও কেন এভাবে বদলে যাচ্ছে। আমি চেয়েছিলাম ও নিজে আমাকে বলুক। সেই সুযোগ আর হয়নি।

আমার সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝিও হয়েছে। কিন্তু সেটা ওই মিটিয়েছে। ‘পারাবত প্রিয়া’ শুটিংয়ের সময় বাসে করে একটা স্পটে যাচ্ছিলাম। মহুয়া বসেছিল সিটে ও কে ক্রস করার সময় আমার পিছন দিকটা ওর দিকে ছিল। হঠাৎ মহুয়া রেগে গিয়ে আমাকে যা-তা বলল। আমিও দু’কথা শুনিয়ে দিলাম। বেশ কিছুদিন আমাদের কথা বন্ধ ছিল। তারপর একদিন ওর একটা চিঠি পেলাম। তাতে লেখা ছিল, ‘প্রিয় তাপস, আমাদের আজ শুটিং শেষ। আমরা ফিরে যাচ্ছি। যা হয়েছে ভুলে যাও, ক্ষমা করে দিও, জীবনটা খুব ছোট, কিছু মনে রেখো না।’ চিঠিটা আমার কাছে এখনও আছে। এই তো সেদিনও চিঠিটা বের করে পড়েছিলাম।

আমার প্রথম ছবির নায়িকা মহুয়া আর ওর সঙ্গে আমার শেষ ছবি ‘আশীর্বাদ’। ওই ছবির একটা নাচের দৃশ্য ছিল, মহুয়াকে জড়িয়ে ধরে ঘুরছিলাম। তখনও বুঝিনি খুব তাড়াতাড়ি ও আমার কাছ থেকে অনেক দূরে চলে যাবে। লালকুটিতে আমাদের একটা শট ছিল। খুব সম্ভবত ‘অনুরাগের ছোঁয়া’-র। গাড়িতে আমার পাশে মহুয়া আর আমি গাড়ি চালাচ্ছি। আমি এত জোরে গাড়ি চালিয়েছিলাম যে চাকা স্কিড করে গিয়েছিল। হঠাৎ দেখি মহুয়া চিৎকার করছে “আমায় মেরে ফেলল, আমায় মেরে ফেলল।” মৃত্যুকে ও এতটাই ভয় পেত।

যেদিন দুর্ঘটনা ঘটে, তার আগের দিনও আমরা শুটিং করেছি। যার শেষ সংলাপ “আশিস, তাড়াতাড়ি এসো, আমি ভাল নেই।”

আর একটা গানের দৃশ্যের কথা মনে পড়ছে ‘অনুরাগের ছোঁয়া’-র। মহুয়া শুয়ে আছে আমি আস্তে আস্তে ওর কাছে এলাম। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে ‘আমি যে কে তোমার তুমি তা বুঝে নাও’। ওই সময় ওর মুখের যে এক্সপ্রেশন আমি কোনওদিন ভুলব না। ভুলব না পরের লাইনগুলো ‘ওপারের ডাক যদি আসে ... মরণ তোমায় কোনওদিন পারবে না কেড়ে নিতে।’আমি পারিনি। মরণ ওকে সত্যিই কেড়ে নিল। মহুয়া অসময়ে চলে যাওয়ায় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যে ধাক্কা পেয়েছিল তার থেকেও বিরাট ধাক্কা পেয়েছিল তাপস পাল।

তখন কালিম্পংয়ের ট্যুরিস্ট লজে শুটিং চলছে। হঠাৎ মহুয়া আমাকে জড়িয়ে চুমু খেল। ওই সময় আমি ওর মুখে মদের গন্ধ পেয়ে ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তুমি ড্রিঙ্ক করেছ কেন? ও একবার আমার দিকে তাকিয়ে আবার আমাকে জড়িয়ে ধরল। কোনও উত্তর দিল না


উৎস: সংবাদ প্রতিদিন




মহুয়া রায়চৌধুরী: স্মৃতির পাতায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

 বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন মহুয়া রায়চৌধুরী। তাঁর অভিনয়, প্রাণবন্ত হাসি, সৌন্দর্য এবং সহজ-সরল ব্যবহার আজও অসংখ্য মানুষের স্মৃতিতে অমলিন। তাঁর অকালপ্রয়াণ বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করেছিল। তাঁকে কাছ থেকে দেখা, তাঁর সঙ্গে কথা বলা কিংবা পারিবারিকভাবে তাঁকে জানার সৌভাগ্য যাঁদের হয়েছিল, তাঁদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে এক অন্য মহুয়া—অত্যন্ত সাধারণ, আন্তরিক, মিশুকে এবং মাটির কাছাকাছি একজন মানুষ।এখানে মহুয়ার কয়েকজন ভক্তের বক্তব্য তুলে ধরা হলো। উল্লিখিত বক্তব্যগুলির সত্যতা যাচাই করা হয়নি। তাই এগুলি সত্য নাকি মিথ্যা, সে বিষয়ে আমরা কোনো দাবি করছি না।



### টিনা সিংহা: মহুয়া ম্যাম ছিলেন আমার তবলার স্যারের কাকিমা। তবলার স্যারের বাবা ছিলেন বড় ভাই, আর তিলক চক্রবর্তী ছিলেন ছোট ভাই।

একদিন আমি তবলার স্যারের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেখানে মহুয়া ম্যামের অনেক ছবি দেখেছিলাম এবং তবলার স্যারের মায়ের কাছ থেকে মহুয়া ম্যাম সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছিলাম। এমনকি মৃত্যুর আগে যখন তিনি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, তখনও তাঁর সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছিলাম।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঠিক আগে মহুয়া ম্যাম বারবার আমার তবলার স্যারের মাকে—অর্থাৎ তাঁর জাকে—বলেছিলেন, “আমার গলা দেখো দিদি।”

আরও অনেক গল্প শুনেছিলাম। কিন্তু আজ আর লিখতে ইচ্ছে করছে না। মনটা খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

### তাপসী দাসগুপ্ত: আমি ছোটবেলা থেকেই তাঁকে খুব কাছ থেকে চিনি। তাঁর ডাকনাম ছিল টুটুন। মৃত্যুর সময় আমরা কয়েকজন তাঁর শেষযাত্রায় উপস্থিত ছিলাম।

### : মহুয়া আমার মায়ের আত্মীয় ছিলেন। মানুষ হিসেবে তিনি খুব ভালো ছিলেন। তবে তাঁর স্বামী ছিলেন অত্যন্ত নিয়ন্ত্রণকারী স্বভাবের। সম্ভবত তাঁর মৃত্যুর পেছনে তাঁর হাত ছিল।

### ঝর্ণা চক্রবর্তী: মহুয়া ছিলেন আমার প্রিয় নায়িকা। কত সিনেমা দেখেছি তাঁর! তখন আমি স্কুলে পড়তাম। শুনেছিলাম, মহুয়া ইমামবাড়ায় শুটিং করতে আসছেন। কী ভিড় হয়েছিল! সেখানেই চিন্ময় রায়কে খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম।

তখন ব্রাঞ্চ স্কুলের মাঠটি খোলা ছিল। সেখানেও শুটিং হয়েছিল। মহুয়াকে কী সুন্দর দেখতে লাগত!

এভাবে তাঁর চলে যাওয়া আজও মেনে নেওয়া যায় না। শিল্পী এভাবেই বেঁচে থাকুন আমাদের মধ্যে—তাঁর প্রাণবন্ত, মুক্তঝরা হাসি এবং অসাধারণ অভিনয়ের মাধ্যমে।

আজও তাঁর অভিনীত ছবি দেখে আমরা আনন্দ পাই, তাঁকে মনে করি।

### রৌনক ঘোষ: মহুয়া আমার মায়ের আত্মীয় ছিলেন। মায়ের মুখে শুনেছি, তিনি সত্যিই খুব ভালো মানুষ ছিলেন। একজন নামকরা অভিনেত্রী হয়েও তাঁর মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না। আমার মামার বাড়িতে এলে তিনি সবার মতোই রান্নাঘরে ঢুকে কাজ করতে যেতেন।আমার মা তখন বেশ ছোট ছিলেন। সম্পর্কে মহুয়া তাঁর দিদি হতেন।

