বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন মহুয়া রায়চৌধুরী। তাঁর অভিনয়, প্রাণবন্ত হাসি, সৌন্দর্য এবং সহজ-সরল ব্যবহার আজও অসংখ্য মানুষের স্মৃতিতে অমলিন। তাঁর অকালপ্রয়াণ বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করেছিল। তাঁকে কাছ থেকে দেখা, তাঁর সঙ্গে কথা বলা কিংবা পারিবারিকভাবে তাঁকে জানার সৌভাগ্য যাঁদের হয়েছিল, তাঁদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে এক অন্য মহুয়া—অত্যন্ত সাধারণ, আন্তরিক, মিশুকে এবং মাটির কাছাকাছি একজন মানুষ।এখানে মহুয়ার কয়েকজন ভক্তের বক্তব্য তুলে ধরা হলো। উল্লিখিত বক্তব্যগুলির সত্যতা যাচাই করা হয়নি। তাই এগুলি সত্য নাকি মিথ্যা, সে বিষয়ে আমরা কোনো দাবি করছি না।
### টিনা সিংহা: মহুয়া ম্যাম ছিলেন আমার তবলার স্যারের কাকিমা। তবলার স্যারের বাবা ছিলেন বড় ভাই, আর তিলক চক্রবর্তী ছিলেন ছোট ভাই।
একদিন আমি তবলার স্যারের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেখানে মহুয়া ম্যামের অনেক ছবি দেখেছিলাম এবং তবলার স্যারের মায়ের কাছ থেকে মহুয়া ম্যাম সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছিলাম। এমনকি মৃত্যুর আগে যখন তিনি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, তখনও তাঁর সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছিলাম।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঠিক আগে মহুয়া ম্যাম বারবার আমার তবলার স্যারের মাকে—অর্থাৎ তাঁর জাকে—বলেছিলেন, “আমার গলা দেখো দিদি।”
আরও অনেক গল্প শুনেছিলাম। কিন্তু আজ আর লিখতে ইচ্ছে করছে না। মনটা খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
### তাপসী দাসগুপ্ত: আমি ছোটবেলা থেকেই তাঁকে খুব কাছ থেকে চিনি। তাঁর ডাকনাম ছিল টুটুন। মৃত্যুর সময় আমরা কয়েকজন তাঁর শেষযাত্রায় উপস্থিত ছিলাম।
### : মহুয়া আমার মায়ের আত্মীয় ছিলেন। মানুষ হিসেবে তিনি খুব ভালো ছিলেন। তবে তাঁর স্বামী ছিলেন অত্যন্ত নিয়ন্ত্রণকারী স্বভাবের। সম্ভবত তাঁর মৃত্যুর পেছনে তাঁর হাত ছিল।
### ঝর্ণা চক্রবর্তী: মহুয়া ছিলেন আমার প্রিয় নায়িকা। কত সিনেমা দেখেছি তাঁর! তখন আমি স্কুলে পড়তাম। শুনেছিলাম, মহুয়া ইমামবাড়ায় শুটিং করতে আসছেন। কী ভিড় হয়েছিল! সেখানেই চিন্ময় রায়কে খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম।
তখন ব্রাঞ্চ স্কুলের মাঠটি খোলা ছিল। সেখানেও শুটিং হয়েছিল। মহুয়াকে কী সুন্দর দেখতে লাগত!
