মহুয়া রায়চৌধুরীকে নিয়ে তাপস পালের শেষ বক্তব্য

নিজের মৃত্যুর 2 বছর আগে, তাপস পাল হঠাৎ একটি সংবাদপত্রের সাথে যোগাযোগ করেন এবং তার প্রিয় অভিনেত্রী মহুয়া রায়চৌধুরী সম্পর্কে কিছু বলতে চান। তার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে দুজনেই একে অপরের সাথে আবেগগতভাবে সংযুক্ত ছিলেন।


মহুয়া আর তাপস দুজনেই আর নেই। তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং তা ভেঙে গেছে কিনা তা অনুসন্ধান করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তারা একে অপরকে পছন্দ করেছিল যা যেকোনো কাজের ক্ষেত্রে খুবই স্বাভাবিক।
মহুয়ার মৃত্যুর এত বছর পর এবং তার নিজের মৃত্যুর ঠিক 2 বছর আগে তাপস পাল অনুভব করলেন যে তাঁর সেরা অভিনেত্রীর প্রতি তাঁর অনুভূতি স্বীকার করতেই হবে।

মহুয়ার মৃত্যুর অনেক পরে তাপস পালের বক্তব্য

উফ! ওই দিনটা আমি কিছুতেই মনে করতে চাই না। আমার কাছে ওটা একটা অভিশপ্ত দিন। কত রাত যে আমি ঘুমোতে পারিনি, হাউহাউ করে কেঁদেছি। মহুয়ার অ্যাক্সিডেন্টের খবর পেয়েই হাসপাতালে দৌড়ে গিয়েছিলাম। তখন আমি ভাল করে গাড়ি চালাতে পারতাম না। সেদিন কিছু না ভেবেই গাড়ি নিয়ে ছুটে গিয়েছিলাম। কীভাবে চালিয়েছিলাম, আজও জানি না। কাচের বাইরে থেকে মহুয়ার যে রূপ দেখেছিলাম, সেটা মনে পড়লেই আজও ঘুমের ভিতর শিউরে উঠি আর চোখের সামনে ভেসে ওঠে মহুয়াকে প্রথম দেখার দিনটা।


‘দাদার কীর্তি’ ছবির রিহার্সালের প্রথম দিন মহুয়াকে প্রথম দেখি তরুণ মজুমদারের বাড়িতে। তখন তো মহুয়া ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ করে বিখ্যাত হয়ে গেছে। আমিও দেখেছিলাম ওই ছবিটা। সেই অসম্ভব সুন্দরী মহিলা আজ আমার সামনে। সামনে থেকে দেখে আমি হাঁ করে তাকিয়েছিলাম ওর দিকে। তখনও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না মহুয়া আমার নায়িকা। একটু নার্ভাসও লাগছিল। আর কেন জানি না ওর সঙ্গে অনেক ছবি করার পরেও ওকে দেখলেই আমার কেমন নার্ভাস লাগত। কোনও কথা হওয়ার আগেই, তনুদা একটা স্ক্রিপ্ট দিলেন, আমরা ওই স্ক্রিপ্ট দেখে পড়তে শুরু করলাম। সেই শুরু হল মহুয়ার সঙ্গে পথচলা।

আমি যখন একা থাকি, তখন অনেক কথাই মনে পড়ে। ‘দাদার কীর্তি’ ছবির শেষের দিকের দৃশ্য। মহুয়া গাইছে, ‘চরণ ধরিতে দিও গো আমারে’। গানটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর মহুয়ার সেই কান্না, সেটা শুধু অভিনয় নয়। তরুণদার নির্দেশ ছিল চোখের জল যেন সকেটে থাকে বাইরে না আসে। শটটা শেষ হওয়ার পর মহুয়া ছুটে ঘরের মধ্যে গিয়ে হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করল। কিন্তু ক্যামেরার সামনে ও চোখ থেকে একফোঁটা জল ফেলেনি। আমি তো তখন নতুন। অবাক হয়ে ওকে কাঁদতে দেখছিলাম। ওর ওই কান্না আমি কোনওদিন ভুলব না। সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম, ও অভিনেত্রী হিসাবে কতটা পাওয়ারফুল আর সাবলীল। অভিনয় ওর রক্তে ছিল।

একদিন স্টুডিওয় বসে আছি। মহুয়ার গাড়ি ঢুকল। তার সঙ্গে অনেকগুলো কুকুর দৌড়ে এল। আর মহুয়া এদের বিস্কুট খাওয়াতে শুরু করল। সবাইকে খুব আপন করে নিতে পারত। 
কাজ করতে করতে আমরা একে অপরের প্রতি মানসিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলাম। আমি অন্য কোনও নায়িকার সঙ্গে কাজ করি এটা মহুয়া পছন্দ করত না। আমিও চাইতাম না ওর অন্য বন্ধু থাকুক। ওর দাবি ছিল যে ছবিতে ও থাকবে সেই ছবিতে আমি না বলতে পারব না।

মহুয়া মারা যাওয়ার পর অনেককে ওর ড্রিঙ্ক করা নিয়ে কথা বলতে শুনেছি। আমি শুধু একবারই দেখেছিলাম। তখন কালিম্পংয়ের ট্যুরিস্ট লজে শুটিং চলছে। হঠাৎ মহুয়া আমাকে জড়িয়ে চুমু খেল। ওই সময় আমি ওর মুখে মদের গন্ধ পেয়ে ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তুমি ড্রিঙ্ক করেছ কেন? ও একবার আমার দিকে তাকিয়ে আবার আমাকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু কোনও উত্তর দিল না। সেদিন রাতে ও আবার আমাকে ওর ঘরের দরজার কাছে জড়িয়ে ধরেছিল। আমি শুধু বলেছিলাম, মহুয়া তুমি অনেক ড্রিঙ্ক করেছ, ঘরে যাও। ওকে এই অবস্থায় দেখে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। অভিমানও হয়েছিল। কিন্তু আমি কখনও জিজ্ঞেস করিনি ও কেন এভাবে বদলে যাচ্ছে। আমি চেয়েছিলাম ও নিজে আমাকে বলুক। সেই সুযোগ আর হয়নি।

আমার সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝিও হয়েছে। কিন্তু সেটা ওই মিটিয়েছে। ‘পারাবত প্রিয়া’ শুটিংয়ের সময় বাসে করে একটা স্পটে যাচ্ছিলাম। মহুয়া বসেছিল সিটে ও কে ক্রস করার সময় আমার পিছন দিকটা ওর দিকে ছিল। হঠাৎ মহুয়া রেগে গিয়ে আমাকে যা-তা বলল। আমিও দু’কথা শুনিয়ে দিলাম। বেশ কিছুদিন আমাদের কথা বন্ধ ছিল। তারপর একদিন ওর একটা চিঠি পেলাম। তাতে লেখা ছিল, ‘প্রিয় তাপস, আমাদের আজ শুটিং শেষ। আমরা ফিরে যাচ্ছি। যা হয়েছে ভুলে যাও, ক্ষমা করে দিও, জীবনটা খুব ছোট, কিছু মনে রেখো না।’ চিঠিটা আমার কাছে এখনও আছে। এই তো সেদিনও চিঠিটা বের করে পড়েছিলাম।

আমার প্রথম ছবির নায়িকা মহুয়া আর ওর সঙ্গে আমার শেষ ছবি ‘আশীর্বাদ’। ওই ছবির একটা নাচের দৃশ্য ছিল, মহুয়াকে জড়িয়ে ধরে ঘুরছিলাম। তখনও বুঝিনি খুব তাড়াতাড়ি ও আমার কাছ থেকে অনেক দূরে চলে যাবে। লালকুটিতে আমাদের একটা শট ছিল। খুব সম্ভবত ‘অনুরাগের ছোঁয়া’-র। গাড়িতে আমার পাশে মহুয়া আর আমি গাড়ি চালাচ্ছি। আমি এত জোরে গাড়ি চালিয়েছিলাম যে চাকা স্কিড করে গিয়েছিল। হঠাৎ দেখি মহুয়া চিৎকার করছে “আমায় মেরে ফেলল, আমায় মেরে ফেলল।” মৃত্যুকে ও এতটাই ভয় পেত।

যেদিন দুর্ঘটনা ঘটে, তার আগের দিনও আমরা শুটিং করেছি। যার শেষ সংলাপ “আশিস, তাড়াতাড়ি এসো, আমি ভাল নেই।”

আর একটা গানের দৃশ্যের কথা মনে পড়ছে ‘অনুরাগের ছোঁয়া’-র। মহুয়া শুয়ে আছে আমি আস্তে আস্তে ওর কাছে এলাম। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে ‘আমি যে কে তোমার তুমি তা বুঝে নাও’। ওই সময় ওর মুখের যে এক্সপ্রেশন আমি কোনওদিন ভুলব না। ভুলব না পরের লাইনগুলো ‘ওপারের ডাক যদি আসে ... মরণ তোমায় কোনওদিন পারবে না কেড়ে নিতে।’আমি পারিনি। মরণ ওকে সত্যিই কেড়ে নিল। মহুয়া অসময়ে চলে যাওয়ায় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যে ধাক্কা পেয়েছিল তার থেকেও বিরাট ধাক্কা পেয়েছিল তাপস পাল।

তখন কালিম্পংয়ের ট্যুরিস্ট লজে শুটিং চলছে। হঠাৎ মহুয়া আমাকে জড়িয়ে চুমু খেল। ওই সময় আমি ওর মুখে মদের গন্ধ পেয়ে ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তুমি ড্রিঙ্ক করেছ কেন? ও একবার আমার দিকে তাকিয়ে আবার আমাকে জড়িয়ে ধরল। কোনও উত্তর দিল না


উৎস: সংবাদ প্রতিদিন




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মহুয়া, বিয়ের পরে

 এখন মহুয়া চক্রবর্তী। শান্তশিষ্ট। বিয়ে করেছে ছ’মাস আগে। ওর বরের নাম তিলক চক্রবর্তী। স্টুডিওতেও এসেও সে টেলিফোনে অন্তত একবার কথা বলে নেয়। আ...