###  আঞ্জু দাস (Anju Das): আমরা তখন নিউ আলিপুর কলেজে পড়ি। সেদিন ছিল শনিবার। মহুয়া বেবি-পিঙ্ক রঙের শাড়ি পরে একটি দোকান থেকে কী যেন কিনছিলেন। সবার আগে আমিই তাঁকে দেখতে পাই এবং বন্ধুদের নিয়ে তাঁর কাছে যাই। কোনো সাজসজ্জা ছিল না। শুধু বাঁ হাতে একটি সোনার নোয়া। কিন্তু কী সুন্দরই না লাগছিল তাঁকে! 

আমাদের সঙ্গে প্রায় আধঘণ্টা গল্প করেছিলেন। সেদিন টেলিভিশনে ‘লালগোলাপ’ সিনেমাটি দেখানো হবে—সেটাও তাঁকে বলেছিলাম। তখন তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমার সিনেমা কি ভালো লাগে?”

আমি বলেছিলাম, “হ্যাঁ, রঞ্জিতদাকেও ভালো লাগে।”

কত গল্প করলেন আমাদের সঙ্গে! তারপর বললেন, “আসি ভাই,” এবং চলে গেলেন। কোনো অহংকার নেই, কোনো বিরক্তি নেই—কী সহজেই না আমাদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন! এত মিশুকে, এত সহজ-সরল মানুষটি কয়েক দিনের মধ্যেই চলে গেলেন।

তাঁকে খারাপ কারা বলে? তারাই কি ভালো? একজন মৃত মানুষকে নিয়ে যারা কাটাছেঁড়া করেন, তাঁর চরিত্র নিয়ে আঙুল তোলেন, তাঁরা কখনোই প্রকৃত অর্থে মানুষ হতে পারেন না।

### নাসিফা রহিম: মহুয়া ছিলেন আমার ভীষণ প্রিয়—আমার ভালোবাসার নায়িকা। আমি তখন একাদশ শ্রেণিতে পড়তাম। একদিন বান্ধবীর সঙ্গে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে নিউ মার্কেটে গিয়েছিলাম। মার্কেটের মধ্যে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দেখি মহুয়া রায়চৌধুরীকে। কিন্তু তাঁকে এতটাই সাধারণ দেখতে লাগছিল যে সন্দেহ হচ্ছিল—সত্যিই কি উনি মহুয়া? পরনে ছিল লালপাড় সাদা সুতির শাড়ি। পিঠে বেণী ঝুলছে। কোনো মেকআপ নেই। তবুও তিনি তো মহুয়া—মহুয়াই!

আমি এখনও তাঁকে ভীষণ ভালোবাসি। যেমন সাধারণ, পাশের বাড়ির মেয়ের মতো সাজে ছিলেন, তাঁর ব্যবহারও ছিল ঠিক তেমনই সহজ-সরল।

আমি সাহস করে কাছে গিয়ে বললাম, “আপনি কি মহুয়া?” তিনি মিষ্টি হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, কেন?” আমি বললাম, “এত সাধারণভাবে আছেন, তাই ভাবছি সত্যিই কি না।” তিনি আবার হাসলেন। আমি বললাম, “আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে। আপনি কি কিনতে এসেছেন?” তিনি বললেন, “কস্টিউম জুয়েলারি।” তারপর হেসে বিদায় নিলেন।


কী সহজ-সরল ব্যবহার! ভাবলে এখনও মন ভরে যায়। ঘटनাটি ১৯৭৮ সালের। তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। আমরা একজন অসাধারণ উজ্জ্বল নক্ষত্রকে হারিয়েছিলাম। 


### রাজেশ রায়: কিছুদিন মহুয়া দমদমের গোলপার্কে থাকতেন। তখনই তাঁর ছেলে গোলার সঙ্গে আমার ক্ষণিকের আলাপ হয়েছিল। এত বছর পর হয়তো তাঁর মনে নেই। আমি এবং গোলা তখন দুজনেই বেশ ছোট। মহুয়া শুধু শিল্পী ছিলেন না—তিনি ছিলেন অসাধারণ মিষ্টি মনের একজন মানুষ।


### সুচিত্রা গাঙ্গুলী: টুটুনদির দিদি শান্তার শ্বশুরবাড়ি আমাদের পাড়ায় ছিল। দুই বোন দেখতে এবং স্বভাবে একেবারে বিপরীত ছিলেন। কিন্তু দুজনেই দেখতে খুব সুন্দর ছিলেন। একজন যেন দুর্গা, আর অন্যজন কালী।

টুটুনদির শান্ত, চুপচাপ মুখটা খুব মনে পড়ে। আমাদের বাড়িতে কয়েকবার এসেছিলেন।


### তাপসী দাসগুপ্ত: আমরা টুটুনদিকে ডাকনামেই ডাকতাম। তিনি আমার মা-বাবাকে দিদি ও জামাইবাবু বলে ডাকতেন। আমরা পাশাপাশি থাকতাম। প্রথম সিনেমার শুটিং চলাকালীন একদিন হঠাৎ তিনি আমাদের ঘরে এসে লুকিয়ে ছিলেন—কারণ তিনি শুটিংয়ে যেতে চাইছিলেন না। তাঁকে নিয়ে কত কথাই যে মনে পড়ে! তাঁর মা টেলিফোন ভবনে চাকরি করতেন।

মহুয়া রায়চৌধুরী আজ আমাদের মধ্যে শারীরিকভাবে নেই। কিন্তু তাঁর অভিনয়, তাঁর হাসি, তাঁর সৌন্দর্য এবং সবচেয়ে বড় কথা—তাঁর সহজ-সরল মানবিক ব্যবহার তাঁকে আজও মানুষের হৃদয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে।

কেউ তাঁকে দেখেছেন পর্দায়, কেউ কাছ থেকে; কেউ তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন, কেউ তাঁর পরিবারের সূত্রে তাঁকে চিনেছেন। কিন্তু স্মৃতিগুলির মধ্যে একটি বিষয় বারবার ফিরে আসে—মহুয়া শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন প্রাণবন্ত, আন্তরিক এবং অসাধারণ মনের মানুষ।

আমার মায়ের স্মৃতির পাতা থেকে — মহুয়া স্মৃতিকথা মৌমিতা রায় চৌধুরী: আমার মা তখন কিশোরী বধূ। ১৯৮০ সালেই আমার মা-বাবার বিয়ে হয়েছিল। মা তখন সদ্য অষ্টাদশী। মহুয়া রায়চৌধুরীর অভিনয় আর পাঁচজন বাঙালির মতোই মায়েরও অত্যন্ত প্রিয় ছিল।

বরানগরের জেলেপাড়ায় ১৯৮০/৮১ সালে, সম্ভবত কালীপুজোর মুখে, একটি জলসার আয়োজন করা হয়েছিল। তখন তো পাড়ায় পাড়ায় এমন জলসা হতো। সারারাত ধরে বাঙালিরা সপরিবারে জলসা উপভোগ করতেন। সবাই হয়তো সারারাত জেগে থাকতে পারতেন না, কিন্তু কিছুটা সময় হলেও জলসা দেখতেন। বিশেষ করে প্রিয় শিল্পী থাকলে তো কথাই নেই!

মা ও সেবার জলসা দেখতে গিয়েছিলেন। মহুয়া আসবেন—এই খবরেই অষ্টাদশী বধূটির মনে আনন্দের ঢেউ উঠেছিল। একেবারে সামনের সারিতে বসেই মা সেই সুন্দর, স্বর্ণালী সন্ধ্যার জলসা উপভোগ করেছিলেন। ভূপেন হাজারিকার গান মা মুগ্ধ হয়ে শুনেছিলেন। তিনিও সেদিনের জলসার অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন। এছাড়াও আরও অনেক নামী-দামী শিল্পী উপস্থিত ছিলেন। অবশেষে উপস্থিত সকল দর্শকের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মঞ্চ আলো করে উপস্থিত হলেন মহুয়া রায়চৌধুরী।

তাঁর আলোকিত উপস্থিতিতে সেদিন যেন উদ্বেল হয়ে উঠেছিল গোটা পরিবেশ। মায়ের কাছ থেকেই শুনেছি—কী মিষ্টি তাঁর হাসি! অপরূপ সুন্দর দেখতে লাগছিল তাঁকে। পরনে ছিল সাদা-কালো প্রিন্টের সিল্কের শাড়ি। অসামান্য সুন্দর লাগছিল তাঁকে। দুই কানে ছিল সোনার চেইন লাগানো দুল, যার নিচের দিকে মুক্তো ঝুলছিল। নাকে হীরের নাকছাবিতে উঠছিল আলোর ঝিলিক।

তিনি সকলকে সুমিষ্ট কণ্ঠে বলেছিলেন— “আপনারা সকলে ভালো আছেন তো? সবাই খুব ভালো থাকবেন…” অপরূপা মহুয়াকে সেদিন এতটাই নয়নমনোহর লাগছিল যে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। মঞ্চে তিনি তাঁর অভিনীত কয়েকটি ছবির সংলাপ বলেছিলেন। দর্শকদের অনুরোধে তাঁর ছবির কয়েকটি গান থেকে দু-কলিও গেয়েছিলেন। সেদিন উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধতা আবারও প্রমাণ করে দিয়েছিল—তিনি সকলের নয়নের মণি, প্রিয় নায়িকা এবং অত্যন্ত পছন্দের অভিনেত্রী।মায়ের মতোই সেদিন উপস্থিত সকলেই তাঁকে এত কাছ থেকে দেখতে পেয়ে ভীষণ আনন্দিত হয়েছিলেন।

পরবর্তীকালে আমার বাবা, শ্রী নারায়ণ রায়, এই শহরের একজন নামকরা অর্গানাইজার হয়ে ওঠেন। সেই সূত্রে মুম্বই ও কলকাতার এমন কোনো বড় শিল্পী নেই, যাঁদের মা কাছ থেকে দেখেননি। শুধু তাই নয়, বহু শিল্পীর সঙ্গেই তাঁর বেশ ঘনিষ্ঠ আলাপও হয়েছিল। পরবর্তীতে বাবা চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হন এবং অভিনয়ও করেন। টলিউডের বহু নায়ক, নায়িকা ও শিল্পীর সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সম্পর্কও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এত কিছুর পরেও নববধূ মায়ের চোখে আজও সেই দিনের জলসায় দেখা সপ্রতিভ, অসামান্য রূপসী নায়িকা মহুয়া মন জুড়ে রয়েছেন। এত সহজ, হাসিখুশি একজন মানুষ—সত্যিই যেন সুবাসিত মহুয়া ফুল তিনি। তাঁর মিষ্টি সুবাসে আজও যেন আকাশ-বাতাস সুরভিত।

মা বললেন— “বড় ভালোবাসতাম তাঁর অভিনয় দেখতে। ভগবানের প্রিয় ছিলেন বলেই হয়তো এত তাড়াতাড়ি কাছে টেনে নিলেন তাঁকে। যেখানেই থাকুন, পরম শান্তিতে থাকুন—এটাই শুধু চাইব।” মায়ের সেই স্মৃতির কথাগুলো শুনতে শুনতে মনে হয়, মহুয়া রায়চৌধুরী শুধু পর্দার একজন জনপ্রিয় নায়িকা ছিলেন না—তিনি ছিলেন মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব।

আজও তাঁর হাসি, তাঁর সৌন্দর্য, তাঁর অভিনয় এবং তাঁর সহজ-সরল উপস্থিতির স্মৃতি মানুষের মনে জীবন্ত। সময় চলে গেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু মহুয়ার সেই মিষ্টি সুবাস আজও বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে অমলিন।

বায়োপিক গুনগুন করে মহুয়া - সন্ধ্যা রায়ের ভূমিকায় অভিনয় করবেন অভিনেত্রী রিধিমা ঘোষ

 বায়োপিক গুনগুন করে মহুয়া—যা কিংবদন্তি বাংলা অভিনেত্রী মহুয়া রায়চৌধুরী-এর জীবনকাহিনি নিয়ে তৈরি হচ্ছে—এর শুটিং বর্তমানে চলছে। এই ছবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রবীণ অভিনেত্রী সন্ধ্যা রায়-এর চরিত্রায়ণ, যিনি মহুয়ার গুরু ও ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর অন্যতম পথপ্রদর্শক হিসেবে পরিচিত। এই ভূমিকায় অভিনয় করবেন অভিনেত্রী রিধিমা ঘোষ


ছবির কাস্টে রয়েছেন অঙ্কিতা মল্লিক, যিনি মহুয়ার প্রাপ্তবয়স্ক চরিত্রে অভিনয় করবেন, এবং দিব্যাণী মণ্ডল, যিনি মহুয়ার তরুণ বয়সের ভূমিকায় থাকবেন। পাশাপাশি, তথাগত মুখোপাধ্যায় মহানায়ক উত্তম কুমার-এর চরিত্রে অভিনয় করবেন এবং লোকনাথ দে মহুয়ার বাবার ভূমিকায় থাকবেন।

মহুয়ার কর্মজীবনের শীর্ষ সময়ে তিনি বাংলা চলচ্চিত্র জগতে নিজের স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি করেছিলেন। তাঁর এই উত্থানের পেছনে বড় ভূমিকা ছিল সন্ধ্যা রায়ের, যিনি তাঁকে অভিনয়ের ক্ষেত্রে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই বায়োপিকে তাঁদের গভীর পেশাগত সম্পর্ক ও আবেগঘন বন্ধনের দিকগুলো তুলে ধরা হবে।

এক পুরনো সাক্ষাৎকারে সন্ধ্যা রায় রায় জানিয়েছিলেন, মহুয়া শুধু প্রতিভাবান অভিনেত্রীই ছিলেন না, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই তাঁর নাচের দক্ষতাও ছিল অসাধারণ। পরিচালক তরুণ মজুমদার তাঁর এই প্রতিভায় মুগ্ধ হন এবং মাত্র ১৩ বছর বয়সেই একটি ছবির জন্য তাঁর লুক টেস্ট করানো হয়। পরে তরুণ মজুমদারই সন্ধ্যা রায় রায়কে মহুয়াকে গড়ে তোলার দায়িত্ব দেন।

রিধিমা ঘোষ এই চরিত্রে কাজ করার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত। তিনি জানিয়েছেন, তিনি ইতিমধ্যেই সেই সময়কার নায়িকাদের নিয়ে পড়াশোনা করছেন এবং সন্ধ্যা রায় রায় ও মহুয়ার সম্পর্ক নিয়ে গভীরভাবে গবেষণা করছেন, যাতে চরিত্রটি যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়।

গুনগুন করে মহুয়া ছবিতে মহানায়ক উত্তম কুমারের চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যাবে তথাগত মুখোপাধ্যায়কে

 রানা সরকারের প্রযোজনায় তৈরি হচ্ছে নতুন বাংলা চলচ্চিত্র ‘গুনগুন করে মহুয়া’। এই ছবিতে মহানায়ক উত্তম কুমারের চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যাবে তথাগত মুখোপাধ্যায়কে। বিষয়টি নিজেই নিশ্চিত করেছেন অভিনেতা।


তিনি বলেন, “মহানায়ক উত্তম কুমারের মতো অসাধারণ একজন শিল্পীকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা আমার কাছে শুধু অভিনয় নয়, এটি এক গভীর মানসিক দায়িত্ব এবং শ্রদ্ধার জায়গা। তাঁর ব্যক্তিত্বের আলাদা বৈশিষ্ট্য, অভিনয়ের সংযত সৌন্দর্য আর আবেগের সূক্ষ্ম প্রকাশ—সবকিছুকে সম্মান জানিয়েই ‘গুনগুন করে মহুয়া’ ছবিতে আমি তাঁকে নতুনভাবে অনুভব করার চেষ্টা করেছি। আমার মনে হয়, তাঁকে হুবহু অনুসরণ করা সম্ভব নয়। বরং তাঁর অনুভূতি ও অন্তরের স্পন্দনকে নিজের মধ্যে ধারণ করে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই ছিল আমার মূল উদ্দেশ্য। এই পুরো যাত্রায় আমি চেষ্টা করেছি তাঁর প্রতি সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করতে। মহানায়ক হিসেবে তাঁর যে স্বকীয় গরিমা, সেই সৌন্দর্য ও মর্যাদাকে পর্দায় তুলে ধরার আন্তরিক প্রয়াস করেছি।”

এরই মধ্যে তথাগতর সঙ্গে শুটিংয়ের একটি ছবি রানা সরকার তাঁর সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেছেন। যদিও সেখানে তথাগতর মুখ স্পষ্টভাবে দেখানো হয়নি, তবু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায়—তিনি উত্তম কুমারের চরিত্রেই বসে আছেন। এমনকি আগে থেকে কিছু না জানলেও দৃশ্যটি দেখে আন্দাজ করা কঠিন নয় যে তিনি তথাগতই। গত কয়েক দিন ধরে উত্তর কলকাতার হেদুয়া এলাকার কাছাকাছি একটি বাড়িতে ছবিটির শুটিং চলছে। শুটিংয়ের শুরুতেই কলাকুশলীদের সঙ্গে কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গে ইমপা অফিসে সাংবাদিক সম্মেলনও করেন রানা সরকার ও ইমপা সভাপতি পিয়া সেনগুপ্ত। পরে ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের মধ্যস্থতায় সমস্যার সমাধান হয়। এরপর গত শনিবার থেকে পুরোদমে শুটিং শুরু হয়েছে, আর সেদিনই তথাগতর অংশের কাজ সম্পন্ন করা হয়।

এই ছবির পরিচালক রাজদীপ ঘোষ এবং কাহিনি ও চিত্রনাট্যের দায়িত্বে রয়েছেন অর্কদীপ মল্লিকা নাথ। মহুয়া রায়চৌধুরী যখন চলচ্চিত্র জগতে আসেন, তখন মহানায়ক উত্তম কুমারের ক্যারিয়ার ছিল তুঙ্গে—তিনি তখন ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম প্রধান অভিভাবক। বিভিন্ন সময়ে দেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, তিলক চক্রবর্তীর সঙ্গে বিয়ের পর মহুয়া রায়চৌধুরীকে নিয়ে তাঁর বন্ধুরা মহানায়কের বাড়িতে যান, যেখানে সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়া ও আনন্দে সময় কাটান।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ছবিতে মহুয়ার চরিত্রে অভিনয় করবেন অঙ্কিতা মল্লিক। পাশাপাশি, মহুয়ার তরুণ বয়সের ভূমিকায় দেখা যাবে দিব্যাণী মণ্ডলকে। এছাড়া, মহুয়ার বাবা নীলাঞ্জন রায়চৌধুরীর চরিত্রে অভিনয় করতে পারেন অভিনেতা লোকনাথ দে।

মহুয়া রায়চৌধুরী সম্পর্কে চলচ্চিত্র জগতের ব্যক্তিত্বদের কিছু আলোচনার অংশ

 সম্পূর্ণ আলোচনাগুলো পাওয়া যাচ্ছে না, এখানে শুধু কিছু অংশ আছে ওঁকে যেভাবে চরিত্রটা বুঝিয়েছিলাম, তার থেকেও অনেক অনেক ভালো করেছিল মহুয়া। একটি...