এভাবে তাঁর চলে যাওয়া আজও মেনে নেওয়া যায় না। শিল্পী এভাবেই বেঁচে থাকুন আমাদের মধ্যে—তাঁর প্রাণবন্ত, মুক্তঝরা হাসি এবং অসাধারণ অভিনয়ের মাধ্যমে।
আজও তাঁর অভিনীত ছবি দেখে আমরা আনন্দ পাই, তাঁকে মনে করি।
### রৌনক ঘোষ: মহুয়া আমার মায়ের আত্মীয় ছিলেন। মায়ের মুখে শুনেছি, তিনি সত্যিই খুব ভালো মানুষ ছিলেন। একজন নামকরা অভিনেত্রী হয়েও তাঁর মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না। আমার মামার বাড়িতে এলে তিনি সবার মতোই রান্নাঘরে ঢুকে কাজ করতে যেতেন।আমার মা তখন বেশ ছোট ছিলেন। সম্পর্কে মহুয়া তাঁর দিদি হতেন।
### আঞ্জু দাস (Anju Das): আমরা তখন নিউ আলিপুর কলেজে পড়ি। সেদিন ছিল শনিবার। মহুয়া বেবি-পিঙ্ক রঙের শাড়ি পরে একটি দোকান থেকে কী যেন কিনছিলেন। সবার আগে আমিই তাঁকে দেখতে পাই এবং বন্ধুদের নিয়ে তাঁর কাছে যাই। কোনো সাজসজ্জা ছিল না। শুধু বাঁ হাতে একটি সোনার নোয়া। কিন্তু কী সুন্দরই না লাগছিল তাঁকে!
আমাদের সঙ্গে প্রায় আধঘণ্টা গল্প করেছিলেন। সেদিন টেলিভিশনে ‘লালগোলাপ’ সিনেমাটি দেখানো হবে—সেটাও তাঁকে বলেছিলাম। তখন তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমার সিনেমা কি ভালো লাগে?”
আমি বলেছিলাম, “হ্যাঁ, রঞ্জিতদাকেও ভালো লাগে।”
কত গল্প করলেন আমাদের সঙ্গে! তারপর বললেন, “আসি ভাই,” এবং চলে গেলেন। কোনো অহংকার নেই, কোনো বিরক্তি নেই—কী সহজেই না আমাদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন! এত মিশুকে, এত সহজ-সরল মানুষটি কয়েক দিনের মধ্যেই চলে গেলেন।
তাঁকে খারাপ কারা বলে? তারাই কি ভালো? একজন মৃত মানুষকে নিয়ে যারা কাটাছেঁড়া করেন, তাঁর চরিত্র নিয়ে আঙুল তোলেন, তাঁরা কখনোই প্রকৃত অর্থে মানুষ হতে পারেন না।
### নাসিফা রহিম: মহুয়া ছিলেন আমার ভীষণ প্রিয়—আমার ভালোবাসার নায়িকা। আমি তখন একাদশ শ্রেণিতে পড়তাম। একদিন বান্ধবীর সঙ্গে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে নিউ মার্কেটে গিয়েছিলাম। মার্কেটের মধ্যে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দেখি মহুয়া রায়চৌধুরীকে। কিন্তু তাঁকে এতটাই সাধারণ দেখতে লাগছিল যে সন্দেহ হচ্ছিল—সত্যিই কি উনি মহুয়া? পরনে ছিল লালপাড় সাদা সুতির শাড়ি। পিঠে বেণী ঝুলছে। কোনো মেকআপ নেই। তবুও তিনি তো মহুয়া—মহুয়াই!
