সম্পূর্ণ আলোচনাগুলো পাওয়া যাচ্ছে না, এখানে শুধু কিছু অংশ আছে
ওঁকে যেভাবে চরিত্রটা বুঝিয়েছিলাম, তার থেকেও অনেক অনেক ভালো করেছিল মহুয়া। একটি চরিত্রের কতটা গভীরে ঢোকা যায় সেটা ওর অভিনয়েই প্রকাশ পেয়েছিল। রোলটি করে দর্শকেরও প্রচুর প্রশংসা পেয়েছিল। ‘আমার দেখা অন্যতম সেরা অভিনেত্রী। ওাহারা! ওর বয়সটাও তো দেখতে হবে।’
মহুয়ার অভিনয়ের প্রসঙ্গে তরুণ মজুমদারের ছবি ‘দাদার কীর্তি’-র কথা অবশ্যই বলা প্রয়োজন। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনী। এ ছবিতেও সরস্বতী মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রে মহুয়ার অভিনয় দর্শকের প্রশংসা লাভ করে। আসলে কোনও রোলেই দর্শকদের আশাহত করেননি অভিনেত্রী। আর এটাই ছিল তাঁর অভিনয়ের সবথেকে বড় গুণ। সাধারণ একটি চরিত্রকেও অন্য পর্যায়ে অনায়াসে তুলে নিতে পারতেন মহুয়া। ‘দাদার কীর্তি’-তে তাপস পাল ছিলেন তাঁর বিপরীতে। ছবিটি ২৮.১১.৮০-তে মুক্তি পেয়েছিল। বলা বাহুল্য, এ ছবিটিও খুব ভালো চলেছিল। তাপস-মহুয়া জুটি ‘অনুরাগের ছোঁয়া’-ও বক্স অফিসে তুমুল সাড়া ফেলেছিল। টাইটেল ভূমিকায় অভিনয় করেন মহুয়া। ‘এই তো স্বর্গের’ নামে আরেকটি ছবিতেও টাইটেল ভূমিকায় ছিলেন তিনি। মারা যাওয়ার পরেও মহুয়ার বেশ কয়েকটি ছবি মুক্তি পায়।
মহুয়ার আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ছবি হল ‘শেফালিকা’, ‘কবিতা’, ‘দৌড়’, ‘উপলব্ধি’, ‘সাহেব’, ‘পাহাড়ী ফুল’, ‘মাদার’, ‘সুবর্ণগোলক’, ‘প্রতিশোধ’, ‘কপালকুণ্ডলা’, ‘আজ কাল পরশু-র গল্প’, ‘অমৃত কুম্ভের সন্ধানে’, ‘পারমা’, ‘আশীর্বাদ’, ‘রাজপুরুষ’ প্রভৃতি। ‘দৌড়’ ও ‘শেফালিকা’ দুটি ছবির পরিচালকই শঙ্কর ভট্টাচার্য। রবীন্দ্রনাথের ‘শেষরক্ষা’ ছবিতে ইন্দুমতীর চরিত্রে অভিনয় করে বি এফ জে এ পুরস্কার পেয়েছিলেন মহুয়া। তবে সবসময় বলতেন, ‘দর্শকদের ভালোবাসাই আমার সবথেকে বড় পুরস্কার।’ তেরো বছরে প্রায় একশোর কাছাকাছি ছবিতে অভিনয় করেছেন। যা একটি রেকর্ড।
১৯৭৬ সালের ২মে তিলক চক্রবর্তীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন মহুয়া। এক সময় মাষ্টার তিলক নামে কয়েকটি বাংলা ছবিতে অভিনয় করেন। তাঁরাও একটি পুত্রসন্তান। ডাকনাম গোলা, ভালো নাম তমাল। মহুয়ার নয়নের মণি ছিল গোলা। একবার শুটিংয়ের অবসরে আমাকে বলেছিলেন, ‘আমার ছেলের জন্যই আমাকে আরও অনেকদিন বাঁচতে হবে। গোলাকে পড়াশোনা করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করতে হবে। ওর বিয়ে দেব। ঠাকুরমা হওয়ার পরই যেন আমার পৃথিবী ছাড়ার ডাক আসে।’ মহুয়ার এই কথাগুলোর অনুরণন আজও হয় আমার মনে। অদৃষ্টের নিষ্ঠুর পরিহাসে সবকিছু ছেড়ে তাঁকে চলে যেতে হল। মহুয়া যখন মারা যান তখন তাঁর ছেলের বয়স মাত্র সাড়ে চার। আজ পূর্ণ বয়সের এক যুবক। মায়ের কথা নিশ্চয়ই তমালের মনে পড়ে। মহুয়া মারা যাওয়ার ঠিক এক মাসের মাথায় তাঁর ‘আশীর্বাদ’ ছবিটি ২২.৮.৮৬-তে রূপবাণী, অরুণা, ভারতী সহ অনেকগুলো প্রেক্ষাগৃহে একযোগে মুক্তি পায়। পরিচালক বীরেশ চট্টোপাধ্যায় সেই সময় মহুয়ার মৃত্যুতে শোকে মৃয়মান বজ্রাহত। বলার অপেক্ষা
সেই সময় এই সংলাপের সুর ধরে বহু মানুষকে বাসে-ট্রামে আলোচনা করতে শুনেছি— মহুয়া রায়চৌধুরী কি সত্যিই পারিবারিক জীবনে মনোকষ্টে ছিলেন?
