ইস্টবেঙ্গলের প্রতি মহুয়া রায়চৌধুরীর ভালোবাসা - প্রতিবেদক রবি বসুর বক্তব্য থেকে নেওয়া

 মহুয়া রায়চৌধুরী ছিলেন ইস্ট বেঙ্গল ফুটবল ক্লাবের একজন ডাই হার্ড ফ্যান। রবি বসুর বইতে মহুয়ার অনেক ঘটনা রয়েছে এবং এই নিবন্ধটি সেই বই থেকে নেওয়া হয়েছে।



"ফুটবল খেলাটাকে প্রচন্ড ভালোবাসত মহুয়া। একদম ছোটবেলা থেকেই। ওর দাদা পিনাকী যখন বন্ধুদের নিয়ে ফুটবল খেলতে যেত , তখন মহুয়াও তাদের পেছন পেছন যেত মাঠে। কেবল দর্শক হিসেবেই নয় , প্লেয়ার কম পড়লে নিজে মাঠে নেমে পড়ে গোলে দাঁড়িয়ে যেত। সেখান থেকেই চিৎকার করে বিপক্ষের খেলোয়াড়দের শাসাত : এই , আমার গোলের দিকে জোরে বল মারবে না বলে দিচ্ছি। আমাকে গোল দিয়ে দিলে তোমাদের সঙ্গে রক্তারক্তি হয়ে যাবে কিন্তু। স্বপক্ষ আর বিপক্ষ উভয় দলের খেলোয়াড়রাই মহুয়ার কথা শুনে হেসে ফেলত।

যেদিন মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের খেলা থাকত , মহুয়া সেদিন সকাল থেকেই খুব টেনশনে ভুগত। কাজেকর্মে ভালো করে মন বসাতে পারত না। সেদিন স্টুডিওতে এসেই ডিরেক্টারকে বলত : আমাকে লাঞ্চের আগে যত পার খাটিয়ে নাও। বিকেলের দিকে খেলা আরম্ভ হলে আমাকে দু'ঘন্টা ছুটি দিতে হবে। ওই সময় আমি খেলা দেখব।
মহুয়াদের একটা ট্রানজিস্টার টিভি ছিল। হাত দুয়েক লম্বা সরু মতন। স্ক্রিনটা বোধহয় ছ'ইঞ্চি বাই ছ'ইঞ্চি হবে। ব্যাটারিতে চলত। তিলক অফিস যাবার সময় ওই টিভি-টা মহুয়াকে দিয়ে যেত। মহুয়া সেটাকে মেক-আপ রুমে কাজের মেয়েটির কাছে রেখে দিত। আমি স্টুডিওতে গিয়ে হাজির হলে বলত : এই রবিদা, আজ আমাদের টিমকে হারাবার চেষ্টা করবে না বলে দিচ্ছি। আমাদের টিম যদি হারে তাহলে তোমার সঙ্গে একচোট হয়ে যাবে কিন্তু।

আমি হাসতে হাসতে বলতাম : আজ তোমাদের টিম হারবেই। আমি আসবার সময় কালীঘাটে মোহনবাগানের হয়ে পাঁচসিকে পূজো দিয়ে এসেছি।

মহুয়া বলত : আমিও দক্ষিণেশ্বরের মায়ের কাছে আড়াই টাকা মানত করে রাখলাম। দেখি তোমরা ইস্টবেঙ্গলকে কেমন করে হারাও।
এইরকম নানা হাসি-ঠাট্টার মধ্যে দিয়ে মহুয়া তার টেনশন কাটাবার চেষ্টা করত। কিন্তু যত বেলা গড়াত ততই তার মুখটা শুকিয়ে যেত। মাঝে মাঝে বলত : কী হবে বলো তো রবিদা ?

আমি ওকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে বলতাম : এই মউ, ব্যাপারটাকে এত সিরিয়াসলি নিচ্ছিস কেন বল তো ! খেলাটা তো স্পোর্টস। এটাকে স্পোর্টিংলি নিতে পারিস না ? যারা ভালো খেলবে তারা জিতবে।

মহুয়া মুখ শুকনো করে বলত : না গো রবিদা, ইস্টবেঙ্গল হেরে গেলে বুকের ভেতর যে কী কষ্ট হয় তা তোমাকে বোঝাতে পারব না।
সব থেকে দুঃখের ব্যাপার সেদিন ইস্টবেঙ্গল সত্যিই হেরে গেল। মেক-আপ রুমে বসে ওরই টিভিতে আমরা দুজনে খেলাটা দেখছিলাম।
ইস্টবেঙ্গল হেরে যাবার পর মহুয়ার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে সে কি কান্না ! তখন মনে হচ্ছিল মোহনবাগান হেরে গেলেই বোধহয় ভালো হত। অনেক কষ্টে সেদিন ওর কান্না থামাতে পেরেছিলাম।
আজও যখন টিভিতে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের খেলা দেখি তখন মহুয়ার কথা বড্ড বেশি করে মনে পড়ে যায়। সে যেখানে গেছে সেখান থেকে কি খেলা দেখা যায় ?"

কমল বন্দোপাধ্যায় মহুয়া রায়চৌধুরীর 37 তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতি থেকে স্মরণ করেছেন

 দমদমের বাসিন্দা কমল বন্দ্যোপাধ্যায় শিল্পীকে একদম মেয়েবেলা থেকে দেখেছেন তাঁর দাদার বন্ধু হিসেবে। গত বছরও স্মৃতিচারণ করেছিলেন আজকের দিনে তাঁর হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকে নিয়ে। আজ আবার বললেন কিছু কথা। ছোট ছোট মণি মুক্তোয় ভরা সেই সব কথা হুবহু তুলে দিলাম।

❤️❤️ হয়তো আমাকে ভুলে যাবে
স্মৃতিতে আমাকে খুঁজে পাবে ❤️❤️
এবং
❤️❤️ আমি ভালো নেই ❤️❤️
-----------------------------------------------------------------------
** আর কয়েক ঘন্টা বাদেই আসতে চলেছে অভিশপ্ত ২২ জুলাই। " আশীর্বাদ" ছবির এই সংলাপ ও গানের কলি যে এতটা বাস্তব রূপ ধারণ করবে তা বোধহয় জুলাই,১৯৮৫-র আগে কেউ কল্পনাও করতে পারেননি।‌ যে নায়িকার ঠোঁটে এই সংলাপ ও গানের কলি চিত্রায়িত হয়েছিল তাঁর নাম মহুয়া রায়চৌধুরী।
** ২২ জুলাই, ১৯৮৫ , সোমবার, বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এক " অগ্নিদগ্ধ অভিশপ্ত" তারিখ যেদিন ইহজগৎ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ২৯ বছর বয়সী সকলের প্রিয় নায়িকা মহুয়া রায়চৌধুরী।‌ দেখতে দেখতে দীর্ঘ ৩৭ বছর অতিক্রান্ত, কিন্তু আমার কাছে মনে হয় এই তো সেদিনের ঘটনা। যখন‌ই ভাবি তখনই বহু পুরোনো স্মৃতি মনের মাঝে ভীড় করে আসে।
** ষাটের দশকের শেষার্ধ। সেই সময়ে স্কুলের লেখাপড়ার মেয়াদ উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ছিল ১১ শ্রেণী পর্যন্ত। সেই সময় স্কুলে একটি ছেলের সঙ্গে আলাপ হয়, পরিচয় হয়, বন্ধুত্ব ও হয়। নাম পিনাকী রায়চৌধুরী। ওর মা কলকাতা টেলিফোন অফিসে চাকরি করতেন। দমদমে যশোহর রোডে ক্লাইভ হাউসের পরেই ৫৭ এক্সচেঞ্জ টেলিফোন কোয়ার্টারে পিনাকীরা থাকতো। ওর দুই বোনের এক বোনের নাম ছিল শিপ্রা রায়চৌধুরী। শিপ্রার আরও একটা বিশেষ গুণ ছিল, খুব ভালো নাচতে পারতো। বিভিন্ন বিচিত্রানুষ্ঠানে নাচের অনুষ্ঠান করতো ঐ মেয়েটি। নাচের অনুষ্ঠানে ওঁর পরিচিতি ছিল " সোনালী" বলে। যেহেতু ওঁর মা কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারী ছিলেন, চাকরি করতে হতো তাই ওঁর বাবা নীলাদ্রীবাবু সোনালীকে সব অনুষ্ঠানে নিয়ে যেতেন। যেহেতু আমরা কয়েকজন পিনাকীর বন্ধুস্থানীয় ছিলাম তাই আমাদের সঙ্গেও শিপ্রার যথেষ্ট ভালো " দহরম মহরম" গড়ে উঠেছিল।‌ সেই শিপ্রাই বছর দুয়েকের মাথায় দেখি বাংলা চলচ্চিত্রে নায়িকা হয়ে উঠলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় পরিচালক সদ্যপ্রয়াত তরুণ মজুমদারের হাত ধরে। চলচ্চিত্র জগতে ওঁর নামটাও তরুণ মজুমদার মহাশয় পাল্টে দিলেন, নাম রাখলেন " মহুয়া" । এর আগেও অবশ্য তরুণ মজুমদার আর এক নবাগতা নায়িকা ইন্দিরা চ্যাটার্জীর নাম পাল্টে " মৌসুমী চ্যাটার্জী" রেখেছিলেন। টালিগঞ্জ ও বোম্বের চলচ্চিত্র জগতের নায়িকা মৌসুমী চ্যাটার্জীকে কে না চেনেন? সেই মৌসুমী চ্যাটার্জী আবার সঙ্গীতশিল্পী ও সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের পুত্রবধূ হন, সবাই জানেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ভবানীপুরের বাড়িতে মেনকা সিনেমা হলের পাশে আমি গেছি এবং কপালগুণে মৌসুমী চ্যাটার্জীর সঙ্গে কথাও বলেছি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ঐ বাড়িতে মৌসুমী চ্যাটার্জীর নাম কিন্তু ইন্দিরাই। যাক, আজকের প্রসঙ্গে আসি।
** " শ্রীমান পৃথ্বিরাজ" ছবিতে মহুয়া রায়চৌধুরীর আবির্ভাব। তারপর বহু ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় কি ছিল জানেন? এত নামডাক, এত টাকাপয়সা হ‌ওয়া সত্বেও যা তিনি তাঁর অভিনয় সত্তা দিয়ে আয়ত্ত্ব করেছিলেন মনটা কিন্তু রেখেছিলেন একেবারে খোলামেলা । কোনরকম কূটকাচালি জানতেন বলে আমার বিশ্বাস হয় নি। সবথেকে মজার ব্যাপার ছিল, নিজের দাদার মতোই আমাকেও " দাদা" বলে ডাকতেন সদাসর্বদা। ১৯৭৩ সালে আমার " উপনয়ন" উপলক্ষ্যে নিমন্ত্রণ করেছিলাম। মহুয়া এসেছিলেন রাত দশটা নাগাদ। ততদিনে তিনি নায়িকা হয়ে গেছেন।
** যখন টেলিফোন কোয়ার্টারে থাকতেন তখন তো প্রায় নিয়মিতই আমি যেতাম এবং সেটা বিকেলের দিকে। যারা ঐ টেলিফোন কোয়ার্টারটা চেনেন তাঁরাই জানেন, রাস্তার উল্টোদিকে মেয়েদের কলেজ আছে
" সরোজিনী নাইডু কলেজ" । যেদিন মহুয়া থাকতেন ঐ কলেজের পড়ুয়া মেয়েরা কী করে যেন জেনে যেতো " আজ মহুয়া আছেন" । কোয়ার্টারের সামনের মাঠটাতে ভীড় লেগে যেতো ঐ কলেজ পড়ুয়া মেয়েদের। একবার একটু চোখের দেখা দেখবার জন্য। আর আমিও ঐ ভীড় ঠেলে গটগটিয়ে দোতলায় উঠে যেতাম। একদিন তো মহুয়াকে বলেই ফেললাম ওদের কথা। ওহ! আমি তো মূল কথাটাই বলতে ভুলে গেছি। সেই ১৯৬৯ সাল থেকে যতদিন দুজনের কথাবার্তা হয়েছে একে অপরকে " তুই" বলেই সম্বোধন করেছি। আশির দশকে এত নামডাক হ‌ওয়া সত্বেও এই সম্বোধনের পরিবর্তন হয়নি। উনি আমাকে " দাদা" বলেই ডেকেছেন, আর আমিও ওনাকে একটা বিশেষ নামে ডাকতাম।‌
** আমি একদিন বলেছিলাম, "যা না, একবার ব্যালকনিতে গিয়ে দুটো মিনিট দাঁড়া না। তোকে দেখতে পেলে মেয়েগুলো বর্তে যাবে। " সেদিন বোধহয় মুড খুব ভালো ছিল। আমার কথা শুনে মেয়েগুলোকে হাত নেড়ে অভিবাদন করে এলো। ওমা, এসেই আমার ওপর চোটপাট। " আজকে বলেছিস বলেছিস, ফারদার আর এরকম রিকোয়েস্ট করতে আসবি না। তাহলে মেরে তোর নাকমুখ ফাটিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেবো। " বলেই সেই নির্মল হাসির ফোয়ারা। " শ্রীমান পৃথ্বিরাজ " ছবির সফলতার পর " মৃণালিনী " সিনেমা হলের উল্টোদিকে" কেরালা রেস্টুরেন্ট "- এ আমাদের কয়েকজনকে খাইয়েছিলেন এখনও মনে আছে। এখন তো যেদিকে তাকাই, সবদিকে ফ্ল্যাট বাড়ি বা বহুতল ভবনের ছড়াছড়ি। কিন্তু সত্তর দশকে খুব কম লোকেরই সাধ্যে কুলোতো একটা ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকার।‌ মহুয়া ঐ দশ বছরের মধ্যে তিন তিনটে ফ্ল্যাট বাড়িতে বাস করে গেছেন।
** ওনার কল্যাণে আমি বেশকিছু নামজাদা মানুষের সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ‌ও পেয়েছিলাম। উৎপল দত্ত, বিকাশ রায়, অনুপকুমার, অলকা গাঙ্গুলি, তাপস পাল, মাধবী মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা রায় প্রমুখ। একটা ঘটনার উল্লেখ করে প্রতিবেদন শেষ করবো। ১৯৭৯/৮০ সালের ঘটনা। একদিন হঠাৎ পিনাকী আমার বাড়িতে সকালে এলো। তখন আমি রীতিমতো কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারী, ডাক বিভাগের অন্তর্গত কলকাতা এয়ারপোর্ট সর্টিং ডিভিশন এ চাকরি করি। আগের রাতে নাইট ডিউটি করে বাড়িতে এসে শুয়ে আছি। পিনাকী এসে বললো, " আজ বিকেলে পাঁচটার সময় চলে আসবি।‌ বোন তোকে থাকতে বলেছে কিসব বলবে" । আমি তো গেলাম দেখি উনি ঘুমোচ্ছেন। প্রায় ছটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে ( গায়ে একটা কালো ফুল ছাপের নাইটি পরা) সোজা আমাকে পিটুনি। আমি বললাম " মারার জন্য ডেকে এনেছিস? ধুর, আমি চললাম। তোর চকলেট নে" । ওকে চকলেট খাওয়ানোটা আমার একটা কাজ ছিল। বললো " না রে, গায়ে হাত পায়ে একটু ব্যথা করছিল তোকে মেরে ঠিক করে নিলাম। আসলে কি জানিস আজকে সকালেই তো শিমুলতলা থেকে ফিরলাম তরু মামার ছবির শুটিং সেরে। ভাবলাম তোকে আগে গল্পটা বলে নেই। তাই ডেকেছি । তোর আজকে অফিস আছে নাকি? " আমি উত্তরে বলেছিলাম, ও এই ব্যাপার। তাহলে বলেই ফ্যাল শুনে নেই। " নিজের হাতে কফি বানিয়ে একটা প্লেটে করে চানাচুর ঢেলে সেন্টার টেবিলে রেখে দুম করে আমার গা ঘেঁষেই সোফায় বসে পড়লো। আমার শুধু এই ধাঁধাটা কোনোদিনই যাবে না যে, যে মেয়েটাকে আমি নিজের চোখে এতদিন স্টোভ বা গ্যাস ওভেন অন করে খাবার তৈরি করতে দেখেছি তাঁর মৃত্যু ওভাবে হ‌ওয়াটা যথেষ্ট আশ্চর্যের। যাক, তো সেদিন রাত দশটা পর্যন্ত ওঁর মুখে " দাদার কীর্তি " ছবির বহির্দৃশ্য ( outdoor) ) যেটা শিমুলতলাতে হয়েছিল তার গল্প শুনলাম। সেদিনের সন্ধ্যাটা ছিল আমার কাছে
" বিশেষ স্মরণীয় " । এই সৌভাগ্য কজনের হয়?
** বহু স্মৃতি জমা হয়ে আছে। পরে আবার কোনদিন বলবো খন।
অ্যাডমিন এই লেখাটা ভীষণ স্পর্শকাতর যা আমার জীবনে বাস্তব রূপে ছিল । অনুমোদন দিলে বাধিত হবো।

মহুয়া রায়চৌধুরীর 37তম মৃত্যুবার্ষিকীতে মহুয়া রায়চৌধুরীকে নিয়ে লিখলেন বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়

 ২২ জুলাই, বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে ভীষণ শোকের। ১৯৮৫ সালে এই দিন হারিয়ে গিয়েছিলেন মহুয়া রায়চৌধুরী। মহুয়ার সঙ্গে বিপ্লব বহু ছবি করেছেন। আনন্দবাজার অনলাইন যোগাযোগ করতেই বিষণ্ণ গলায় বললেন, ‘‘মহুয়ার সঙ্গে পরিচিতি কি আজকের? অভিনয়ে আসার আগে থেকে ওর মাকে চিনতাম। মহুয়া তখন শিপ্রা। ওর মা টেলিফোনে চাকরি করতেন। খুব ভাল নাচ জানতেন। নানা জায়গায় মঞ্চানুষ্ঠান করতেন। মহুয়ার বাবাও জনপ্রিয় নৃত্যশিল্পী।’’


মহুয়ারা তখন দমদমের একটি আবাসনের বাসিন্দা। ছোট থেকে অভিনেত্রীও স্বাভাবিক ভাবেই নাচের তালিম নেন। পারদর্শীও হয়ে ওঠেন। তরুণ মজুমদারের ‘শ্রীমান পৃথ্বিরাজ’ তাঁর প্রথম ছবি। পরিচালকই তাঁর নাম বদলে রাখেন মহুয়া। প্রথম ছবিতেই নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন অভিনেত্রী। ফলে, আর তাঁকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি, এমনই বক্তব্য বর্ষীয়ান অভিনেতার।

ব্যক্তি মহুয়া কেমন ছিলেন? বিপ্লবের কাছে প্রশ্ন ছিল আনন্দবাজার অনলাইনের। অভিনেতার কথায়, ‘‘মহুয়া ফুলের মতোই মিষ্টি ছিল। যেমন রূপ তেমনই প্রতিভা। আজও ওর তুলনা মহুয়া নিজেই। সারা ক্ষণ সবাইকে নিয়ে আনন্দে মেতে থাকত। কোনও ভণিতা ছিল না। শিশুদের ভীষণ ভালবাসত। ইন্ডাস্ট্রির দুঃস্থ কলাকুশলীর কত সন্তান যে মহুয়ার দেওয়া অর্থে পড়াশোনা করে বড় হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। রোজগারের একটা বড় অংশ ও অকাতরে দান করে দিত।’’ এ-ও জানিয়েছিলেন, একই সঙ্গে ভালবাসতেন কুকুর। স্টুডিয়োর সমস্ত কুকুর ওর পোষ্য। মহুয়া নিয়মিত তাদের খেতে দিতেন। যত্ন নিতেন। মহুয়ার দেহ যখন স্টুডিয়োয় নিয়ে আসা হয়েছিল ওরা সবাই এসে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে। মাথা নীচু সবার। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। উপস্থিত সবাই সে দিন বিস্মিত পথপশুদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন দেখে!

এমন প্রাণবন্ত শিল্পী এ ভাবে অকালে ঝরে গেলেন! বর্ষীয়ান অভিনেতার যুক্তি, মৃত্যু বলে আসে না। কোন রূপ ধরে আসবে কেউ জানে না। এবং মহুয়ার মৃত্যু যেহেতু বিতর্কিত তাই বিষয়টি নিয়ে তিনি কোনও কথাই বলবেন না। ওঁর চোখে মহুয়া এখনও হুল্লোড়ে মেতে ওঠা মিষ্টি একটি মেয়ে। যে নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াতে ভালবাসত। প্রায়ই সেটে সবার জন্য রান্না করে নিয়েও আসতেন। আর পরিবারে কোনও অশান্তি হলে? ‘‘তখন একটু চুপচাপ। হালকা বিষণ্ণ। সবার আড়ালে হয়তো চোখও ভিজে উঠত। কিন্তু কিছুতেই সেটা সবার সামনে প্রকাশ করত না মহুয়া’’, দাবি বিপ্লবের। তাই অভিনেত্রীর আকস্মিক প্রয়াণ আজও তাঁকে কষ্ট দেয়। বর্ষীয়ান অভিনেতার মতে, ‘‘অনেক বড় শিল্পী। খুব বড় মনের মেয়ে। আমার ভীষণ ভাল বন্ধু। ওর মৃত্যু আজও মেনে নিতে পারিনি।’’


সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা

দেবশ্রী রায় মহুয়া রায়চৌধুরী নিয়ে কথা বলেছেন তার 37তম মৃত্যুবার্ষিকীতে

মহুয়া রায়চৌধুরীকে আমি ছোট্ট থেকে চিনি। আমি আর আমার দিদি কৃষ্ণা রুমকি-চুমকি নামে নাচ অনুষ্ঠান করতাম। মহুয়াদিও তখন তেমনই শিশু নৃত্যশিল্পী। বাড়ির নাম শিপ্রা। পোশাকি নাম সোনালি রায়চৌধুরী। ওঁর বাবা আমার মাকে বৌদি বলে ডাকতেন। সেই সময়ে একটি অ্যামেচার ক্লাব প্রতি রবিবার ছোটদের নাচের অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। আমরা তো যেতামই। মাঝেমধ্যে মহুয়াদিও অংশ নিতেন। সেই মহুয়াদি অভিনয়ে এলেন আমারই মতো। তরুণ মজুমদারের হাত ধরে। তনুদা ওঁরও নাম বদলে রাখলেন মহুয়া। প্রথম ছবি ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’।


এর পরেই আমরা একসঙ্গে ‘দাদার কীর্তি’ ছবিতে। তত দিনে মহুয়াদির বিয়ে হয়ে গিয়েছে। এক ছেলে গোলা-ও এসেছে কোলে। সে সব মায়ের মুখে শুনেছিলাম। আমাদের বয়সের অনেক ফারাক। তাই দিদি মায়ের সঙ্গে বেশি কথা বলতেন। আমার মা ছিল ওঁর ‘মাসিমা’। আমরা মহুয়াদির বর তিলক চক্রবর্তীকেও চিনতাম। তিলকদা মঞ্চে কিশোরকুমারের গান গাইতেন। সেই থেকেই প্রেম। মাকে বলেছিলেন, ‘‘মাসিমা, আমরা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছি।’’

সেটে কম কথা হলেও একটা জিনিস খেয়াল করতাম। দিদি বেশ মেজাজি। এই হাসিখুশি, কিছু ক্ষণ পরেই বেজায় রেগে গিয়েছেন। খুব রগচটা ছিলেন। আর রেগে গেলে অনেক সময়েই যা মুখে আসত, তা-ই বলতেন। শুনেছি, তখন নাকি গালিগালাজও করে বসতেন অনেককে। মাথা ঠান্ডা হলেই আবার সব ঠিক। এ সব দেখে এক এক সময়ে মনে হত, সংসার জীবনে কি সুখী ছিলেন না মহুয়াদি? প্রায়ই ওঁকে দেখতাম কেমন যেন অশান্ত। কিন্তু রূপটান নেওয়ার পর সে সব ভুলে যেতেন। অভিনয়ে কোনও দিন কোনও খামতি রাখতেন না।

আর ছেলে অন্তপ্রাণ ছিলেন। একমাত্র ছেলেকে চোখে হারাতেন। টালিগঞ্জের খুব কাছেই ভাড়াবাড়িতে থাকতেন ওঁরা। তখন ‘দাদার কীর্তি’র শ্যুট চলছে। এক বার শ্যুটের পরে নাকি তিলকদার বাইকে চেপে মহুয়াদিকে রাস্তায় ঘুরতে দেখেছিলেন সন্ধ্যা রায়। পর দিন মহুয়াদি স্টুডিয়োয় আসতেই তোড়ে বকুনি। সন্ধ্যাদির বক্তব্য, নায়িকাদের পথেঘাটে ঘুরতে দেখা গেলে আকর্ষণ থাকবে? বকুনি খেয়ে মুখ কাঁচুমাচু করে ফের আমার মায়ের কাছেই মহুয়াদি। বিষণ্ণ গলায় বলেছিলেন, ‘‘সন্ধ্যাদি কী বকলেন!’’ মা সে দিন বুঝিয়েছিলেন, সন্ধ্যাদি সবার মায়ের মতো। মায়েরা তো সন্তানদের ভাল-মন্দ বলবেনই, আগলাবেনও।

‘দাদার কীর্তি’র পর আরও একাধিক ছবিতে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। ‘সুবর্ণ গোলক’ ছবিতে আবার আমরা দুই বোন। ‘পারাবত প্রিয়া’য় মহুয়াদি নার্স হয়েছিলেন। যত ভাল অভিনেত্রী, সম্ভবত ততটাও সংসারী ছিলেন না। এক দিন স্টুডিয়োয় এসে সটান আমার ঘরে। আমি তখন ‘ভালবাসা ভালবাসা’-র শ্যুট করছি। বললেন, ‘‘বললেন, কল শো-তে গিয়ে আমার মেকআপ বক্স হারিয়ে ফেলেছি। তোরটা একটু দিবি? নইলে শ্যুট করতে পারব না!’’ শুনে একটু অবাকই হয়েছিলাম। সে দিন আমার সঙ্গে, তনুদার সঙ্গে অনেক গল্প করেছিলেন। অদ্ভুত ভাবে খুব শান্ত! তার পরে মেকআপ বক্স নিয়ে শ্যুট করতে গেলেন।

পর্দায় আমরা দুই বোন। কিন্তু বাস্তবে একদম বিপরীত। ভাল অভিনয়ের খিদে দু’জনেরই। পর্দা ভাগ করতে গিয়ে দু’জনেই সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করতাম। ফলে, সুস্থ প্রতিযোগিতা ছিল। প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা তলায় তলায় রাজনীতি করা— মাথাতেই আসত না। আরও একটি বিষয়ে মিল। আমার মতো মহুয়াদিও পশুপ্রেমী ছিলেন। স্টুডিয়োয় এসেই প্রথমে সমস্ত কুকুরদের খাওয়াতেন। তার পর কাজ শুরু করতেন। আমার প্রথম হিন্দি ছবি ‘জাস্টিস চৌধুরী’ মুক্তি পেল। তখন ছবির ভিডিয়ো ক্যাসেট পাওয়া যেত। রূপসজ্জাশিল্পী বুড়োকে ডেকে বলেছিলেন, ‘‘তুই আমার বাড়িতে আয়। একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করে আমরা চুমকির ছবিটা দেখব। ও তো আমাদের ঘরের মেয়ে।’’ এই সব গুণের জন্যই আমার মতো মহুয়াদিকেও ইন্ডাস্ট্রি ভীষণ ভালবাসত। ওঁর ‘আদমি ঔর অওরত’ আমার প্রিয় ছবি।

এ সবের মধ্যেই ১৯৮৫ সালে সর্বনাশা ২২ জুলাই। কী করে গায়ে আগুন লাগল? পুড়ে গিয়েছিলেন, না কি অন্য কিছু? সব উত্তর অজানা রেখেই বড্ড অসময়ে চলে গেলেন মহুয়াদি। অনেক কাজ বাকি ছিল। অনেক সম্মানও পাওনা ছিল। সেটে এসেও ছেলের কথা কিছুতেই ভুলতে পারতেন না। সব শিশুর মধ্যেই নিজের ছেলেকে খুঁজতেন। তাই বাচ্চাদের দেখলেই কাজ ফেলে খেলায় মেতে উঠতেন দিব্যি। নিজের ছেলে গোলাকে নিজের হাতে আর মানুষ করাই হল না মহুয়াদির! 


সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা

তরুণ মজুমদার এর চোখে মহুয়া রায়চৌধুরী

  শিপ্রা থেকে মহুয়া রায়চৌধুরীতে রূপান্তর তাঁর হাতেই । মহুয়াকে নিজের মেয়ের মতোই দেখতেন তরুণ মজুমদার । ইন্ডাস্ট্রিও জানত বা এখনও জানে মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়, দেবশ্রী রায় এবং মহুয়া রায়চৌধুরী হলেন তরুণ মজুমদারের তিন মানসকন্যা । তাঁদের মধ্যে মহুয়া রায়চৌধুরীকে জীবনের মঞ্চ থেকে বিদায় নিতে হয় অকালেই । তাঁর মৃত্যুতে গভীরভাবে আহত হন প্রয়াত পরিচালক ।

সাধারণ পরিবারের মেয়ে মহুয়া ছিলেন পরিচালক তরুণ মজুদারের 'আবিষ্কার' । অভিনয়ের জন্য তাঁকে পরিশীলিত তথা গ্রুমিং করেছিলেন সন্ধ্যা রায় । ১৯৭৩ সালে তরুণ মজুমদারের পরিচালনায় মুক্তি পায় মহুয়া অভিনীত প্রথম ছবি শ্রীমান পৃথ্বীরাজ । বক্স অফিসে এই ছবি ছিল সুপারডুপার হিট । এর পর মহুয়াকে আর ছবির জন্য অপেক্ষা করতে হয়নি । 'সেই চোখ', 'বাঘবন্দি খেলা', 'কবিতা', 'বেহুলা লখিন্দর', 'শেষরক্ষা', 'সুবর্ণগোলক', 'সেই সুর', 'সাহেব', 'কপাকুণ্ডলা', 'ইমনকল্যাণ', 'অমৃতকুম্ভের সন্ধানে', 'পারাবত প্রিয়া', 'তিল থেকে তাল'-সহ একাধিক বক্সঅফিস সফল ছবির নাযিকা ছিলেন মহুয়া ।

সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি বলিষ্ঠ অভিনয়ে অনুরাগীদের মুগ্ধ করেছিলেন তিনি । তাঁর স্বপ্নের উড়ান মুখ থুবড়ে পড়ে ১৯৮৫ সালের ২২ জুলাই । নিজের বাড়িতে ভয়ঙ্করভাবে অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রয়াত হন তিনি । সে সময় মহুয়া ছিলেন টালিগঞ্জের প্রথম সারির নায়িকা । একসঙ্গে কাজ করছিলেন বা করার কথা ছিল ১৫ টি ছবিতে । তাঁর মৃত্যুর পর মুক্তি পেয়েছিল 'অনুরাগের ছোঁয়া', 'প্রেম ও পাপ', 'অভিমান', 'আশীর্বাদ', 'কেনারাম বেচারাম'-এর মতো ছবি ।


মহুয়া রায়চৌধুরীর মৃত্যু আজও রহস্যের ধোঁয়ায় ঘেরা । প্রচুর জলঘোলা হলেও এর উপর থেকে যবনিকা আজও ওঠেনি । মহুয়ার অকালমৃত্যু প্রসঙ্গে তরুণ মজুমদার বলেছিলেন, " অতি অল্প সময়ের জন্য সে এসেছিল ৷ অভিনয় দিয়ে সবার মন জয় করে অকালেই সে চলে গেল সবার চোখের আড়ালে ৷ " জীবনে মৃত্যু নিষ্ঠুর, মানতেন তরুণ মজুমদার । কিন্তু বলেছিলেন তাঁর কন্যাসম মহুয়ার বেলায় যে মৃত্যু দেখতে হয়েছিল, সেরকম নিষ্ঠুর মৃত্যু যেন তাঁকে আর না দেখতে হয় ।

মহুয়া রায়চৌধুরী এবং প্রতিবেশীদের সাথে তার সামাজিক সম্পর্ক

 আমরা জানি যে চলচ্চিত্রের সেলিব্রিটিরা তাদের প্রতিবেশীদের সাথে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেন, তা 50 বছর আগে হোক বা এখন। তারা খুব কমই সামাজিক সমাবেশে যোগ দেয় যদি এটি একটি ব্যবসায়িক চুক্তি না হয়।



অনেকের মধ্যে আলাদা ছিলেন অভিনেত্রী মহুয়া রায়চৌধুরী। এমনকি সে যখন শিখরে ছিলেন, তখনও তিনি মাটির কাছাকাছি ছিলেন। এমন অনেক উদাহরণ আছে যেখানে আমরা দেখতে পাই যে মহুয়া রায়চৌধুরী তার প্রতিবেশীদের সাথে কতটা ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

একটি বিবাহ বউভাত সম্পর্কিত সমাবেশ যেখানে মহুয়াকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এবং কীভাবে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন তা নীচে দেওয়া হল। বর্ণনাটি একজনের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া।

মহুয়া রায়চৌধুরীকে কাছ থেকে দেখার স্মৃতিচারণ করেছেন শিব মুখোপাধ্যায়।
১৯৮২ সাল। পিসতুতো দাদার বিয়ে। উলটো দিকের নবনির্মিত ফ্ল্যাট বাড়ির এক তলার বাসিন্দা মহুয়া দি, পরিবার সহ।
বউভাতের দিন দুপুরে মহুয়াদি এলো। দুপুরের খাওয়াদাওয়াতে আমরাই পরিবেশন করেছিলাম। আজকের নায়িকাদের মতো নয়, সব কিছুই খেলো।এমনকি মিস্টিও! খাওয়ার সময় সবার সাথে হাসাহাসি, খাবার পর পিসেমশাইয়ের থেকে পান নিয়ে মুখে দিয়ে জমাটি আড্ডা সবার সাথে।
যাবার সময় বলে গেলো, রাতে ফিরতে দেরি হবে। তাই আসবে না।

তখন আমি ক্লাস টুয়েলভে। দিদি -ভাইয়ের সম্পর্কটা সদ্য শুরু হয়েছে, হঠাৎ দিদি নেই হয়ে গেলো!
আমার বাড়ির ৬টা বাডি পরে মহুয়াদির বাড়ি। কিন্তু, পুলিশের জন্য পিসির বাড়িতে পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছতে পারিনি!