আমি এখনও তাঁকে ভীষণ ভালোবাসি। যেমন সাধারণ, পাশের বাড়ির মেয়ের মতো সাজে ছিলেন, তাঁর ব্যবহারও ছিল ঠিক তেমনই সহজ-সরল।
আমি সাহস করে কাছে গিয়ে বললাম, “আপনি কি মহুয়া?” তিনি মিষ্টি হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, কেন?” আমি বললাম, “এত সাধারণভাবে আছেন, তাই ভাবছি সত্যিই কি না।” তিনি আবার হাসলেন। আমি বললাম, “আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে। আপনি কি কিনতে এসেছেন?” তিনি বললেন, “কস্টিউম জুয়েলারি।” তারপর হেসে বিদায় নিলেন।
কী সহজ-সরল ব্যবহার! ভাবলে এখনও মন ভরে যায়। ঘटनাটি ১৯৭৮ সালের। তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। আমরা একজন অসাধারণ উজ্জ্বল নক্ষত্রকে হারিয়েছিলাম।
### রাজেশ রায়: কিছুদিন মহুয়া দমদমের গোলপার্কে থাকতেন। তখনই তাঁর ছেলে গোলার সঙ্গে আমার ক্ষণিকের আলাপ হয়েছিল। এত বছর পর হয়তো তাঁর মনে নেই। আমি এবং গোলা তখন দুজনেই বেশ ছোট। মহুয়া শুধু শিল্পী ছিলেন না—তিনি ছিলেন অসাধারণ মিষ্টি মনের একজন মানুষ।
### সুচিত্রা গাঙ্গুলী: টুটুনদির দিদি শান্তার শ্বশুরবাড়ি আমাদের পাড়ায় ছিল। দুই বোন দেখতে এবং স্বভাবে একেবারে বিপরীত ছিলেন। কিন্তু দুজনেই দেখতে খুব সুন্দর ছিলেন। একজন যেন দুর্গা, আর অন্যজন কালী।
টুটুনদির শান্ত, চুপচাপ মুখটা খুব মনে পড়ে। আমাদের বাড়িতে কয়েকবার এসেছিলেন।
### তাপসী দাসগুপ্ত: আমরা টুটুনদিকে ডাকনামেই ডাকতাম। তিনি আমার মা-বাবাকে দিদি ও জামাইবাবু বলে ডাকতেন। আমরা পাশাপাশি থাকতাম। প্রথম সিনেমার শুটিং চলাকালীন একদিন হঠাৎ তিনি আমাদের ঘরে এসে লুকিয়ে ছিলেন—কারণ তিনি শুটিংয়ে যেতে চাইছিলেন না। তাঁকে নিয়ে কত কথাই যে মনে পড়ে! তাঁর মা টেলিফোন ভবনে চাকরি করতেন।
মহুয়া রায়চৌধুরী আজ আমাদের মধ্যে শারীরিকভাবে নেই। কিন্তু তাঁর অভিনয়, তাঁর হাসি, তাঁর সৌন্দর্য এবং সবচেয়ে বড় কথা—তাঁর সহজ-সরল মানবিক ব্যবহার তাঁকে আজও মানুষের হৃদয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে।
কেউ তাঁকে দেখেছেন পর্দায়, কেউ কাছ থেকে; কেউ তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন, কেউ তাঁর পরিবারের সূত্রে তাঁকে চিনেছেন। কিন্তু স্মৃতিগুলির মধ্যে একটি বিষয় বারবার ফিরে আসে—মহুয়া শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন প্রাণবন্ত, আন্তরিক এবং অসাধারণ মনের মানুষ।
আমার মায়ের স্মৃতির পাতা থেকে — মহুয়া স্মৃতিকথা মৌমিতা রায় চৌধুরী: আমার মা তখন কিশোরী বধূ। ১৯৮০ সালেই আমার মা-বাবার বিয়ে হয়েছিল। মা তখন সদ্য অষ্টাদশী। মহুয়া রায়চৌধুরীর অভিনয় আর পাঁচজন বাঙালির মতোই মায়েরও অত্যন্ত প্রিয় ছিল।
বরানগরের জেলেপাড়ায় ১৯৮০/৮১ সালে, সম্ভবত কালীপুজোর মুখে, একটি জলসার আয়োজন করা হয়েছিল। তখন তো পাড়ায় পাড়ায় এমন জলসা হতো। সারারাত ধরে বাঙালিরা সপরিবারে জলসা উপভোগ করতেন। সবাই হয়তো সারারাত জেগে থাকতে পারতেন না, কিন্তু কিছুটা সময় হলেও জলসা দেখতেন। বিশেষ করে প্রিয় শিল্পী থাকলে তো কথাই নেই!