মারা যাওয়ার আগের দিন বিকেলে মহুয়ার সঙ্গে নতুন চিত্রনাট্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েছিলেন বীরেশ চট্টোপাধ্যায়। বীরেশদা আমাকে বলেছিলেন, ‘মিষ্টি আলিপুরের যে ফ্ল্যাটে মহুয়া থাকত তার ওপরের ফ্ল্যাটে থাকতেন পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী। পরদিন প্রস্তাবিত ছবির নামে বিমর্ষ ছিল মহুয়া। মহুয়া বলল, চিন্তা কোরো না বীরেশদা সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। কিন্তু কেন জানি না ওঁর মুখ গম্ভীর লাগছিল। মুখের সেই হাসি দেখতে পেলাম না। ওক্ অদ্ভুত অস্থির লাগছিল ওকে। তিলকও ঘরে ছিল। কিন্তু আমাকে যেন চিনতেই পারল না। পরদিনই মহুয়ার আগুনে পুড়ে যাওয়ার মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কথা শুনলাম। মহুয়ার চোখো দিনের শুটিং বাকি ছিল। এ অবস্থায় ছবি রিলিজ করা কখনওই সম্ভব নয়। প্রযোজক প্রবীর মজুমদারের তো মাথায় হাত। ছবিটি অনেক কায়দা করে কমপ্লিট করলাম। মুক্তিও পেল। দারুণ চলেছিল। মহুয়া ছিল সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের ঘরানার শিল্পী।’ ১৯৮৬ সালের ১২-১৩ জুলাইয়ের মধ্যরাত। নিজের ফ্ল্যাটেই আগুনে রহস্যজনকভাবে পুড়ে গেলেন মহুয়া। বাক্ শক্তি শূন্য। তাঁকে ভর্তি করা হল ক্যালকাটা হাসপাতালে। দশ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন মহুয়া। বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সফল এক নায়িকার বর্ণময় জীবনের এখানেই ইতি।
পুলিশ তদন্ত শুরু করল। মহুয়ার বাড়ি থেকে বলা হল, স্টোভ সরাতে গিয়ে হঠাৎ স্টোভ ফেটে গায়ে আগুন ধরে যায় তাঁর। কিন্তু পরে পুলিশের তদন্তে প্রমাণিত হয় যে, স্টোভ ফেটে গায়ে আগুন লাগার ব্যাপারটা পুরোপুরি বানানো। কারণ, সেটে এক ফোঁটাও কেরোসিন তেল ছিল না। বরং মহুয়াকে যখন হাসপাতালে আনা হয় সেই সময় এমার্জেন্সি বিভাগের চিকিৎসকরা তাঁর সারা শরীর থেকে কেরোসিনের গন্ধ পেয়েছিলেন। মহুয়ার মৃত্যু নিয়ে একবার অভিনেতা ও তৃণমূল বিধায়ক চিরঞ্জিবের সাথে আমার কথা হয়। তাঁরা একসঙ্গে কয়েকটি ছবিতে কাজ করেছিলেন। চিরঞ্জিব আমাকে বলেছিলেন, ‘মহুয়ার মতো মেয়ে নিজে থেকে মরতে পারে না। যতদূর সম্ভব কোনও বড় রহস্য আছে। বা ওর মৃত্যুর সঙ্গে তিলকের ভাগ্য গড়ে উঠেছে?’
মহুয়ার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী অভিনেত্রী শ্রীমতী ভদ্র ঘোষাল এই দুর্ঘটনার পর একের পর বার হাসপাতালে গিয়েছেন। তাঁর মতে এটি নিশ্চিতই দুর্ঘটনা। এমনকী মহুয়াও সি আই ডি অফিসারদের মৃত্যুকালীন জবানবন্দি দিয়েছেন— তাঁর গায়ে আগুন লাগাটা দুর্ঘটনা ছাড়া কিচ্ছু নয়। তবে প্রশ্ন একটাই— কাকে বাঁচাতে গিয়ে আর জীবন বাঁচাই বা মহুয়া এই জবানবন্দি দিতে বাধ্য হন?
বলেছিল, ‘আমার দেখা বাংলা ছবির অন্যতম প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী মহুয়া। ওই বয়সে ওর মতো অভিনেত্রী টালিগঞ্জে কেউ ছিল না। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার বেশিদিন বাঁচল না। যদি বেঁচে থাকত আরও কত কী যে করে দেখাত কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। একের পর এক ছবিতে ওর ভূয়সীপ্রশংসা কাজ গোটা বাংলা ইন্ডাস্ট্রিকে একেবারে হতবাক করে দিয়েছিল। মহুয়ার শটগুলো মনিটরে দেখে ভাবতাম, ওর মতো আমি অভিনয় করতে পারি না কেন? ছোট্ট একটা উদাহরণ দিচ্ছি। কোনও কিছু আমাদের পছন্দ না হলে কখনও কখনও এক ধরনের বিরক্তি আমাদের চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ে। কণ্ঠস্বরে পরিবর্তন ঘটে। আমি জানি না মহুয়া এটা কীভাবে রপ্ত করেছিল, তবে এরকম কোনও সিন থাকলে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ওর চেহারাটাই আমূল বদলে যেত। এটা পারতেন উত্তমদা, সুচিত্রা সেন, সাবিত্রীদির মতো হাতেগোনা কয়েকজন। আসলে ব্যক্তিগত জীবনে মহুয়ার প্রচুর মানসিক জ্বালা-যন্ত্রণা ছিল। যেটা কোনও দিনই কারও কাছে মন খুলে বলতে পারেনি। সেটা প্রকাশ পেত ওর অভিনয়ে। মহুয়ার ক্ষতি অনেকেই অনেকভাবে করেছে। মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকেছে। কিন্তু কারও প্রতি অনুযোগ ছিল না ওর।’
ছবি নিয়েই পার্থর সঙ্গে একবার ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল মহুয়ার। জিজ্ঞাসা করলাম— তোমাদের ভুল বোঝাবুঝি কীভাবে মিটল? বলল, ‘সে অনেক কথা। সংক্ষেপেই বলি, তখন আমি কিছুদিন হল বিয়ে করেছি। একদিন মহুয়া আমাদের ফ্ল্যাটে এসে আমার স্ত্রীকে বলল, তোমাদের ফ্ল্যাটে আমাকে দিনসাতেক থাকতে দেবে? আমার বাড়ির এমনই পরিবেশ যে সেখানে আর থাকতে পারছি না। ওর প্রায় কাঁদো কাঁদো মুখ দেখে আমার খুব খারাপ লেগেছিল। সেই সময় আমরা লাঞ্চ করছিলাম। ইলিশ মাছ দেখে মহুয়াও বলল, আমিও ইলিশ মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাব। ওর প্রিয় মাছ ইলিশ। খুব তৃপ্তি করে খেল। আমাকে বলেছিল, পার্থ তুমি কিছু মনে কোরো না। ‘অবশেষে’ ছবিতে কাজ না করাটা আমার ভুল ডিসিসন। বাস, আমারও ওর ওপর থেকে সব অভিমান দূর হয়ে গেল। মহুয়া খুব সরল-সোজা মানুষ ছিল।’ পার্থ বলল, ‘মহুয়াকে নিয়ে একটা ঘটনার কথা না বলে থাকতে পারছি না। আনোয়ার শা রোডে এন টি টু-তে (নিউ থিয়েটার্স দু’নম্বর স্টুডিও) ‘বেহুলা লখীন্দর’ ছবির শুটিং হচ্ছিল। বেহুলার ভূমিকায় মহুয়া। ও আমাকে লাঞ্চে ডেকেছিল। সেদিন লাঞ্চের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়ে একটা আশ্চর্য ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইলাম। এই ঘটনা আমার মনে কিছুটা আতঙ্কেরও সৃষ্টি করেছিল। তখন সবে শুটিং-ব্রেক হয়েছে। ফ্লোরে গিয়ে দেখলাম, মহুয়ার হাতে কয়েকটা সরু সরু একেবারে জ্যান্ত সাপ! আমাকে দেখে খুশি হয়ে বলল, তুমি এসেছ। সাপগুলোকে দু’হাতে তুলে আমাকে দেখিয়ে হেসে বলল, ভয় পেয়ো না। এগুলোর বিষ নেই। এরপর দেখি, জিভ বার করে সাপগুলোর মুখে ছোঁয়াচ্ছে। চুমু খাচ্ছে। মহুয়ার এসব কাণ্ডকারখানা দেখে তো আমি তাজ্জব! ভয় পাওয়াই কথা। বাইচান্স বিষ থাকলে তখন কী হবে? মহুয়ার কিন্তু কোনও তাপ-উত্তাপ নেই। ও হাসছে আর সাপগুলোকে আদর করছে। পরে লাঞ্চ-ব্রেক হতেই প্রোডাকশনের লোক এসে সাপগুলো নিয়ে গেল। এই হল মহুয়া। কোনও কিছুতেই যেন পরোয়া করত না। ওর মৃত্যুতে
একের পর এক ছবির সাফল্য আর উত্তরোত্তর জনপ্রিয়তা কিন্তু মহুয়ার মাথা ঘুরিয়ে দেয়নি। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েটি দু’হাতে বিস্তর টাকা-পয়সা রোজগার করলেও তাঁর স্বাভাবিক আচার- আচরণে তার বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়েনি। পাশের বাড়ির মেয়ের একটা ইমেজ তাঁর বরাবরই ছিল দর্শকদের মনে। আম জনতার এই অকৃপণ ভালোবাসাই ছিল মহুয়ার আসল চালিকা শক্তি। দর্শকরা চিরকালই তাঁকে বিশেষ স্নেহের চোখেই দেখেছেন। মহুয়ার গানে লিপ দেওয়ার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। আসলে ছোটবেলা থেকেই গানের তালে তালে তাঁর পা দুটোও নেচে উঠত। তাঁর পায়ের ছন্দ, চোখ-মুখের এক্সপ্রেশনে এক অন্য শিল্প ধরা পড়ত। তাঁর সমসাময়িক অভিনেত্রীদের মধ্যে একমাত্র দেবশ্রী রায় ছাড়া নাচ তেমন কেউ জানতেন না। অবশ্য নায়িকা হিসেবে দেবশ্রীর উত্থান মহুয়া চিরবিদায় নেওয়ার পরই। ক্লাসিক্যাল ও মডার্ন ডান্স দুটোতেই সমান পারদর্শিনী ছিলেন মহুয়া। তাঁর আরও একটা বিশেষ গুণ, সায়লেন্ট অ্যাক্টিং। ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’-এ মহুয়াকে দিয়ে এই নীরব অভিনয়টাই করিয়েছিলেন তরুণ মজুমদার। এ ছবিতে মহুয়ার মতো একেবারে আনকোরা অভিনেত্রী ‘সখী ভাবনা কাহারে বলে’ রবীন্দ্রসংগীতে কী সুন্দরই না লিপ দিয়েছিলেন। আবার ‘যে যেখানে দাঁড়িয়ে’ ছবিতে জিপের মধ্যে বসে গাইছেন ‘ওই নীল দিগন্তে ফুলের আগুন লাগল’ কিংবা শুধু রবীন্দ্রসংগীত নয়, এমনি বহু গানও তাঁর লিপে পর্দায় অন্য আবেদন বয়ে এনেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, মহুয়া ছিলেন বর্ণ আর্টিস্ট। জাত শিল্পী। এরকম ন্যাচারাল অ্যাক্ট্রেস বাংলা ছবিতে খুব বেশি আসেননি। তবে একথাও ঠিক, বেশ কিছু আজেবাজে ছবিতে কাজ করে মহুয়া তাঁর অভিনয় প্রতিভার অপচয় ঘটিয়েছেন। তাঁর নামেই এক সময় বাংলা ছবি চলত।
উত্তমকুমার মারা যাওয়ার কয়েক বছর পর বাংলা ছবির মরা গাঙে আবারও জোয়ারের স্রোত এনেছিলেন মহুয়াই। ’৮৪-র ১৫ জুন মহুয়া অভিনীত ‘লাল গোলাপ’ ছবিটির হাত ধরেই বাংলা ছবির বক্স অফিস পুনরায় চাঙ্গা হয়ে ওঠে। আর সে বছরই ৭ ডিসেম্বর প্রয়াত পরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর ‘শত্রু’ বক্স অফিসের সমস্ত হিসেব-নিকেশ উলটে সুপার-ডুপার হয়। এ ছবিতেও মহুয়ার উজ্জ্বল উপস্থিতি ভোলার নয়। ১৯৮৪ সালেই দূরদর্শনের ন্যাশনাল নেটওয়ার্কের জন্য তৈরি তপন সিংহের ‘আদমি অউর ঔরত’ ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রতিভার অনন্য নজির গড়েন মহুয়া। এক দেহাতীর ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয়! তাঁর বিপরীতে ছিলেন অমল পালেকর। মহুয়া সম্পর্কে তপনদার কথাগুলো আজও আমার স্মরণে আছে। ‘মহুয়ার মতো শিল্পী বাংলা ছবির সম্পদ ছিল। বিরল প্রতিভার অধিকারিনী। মাঝে মাঝে স্মিতা মানে অভিনেত্রী স্মিতা পাতিলের কথা আমার মনে পড়ে। দেখো স্মিতাও তো কত তাড়াতাড়ি চলে গেল। ওদের দুজনের অভিনয়, মৃত্যু সবকিছুর মধ্যেই অদ্ভুত একটা মিল যেন খুঁজে পাই। মহুয়া যদি বেঁচে থাকত অভিনেত্রী হিসেবে আজ এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যেত। ‘আদমি অউর ঔরত’-এর কথা কী আর বলব।
উৎস: একটি ম্যাগাজিন থেকে
২২ জুলাই, ভোর ৩-৪৫-এ বাংলা চলচ্চিত্রের শুকতারা মহুয়া রায়চৌধুরী রূপালী পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রায় অচেতন অবস্থায়, সকলের অজ্ঞাতে ব্যস্ততমা এই নায়িকা বিদায় নিলেন। কাঁদিয়ে গেলেন স্বামী তিলক, শিশুপুত্র তমাল, মা, বাবা, কাকা, দিদি এবং অগণিত চলচ্চিত্রানুরাগীকে।
মহুয়া রায়চৌধুরী গত ১১ জুলাই বৃহস্পতিবার গভীর রাতে নিজের বাড়িতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে ডায়মন্ড-হারবার রোডের কালকাটা মেডিকাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। সুচিত্রা সেনের পর, টালিগঞ্জের স্টুডিও মহলে এইরকম 'পিক পিরিয়ড' প্রবাহকালে কোন নায়িকার নাকি আসেনি। তাই মহুয়ার এই আকস্মিক অগ্নিদগ্ধ হবার ঘটনা স্টুডিওপাড়ার সঙ্গে যুক্ত সব তাঁর ও সাধারণ মানুষকেও হতবিহ্বল করে দেয়। শুরু হয় নানা জল্পনা-কল্পনা এবং ছড়িয়ে পড়ে নানা গুজব। মহুয়ার আগুন হবার মূলে কোন দুরাভিসন্ধি কাজ করেছে, না এটা নিছকই দুর্ঘটনা, কিংবা আত্ম-হত্যার চেষ্টা?
এমন সন্দেহ সকলের মনেই জেগে ওঠে। সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয় বিভিন্ন সংবাদপত্রে মহুয়ার স্বামী তিলক চক্রবর্তী এবং বাবা নীলাঞ্জন রায়চৌধুরীর পরস্পরবিরোধী বিবৃতিতে। যদিও এদের দুজনের মধ্যে কেউই আগুন লাগার সময় মহুয়ার সামনে ছিলেন না। ছিলেন নিজেদের ঘরে ঈষৎ তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায়। মহুয়ার চিৎকারে প্রথমে তাঁর স্বামী এবং স্বামীর ডাকাহাকে মহুয়ার বাবা জেগে ওঠেন। তবুও মহুয়ার স্বামী তিলকবাবু কোন সংবাদপত্রের প্রতিনিধিকে নাকি বলেছিলেন, 'স্টোভ বার্স্ট' করে মহুয়ার গায়ে আগুন লেগেছে। পুলিশ তাঁদের প্রাথমিক তদন্তে এই 'স্টোভ বার্স্ট'-এর কথা উড়িয়ে দেন। গত ১৪ জুলাই, রবিবার বেহালা থানায় যখন যোগাযোগ করতে যাই তখন একজন পদস্থ পুলিশ অফিসারের কাছ থেকে জানতে পারি, 'স্টোভ বার্স্ট করার মত সাক্ষ্য-প্রমাণ আমরা পাইনি।' মহুয়ার বাবা নীলাঞ্জন রায়চৌধুরীর কথায় 'স্টোভে তরকারি গরম করতে গিয়ে আগুন লাগে।'
এরপর প্রায় পাঁচদিন বাদে অবস্থার একটু উন্নতি হলে মহুয়া নিজেই গোয়েন্দা অফিসারদের জানিয়েছিলেন যে স্টোভ থেকেই তাঁর গায়ে আগুন লেগেছিল, অগ্নিদগ্ধ মহুয়াকে প্রথম দেখেছেন তাঁর স্বামী তিলক চক্রবর্তী। সে কারণে গত ১৪ জুলাই সকালে ৪৭/১/এ এস এন রায় রোডে মহুয়ার ফ্ল্যাটে তিলকবাবুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সে ফ্ল্যাটে সপুত্র মহুয়া এবং তিলক ছাড়াও থাকেন মহুয়ার বাবা নীলাঞ্জন রায়চৌধুরী। সেখানে তিলকবাবুর সঙ্গে দেখা করতে না পেরে নীলাঞ্জনবাবুকে জিজ্ঞাসা করি, তাঁর মেয়ের শরীরে কীভাবে আগুন লাগে?
নীলাঞ্জনবাবুর দু হাতের আঙু-লেই বার্নলের প্রলেপ ভেদ করে পোড়াজনিত ফোস্কা উঁকি মারছে। নীলাঞ্জনবাবু বলেন, 'আমার মেয়ে, জামাই, ওর মেক-আপম্যান, হেয়ার ড্রেসার এখানে বসে রাত্রি দশটা অবধি ভিডিও দেখেছে। ভিডিও দেখে মাংস-রুটি খেয়েছে, খেয়ে মেক-আপম্যান ও হেয়ার ড্রেসার চলে গেছে। এরমধ্যে একটা ছবির পরিচালকও এসেছিলেন।
ওর নাচের রিহার্সালের ব্যাপারে কথা বলতে। তারপর সবাই চলে গেলে ওরা (মহুয়া এবং তিলক) ওপরে অঞ্জনএর (চৌধুরী) ফ্ল্যাটে গেছে। গল্পসল্প করে তারা সাড়ে এগারোটার সময় এসেছে। নিজেরা হাসতে হাসতে ঢুকেছে, আমি সব শুনেছি। তিলক আমার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ওকে বলল, 'আমি খাব না, শুয়ে পড়ছি। তুমি তাড়াতাড়ি করে শুয়ে পড়।' এখন মেয়েদের তো জানেন, টুকটাক কাজ থাকে। ও সব কাজ করছে। আমি শুয়ে শুয়ে সব টের পাচ্ছি। এই করতে করতে আমার চোখটা ঘুমে জুড়ে এসেছিল। বোধহয় মিনিট পনের হবে। তিলকেরও বোধহয় চোখটা একটু লেগে এসেছিল। কিন্তু ওর (তিলকের) গায়ে আগুনের তাপ লাগামাত্রই ও জেগে উঠে চিৎকার করে উঠেছে, 'মেসো মশাই শিখনগিরি আসেন, সর্বনাশ হয়ে গেছে।' আগুন ধরার সঙ্গে সঙ্গে টুটুন (মহুয়ার ডাক নাম) দৌড়ে গিয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে। আমি গিয়ে প্রথমে তো হতভম্ভ। হাত দিয়ে আগুন নেভাতে গেছি। কিন্তু ছ্যাঁকা লাগতেই আমার সেন্স ফিরে এসেছে। আমি মনে মনে ভাবছি, এ আমি কী করছি। এইভাবে তো আগুন নেভানো যায় না। তখনই বিছানার হেডকভারের নিচে লেপ পাতা ছিল, আমি সরে গিয়ে তাড়াতাড়ি করে লেপটা দিয়ে ওকে জাপটে ধরেছিলাম।'
কিন্তু আগুন কীভাবে লেগেছিল? নীলাঞ্জনবাবু একটু ভেবে নিয়ে বললেন, 'আমার যতদূর সম্ভব মনে হয়, আমি যখন পরে রান্নাঘরে গেছি, গিয়ে দেখছি স্টোভের নিচেটা কাত হয়ে গেছে। আর স্টোভের ওপরের যে জিনিসগুলো, সব নিচে পড়ে আছে। আর এই স্টোভটাতে রান্না করতে গেলে মাঝে মাঝেই বার্স্ট করার মত ভুপ করে আগুন জ্বলে পলতে ধরনের জায়গাটা ওপরের দিকে উঠে যায়। আমাদের কাজের মেয়েটা দু-তিন দিন আমাকে বলেছে, 'দাদু, স্টোভটা বড় গোলমাল করে, রান্না করতে করতে হঠাৎ হঠাৎ দপ করে ওপরে উঠে যায়।' এই স্টোভেই মহুয়া একটা সসপ্যানে তরকারি গরম করতে গিয়েছিল। সসপ্যানটারও একটা গোলমাল আছে। হাতলটা হেভি তো, সসপ্যানটা ঠিকমত না রাখলে কাৎ হয়ে যায়। আমার মনে হয় সেদিন সসপ্যানটা কাৎ হয়ে গোঁফল এবং তখন সরাতে গিয়ে এই কাণ্ড ঘটেছে। আমার মনে হয়, যেটাতে স্টোভের পলতে থাকে, সেটা উল্টে গিয়ে, আগুন সুদ্ধ পলতে ওর গায়ে পড়ে এই কাণ্ড ঘটেছে।'
যদিও স্টুডিওপাড়ার বেশ কিছু ব্যক্তি, বিভিন্ন সংবাদপত্র এবং এস এন রায় রোডের বাসিন্দা কয়েকজন যুবকের অভিমত মহুয়া আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু স্বয়ং মহুয়াই যেখানে বলেছেন, স্টোভ থেকেই তাঁর গায়ে আগুন লেগেছিল, সেখানে এই বিষয়ে আর কোন প্রশ্ন না তোলাই স্বাভাবিক। মহুয়ার দিদি শান্তা দেবীও আত্মহত্যার চেষ্টা কথা উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, 'সব মোস্ট ফালতু কথা।' আর বাবা নীলাঞ্জন রায়চৌধুরী বলেছেন, 'আমার মেয়ে ও তিলক যে সুন্দরভাবে জীবনযাপন করছে, সেই সুন্দর দুটো জীবনকে নষ্ট করার জন্য কিছু লোক এটা করছে এবং আমার যতদূর ধারণা কিছু লোক পুলিশকে এটার জন্য খোঁচাচ্ছে।' মহুয়ার দিদি ও বাবা মহুয়ার মতোই বলেছেন, এটা একটা দুর্ঘটনা ছাড়া আর কিছুই নয়।
মহুয়ার পাড়া-প্রতিবেশী বেশ কয়েকজন মহুয়ার স্বামী তিলক সম্পর্কে কিছু বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন, কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রের একজন প্রবীণ অভিনেতা কথা প্রসঙ্গে বলেন, 'এটা একদম বাজে কথা। তিলকের মত ভাল ছেলে হয় না।' মহুয়ার দিদি শান্তা দেবীও বলেন, 'দুটো বাসোন এক জায়গায় থাকলেও তো ঠুং-ঠাং করে। কিন্তু টুটুনদের তো অলস সংসার ছিল না। ও তো ভালভাবেই সংসার করছিল। ওরা কোন কারণেই অসুখী ছিল না।'
তিলকবাবুর সঙ্গে মহুয়ার সম্পর্ক কেমন ছিল জানতে হাজির হয়েছিলাম, মহুয়ার ফ্ল্যাটেরই দোতলায় ডান দিকের ফ্ল্যাটে। এখানে থাকেন চলচ্চিত্র পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার অঞ্জন চৌধুরী। অঞ্জনবাবুর বাড়ি থেকে ঘুরে আসার পরই মহুয়া অগ্নিদগ্ধ হন। অঞ্জনবাবু বললেন, 'না, আমি অন্তত বেশ কয়েক মাস এখানে বাস করছি। কোনদিন মারামারির ব্যাপার হয়েছে বলে শুনিনি বা জানি না। তবে খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে ঝগড়া তো সব স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই হয়। কেউ যদি বলেন, না আমার স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া হয় না, সেটা মিথ্যা কথা বলা হয়। কারণ রাগ থেকেই তো অনুরাগ আসে। তাই খুঁটিনাটি ঝগড়া থেকেও এতদূর টেনে নিয়ে যাবে বলে মনে হয় না। এটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট। আর তাছাড়া মহুয়ার বাবা যেখানে রয়েছেন,
রাতে ও যখন আমার বাড়িতে এসেছিল, তখন কিন্তু ও ভীষণ গো মুডে ছিল। আমার একটা ছবিতে ও চুক্তিবদ্ধ হবার পর, তিলকই বলেছিল, দাদা, কালকে একটা খাওয়া-দাওয়া করা যাক। কারণ ওই রোলটা প্রথমে ঠিক ছিল বম্বের এক নায়িকাকে দিয়ে করানো হবে। আমিই প্রোডিউসারকে সাজেস্ট করেছিলাম ওটা মহুয়াকে দিয়ে করানোর জন্য। তিলক আমাকে বলেছিল, 'অঞ্জনদা, রোলটা মারাত্মক ভাল। যদি রোলটা মৌ পায়, তাহলে আমি খরচ করব, খাওয়াব।' তা সেইজন্য তিলক পরদিন খাওয়া-দাওয়ার কথা বলেছিল। মহুয়া বলল, গৌতম (আমার ভাই) মাংস আনবে, আমার স্ত্রী রাঁধবে। এই নিয়ে ও একটা প্রচণ্ড মেজাজে ছিল। ওকে আমি অনেকদিন পর এত মেজাজে দেখেছিলাম।'
মহুয়া হাসপাতালে ভর্তি হবার পরদিন, অর্থাৎ শুক্রবার বেলা ১২টা নাগাদ সমিত ভঞ্জের সঙ্গে মহুয়ার মেক-আপ ম্যান ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি অরূপ (বুড়ো) গাঙ্গুলি হাসপাতালে যান। অরূপ বলেন, 'আগের দিন রাত দশটা অবধি আমরা মৌ-র সঙ্গে কাটিয়েছি। সন্ধেবেলা ভিডিও দেখেছি। তারপর ১০টা নাগাদ আমি ও অসীমান্ত উঠে পড়ি। তার আগে দুটি মাংস খেয়েছি ওর বাড়িতে। তাই বুড়ুদা (সমিত) যখন আমাকে খবরটা দিল, তখন বিশ্বাসই পারিনি। তারপর বুড়ুদার সঙ্গে হাসপাতালে এলাম। আমরা ঢুকতেই মৌ বুড়ুদাকে বলল, মনখারাপ করিস না। ভালভাবে পার্ট করিস। বুড়ুদা বলল, বুড়ো এসেছে, মৌ বলল—ওকে ডাক। আমি ঢুকতেই, মৌ ওর দুটো হাত তুলে বলল, দ্যাখ, দেখেছিস, পারবি তো মেক-আপ করতে? আমাকে তো অনেক মেক-আপ করেছিস।
মহুয়ার পুলিশকে বিবৃতি দানের পরও অনেকে আত্মহত্যার চেষ্টা কে এখনও উড়িয়ে দিচ্ছেন না। কিন্তু একটু সুস্থ হতে না হতেই মহুয়া তো তাঁর ভাইকে বলেন, 'ভাইয়া, আমাকে তোরা তাড়াতাড়ি বাড়ি নিয়ে চল। আমাকে ভাল হয়ে উঠতেই হবে। প্রোডিউসারদের না জানি কত ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।'
একদিকে এরকম কাজের প্রতি সিনসিয়ারিটি, অন্যদিকে স্বামী তিলক এবং ছেলে তমাল বা গোলার জন্য হাসপাতালের ৫২২ নং ঘরে শুয়ে শরীরের অসহ্য জ্বলুনি নিয়েও চিন্তার শেষ নেই, সেই মহুয়া কখন হত্যাকারীর মত আত্মহননের পথ কি বেছে নিতে পারেন? এই প্রসঙ্গে এক-জন প্রবীণ অভিনেতার মন্তব্য, 'দেখ, মানুষের জীবনে স্যাচুরেশন পয়েন্টে পৌঁছে অনেক কিছুই মনে হতে পারে বা সে করে ফেলে। তার মানে এই নয় যে মহুয়া রায়চৌধুরী হুট করে কিছু করে ফেলেছে।' আবার একজন টেকনিসিয়ান বলেন, 'হয়ত নিজের সন্তানের মারা যা কর্তব্য নিষ্ঠার থেকেও বড় কোন ব্যাপারে মহুয়াকে এত বেশি যন্ত্রণা দিয়েছে যে... '
কিন্তু এক নবীন চলচ্চিত্র পরিচালক বলেন, 'মৌ-র মত সিনসিয়ার, কো-অপারেটিভ আর্টিস্ট খুব কমই পাওয়া যায়। মৌ অসুস্থ অবস্থাতেও আমার ছবিতে কাজ করতে এসেছে। গায়ে হাত দিয়ে দেখেছি গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। বলেছি, মৌ তুই এই অবস্থায় এসেছিস কেন, চলে যা। উত্তর কি বলেছে জানেন, আমি মরে যাই যাব, কিন্তু প্রোডিউসারদের মরতে দেব না। বলুন, এমন ডেডিকেটেড আর্টিস্ট হুট করে আত্মহত্যার মত কাজ কি করতে পারে?'
বাংলা চলচ্চিত্রানুরাগীদের কাছে শুধু মৃত্যুরই খবর নিয়ে আসে। শোকস্তব্ধ জনতার ভিড়ে দাঁড়িয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের জনৈক অভিনেতা অস্ফুটে বললেন, 'এমন জুলাই যেন আর না আসে।'
জুলাই মানে শ্রাবণের ধারা। ক্যালকাটা মেডিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট চত্বরে দাঁড়িয়ে শোকাক্লান্ত সকলেই যেন কাঁদছেন। স্তব্ধ সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় হঠাৎ বলে উঠলেন, 'এতো আমি নিজের লোককেই হারালাম।' তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন তরুণকুমার ও শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়। তাঁর শোকের সঙ্গী ছিলেন রত্না ঘোষাল, চিন্ময় রায়, সমিত ভঞ্জ, সন্তু মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।
মহুয়া চলে গেলেন। তাঁর বিদায় বাংলা ছবির অনেক প্রযোজককে হতাশায় আচ্ছন্ন করবে। কিন্তু এক বিপুল প্রাণোচ্ছলতা নিয়ে যিনি জীবন কাটিয়ে গেলেন সেই স্বল্প জীবনের মধ্যে দাঁড়িয়ে, প্রযোজকদের জন্য তিনি আমৃত্যু অভিনয় করেছেন। নিজের সত্তা মিশিয়ে ফেলেছেন নানান চরিত্রের সঙ্গে এবং মনে হয় আজ মৃত্যুর পরে 'আদালত ও ইনসাফ'-এর সেই নারী চরিত্রের মত তিনিও আল্লার কাছে চলচ্চিত্রের জন্য 'দোওয়া' মাঙবেন।
উৎস: একটি ম্যাগাজিন থেকে (পরিবর্তন )