মা ও সেবার জলসা দেখতে গিয়েছিলেন। মহুয়া আসবেন—এই খবরেই অষ্টাদশী বধূটির মনে আনন্দের ঢেউ উঠেছিল। একেবারে সামনের সারিতে বসেই মা সেই সুন্দর, স্বর্ণালী সন্ধ্যার জলসা উপভোগ করেছিলেন। ভূপেন হাজারিকার গান মা মুগ্ধ হয়ে শুনেছিলেন। তিনিও সেদিনের জলসার অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন। এছাড়াও আরও অনেক নামী-দামী শিল্পী উপস্থিত ছিলেন। অবশেষে উপস্থিত সকল দর্শকের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মঞ্চ আলো করে উপস্থিত হলেন মহুয়া রায়চৌধুরী।
তাঁর আলোকিত উপস্থিতিতে সেদিন যেন উদ্বেল হয়ে উঠেছিল গোটা পরিবেশ। মায়ের কাছ থেকেই শুনেছি—কী মিষ্টি তাঁর হাসি! অপরূপ সুন্দর দেখতে লাগছিল তাঁকে। পরনে ছিল সাদা-কালো প্রিন্টের সিল্কের শাড়ি। অসামান্য সুন্দর লাগছিল তাঁকে। দুই কানে ছিল সোনার চেইন লাগানো দুল, যার নিচের দিকে মুক্তো ঝুলছিল। নাকে হীরের নাকছাবিতে উঠছিল আলোর ঝিলিক।
তিনি সকলকে সুমিষ্ট কণ্ঠে বলেছিলেন— “আপনারা সকলে ভালো আছেন তো? সবাই খুব ভালো থাকবেন…” অপরূপা মহুয়াকে সেদিন এতটাই নয়নমনোহর লাগছিল যে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। মঞ্চে তিনি তাঁর অভিনীত কয়েকটি ছবির সংলাপ বলেছিলেন। দর্শকদের অনুরোধে তাঁর ছবির কয়েকটি গান থেকে দু-কলিও গেয়েছিলেন। সেদিন উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধতা আবারও প্রমাণ করে দিয়েছিল—তিনি সকলের নয়নের মণি, প্রিয় নায়িকা এবং অত্যন্ত পছন্দের অভিনেত্রী।মায়ের মতোই সেদিন উপস্থিত সকলেই তাঁকে এত কাছ থেকে দেখতে পেয়ে ভীষণ আনন্দিত হয়েছিলেন।
পরবর্তীকালে আমার বাবা, শ্রী নারায়ণ রায়, এই শহরের একজন নামকরা অর্গানাইজার হয়ে ওঠেন। সেই সূত্রে মুম্বই ও কলকাতার এমন কোনো বড় শিল্পী নেই, যাঁদের মা কাছ থেকে দেখেননি। শুধু তাই নয়, বহু শিল্পীর সঙ্গেই তাঁর বেশ ঘনিষ্ঠ আলাপও হয়েছিল। পরবর্তীতে বাবা চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হন এবং অভিনয়ও করেন। টলিউডের বহু নায়ক, নায়িকা ও শিল্পীর সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সম্পর্কও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এত কিছুর পরেও নববধূ মায়ের চোখে আজও সেই দিনের জলসায় দেখা সপ্রতিভ, অসামান্য রূপসী নায়িকা মহুয়া মন জুড়ে রয়েছেন। এত সহজ, হাসিখুশি একজন মানুষ—সত্যিই যেন সুবাসিত মহুয়া ফুল তিনি। তাঁর মিষ্টি সুবাসে আজও যেন আকাশ-বাতাস সুরভিত।
মা বললেন— “বড় ভালোবাসতাম তাঁর অভিনয় দেখতে। ভগবানের প্রিয় ছিলেন বলেই হয়তো এত তাড়াতাড়ি কাছে টেনে নিলেন তাঁকে। যেখানেই থাকুন, পরম শান্তিতে থাকুন—এটাই শুধু চাইব।” মায়ের সেই স্মৃতির কথাগুলো শুনতে শুনতে মনে হয়, মহুয়া রায়চৌধুরী শুধু পর্দার একজন জনপ্রিয় নায়িকা ছিলেন না—তিনি ছিলেন মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব।
আজও তাঁর হাসি, তাঁর সৌন্দর্য, তাঁর অভিনয় এবং তাঁর সহজ-সরল উপস্থিতির স্মৃতি মানুষের মনে জীবন্ত। সময় চলে গেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু মহুয়ার সেই মিষ্টি সুবাস আজও বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে অমলিন।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন