মহুয়া রায়চৌধুরীকে নিয়ে তাপস পালের শেষ বক্তব্য
মহুয়া রায়চৌধুরী: স্মৃতির পাতায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র
বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন মহুয়া রায়চৌধুরী। তাঁর অভিনয়, প্রাণবন্ত হাসি, সৌন্দর্য এবং সহজ-সরল ব্যবহার আজও অসংখ্য মানুষের স্মৃতিতে অমলিন। তাঁর অকালপ্রয়াণ বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করেছিল। তাঁকে কাছ থেকে দেখা, তাঁর সঙ্গে কথা বলা কিংবা পারিবারিকভাবে তাঁকে জানার সৌভাগ্য যাঁদের হয়েছিল, তাঁদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে এক অন্য মহুয়া—অত্যন্ত সাধারণ, আন্তরিক, মিশুকে এবং মাটির কাছাকাছি একজন মানুষ।এখানে মহুয়ার কয়েকজন ভক্তের বক্তব্য তুলে ধরা হলো। উল্লিখিত বক্তব্যগুলির সত্যতা যাচাই করা হয়নি। তাই এগুলি সত্য নাকি মিথ্যা, সে বিষয়ে আমরা কোনো দাবি করছি না।
### টিনা সিংহা: মহুয়া ম্যাম ছিলেন আমার তবলার স্যারের কাকিমা। তবলার স্যারের বাবা ছিলেন বড় ভাই, আর তিলক চক্রবর্তী ছিলেন ছোট ভাই।
একদিন আমি তবলার স্যারের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেখানে মহুয়া ম্যামের অনেক ছবি দেখেছিলাম এবং তবলার স্যারের মায়ের কাছ থেকে মহুয়া ম্যাম সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছিলাম। এমনকি মৃত্যুর আগে যখন তিনি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, তখনও তাঁর সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছিলাম।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঠিক আগে মহুয়া ম্যাম বারবার আমার তবলার স্যারের মাকে—অর্থাৎ তাঁর জাকে—বলেছিলেন, “আমার গলা দেখো দিদি।”
আরও অনেক গল্প শুনেছিলাম। কিন্তু আজ আর লিখতে ইচ্ছে করছে না। মনটা খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
### তাপসী দাসগুপ্ত: আমি ছোটবেলা থেকেই তাঁকে খুব কাছ থেকে চিনি। তাঁর ডাকনাম ছিল টুটুন। মৃত্যুর সময় আমরা কয়েকজন তাঁর শেষযাত্রায় উপস্থিত ছিলাম।
### : মহুয়া আমার মায়ের আত্মীয় ছিলেন। মানুষ হিসেবে তিনি খুব ভালো ছিলেন। তবে তাঁর স্বামী ছিলেন অত্যন্ত নিয়ন্ত্রণকারী স্বভাবের। সম্ভবত তাঁর মৃত্যুর পেছনে তাঁর হাত ছিল।
### ঝর্ণা চক্রবর্তী: মহুয়া ছিলেন আমার প্রিয় নায়িকা। কত সিনেমা দেখেছি তাঁর! তখন আমি স্কুলে পড়তাম। শুনেছিলাম, মহুয়া ইমামবাড়ায় শুটিং করতে আসছেন। কী ভিড় হয়েছিল! সেখানেই চিন্ময় রায়কে খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম।
তখন ব্রাঞ্চ স্কুলের মাঠটি খোলা ছিল। সেখানেও শুটিং হয়েছিল। মহুয়াকে কী সুন্দর দেখতে লাগত!
এভাবে তাঁর চলে যাওয়া আজও মেনে নেওয়া যায় না। শিল্পী এভাবেই বেঁচে থাকুন আমাদের মধ্যে—তাঁর প্রাণবন্ত, মুক্তঝরা হাসি এবং অসাধারণ অভিনয়ের মাধ্যমে।
আজও তাঁর অভিনীত ছবি দেখে আমরা আনন্দ পাই, তাঁকে মনে করি।
### রৌনক ঘোষ: মহুয়া আমার মায়ের আত্মীয় ছিলেন। মায়ের মুখে শুনেছি, তিনি সত্যিই খুব ভালো মানুষ ছিলেন। একজন নামকরা অভিনেত্রী হয়েও তাঁর মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না। আমার মামার বাড়িতে এলে তিনি সবার মতোই রান্নাঘরে ঢুকে কাজ করতে যেতেন।আমার মা তখন বেশ ছোট ছিলেন। সম্পর্কে মহুয়া তাঁর দিদি হতেন।
### আঞ্জু দাস (Anju Das): আমরা তখন নিউ আলিপুর কলেজে পড়ি। সেদিন ছিল শনিবার। মহুয়া বেবি-পিঙ্ক রঙের শাড়ি পরে একটি দোকান থেকে কী যেন কিনছিলেন। সবার আগে আমিই তাঁকে দেখতে পাই এবং বন্ধুদের নিয়ে তাঁর কাছে যাই। কোনো সাজসজ্জা ছিল না। শুধু বাঁ হাতে একটি সোনার নোয়া। কিন্তু কী সুন্দরই না লাগছিল তাঁকে!
আমাদের সঙ্গে প্রায় আধঘণ্টা গল্প করেছিলেন। সেদিন টেলিভিশনে ‘লালগোলাপ’ সিনেমাটি দেখানো হবে—সেটাও তাঁকে বলেছিলাম। তখন তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমার সিনেমা কি ভালো লাগে?”
আমি বলেছিলাম, “হ্যাঁ, রঞ্জিতদাকেও ভালো লাগে।”
কত গল্প করলেন আমাদের সঙ্গে! তারপর বললেন, “আসি ভাই,” এবং চলে গেলেন। কোনো অহংকার নেই, কোনো বিরক্তি নেই—কী সহজেই না আমাদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন! এত মিশুকে, এত সহজ-সরল মানুষটি কয়েক দিনের মধ্যেই চলে গেলেন।
তাঁকে খারাপ কারা বলে? তারাই কি ভালো? একজন মৃত মানুষকে নিয়ে যারা কাটাছেঁড়া করেন, তাঁর চরিত্র নিয়ে আঙুল তোলেন, তাঁরা কখনোই প্রকৃত অর্থে মানুষ হতে পারেন না।
### নাসিফা রহিম: মহুয়া ছিলেন আমার ভীষণ প্রিয়—আমার ভালোবাসার নায়িকা। আমি তখন একাদশ শ্রেণিতে পড়তাম। একদিন বান্ধবীর সঙ্গে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে নিউ মার্কেটে গিয়েছিলাম। মার্কেটের মধ্যে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দেখি মহুয়া রায়চৌধুরীকে। কিন্তু তাঁকে এতটাই সাধারণ দেখতে লাগছিল যে সন্দেহ হচ্ছিল—সত্যিই কি উনি মহুয়া? পরনে ছিল লালপাড় সাদা সুতির শাড়ি। পিঠে বেণী ঝুলছে। কোনো মেকআপ নেই। তবুও তিনি তো মহুয়া—মহুয়াই!
আমি এখনও তাঁকে ভীষণ ভালোবাসি। যেমন সাধারণ, পাশের বাড়ির মেয়ের মতো সাজে ছিলেন, তাঁর ব্যবহারও ছিল ঠিক তেমনই সহজ-সরল।
আমি সাহস করে কাছে গিয়ে বললাম, “আপনি কি মহুয়া?” তিনি মিষ্টি হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, কেন?” আমি বললাম, “এত সাধারণভাবে আছেন, তাই ভাবছি সত্যিই কি না।” তিনি আবার হাসলেন। আমি বললাম, “আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে। আপনি কি কিনতে এসেছেন?” তিনি বললেন, “কস্টিউম জুয়েলারি।” তারপর হেসে বিদায় নিলেন।
কী সহজ-সরল ব্যবহার! ভাবলে এখনও মন ভরে যায়। ঘटनাটি ১৯৭৮ সালের। তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। আমরা একজন অসাধারণ উজ্জ্বল নক্ষত্রকে হারিয়েছিলাম।
### রাজেশ রায়: কিছুদিন মহুয়া দমদমের গোলপার্কে থাকতেন। তখনই তাঁর ছেলে গোলার সঙ্গে আমার ক্ষণিকের আলাপ হয়েছিল। এত বছর পর হয়তো তাঁর মনে নেই। আমি এবং গোলা তখন দুজনেই বেশ ছোট। মহুয়া শুধু শিল্পী ছিলেন না—তিনি ছিলেন অসাধারণ মিষ্টি মনের একজন মানুষ।
### সুচিত্রা গাঙ্গুলী: টুটুনদির দিদি শান্তার শ্বশুরবাড়ি আমাদের পাড়ায় ছিল। দুই বোন দেখতে এবং স্বভাবে একেবারে বিপরীত ছিলেন। কিন্তু দুজনেই দেখতে খুব সুন্দর ছিলেন। একজন যেন দুর্গা, আর অন্যজন কালী।
টুটুনদির শান্ত, চুপচাপ মুখটা খুব মনে পড়ে। আমাদের বাড়িতে কয়েকবার এসেছিলেন।
### তাপসী দাসগুপ্ত: আমরা টুটুনদিকে ডাকনামেই ডাকতাম। তিনি আমার মা-বাবাকে দিদি ও জামাইবাবু বলে ডাকতেন। আমরা পাশাপাশি থাকতাম। প্রথম সিনেমার শুটিং চলাকালীন একদিন হঠাৎ তিনি আমাদের ঘরে এসে লুকিয়ে ছিলেন—কারণ তিনি শুটিংয়ে যেতে চাইছিলেন না। তাঁকে নিয়ে কত কথাই যে মনে পড়ে! তাঁর মা টেলিফোন ভবনে চাকরি করতেন।
মহুয়া রায়চৌধুরী আজ আমাদের মধ্যে শারীরিকভাবে নেই। কিন্তু তাঁর অভিনয়, তাঁর হাসি, তাঁর সৌন্দর্য এবং সবচেয়ে বড় কথা—তাঁর সহজ-সরল মানবিক ব্যবহার তাঁকে আজও মানুষের হৃদয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে।
কেউ তাঁকে দেখেছেন পর্দায়, কেউ কাছ থেকে; কেউ তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন, কেউ তাঁর পরিবারের সূত্রে তাঁকে চিনেছেন। কিন্তু স্মৃতিগুলির মধ্যে একটি বিষয় বারবার ফিরে আসে—মহুয়া শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন প্রাণবন্ত, আন্তরিক এবং অসাধারণ মনের মানুষ।
আমার মায়ের স্মৃতির পাতা থেকে — মহুয়া স্মৃতিকথা মৌমিতা রায় চৌধুরী: আমার মা তখন কিশোরী বধূ। ১৯৮০ সালেই আমার মা-বাবার বিয়ে হয়েছিল। মা তখন সদ্য অষ্টাদশী। মহুয়া রায়চৌধুরীর অভিনয় আর পাঁচজন বাঙালির মতোই মায়েরও অত্যন্ত প্রিয় ছিল।
বরানগরের জেলেপাড়ায় ১৯৮০/৮১ সালে, সম্ভবত কালীপুজোর মুখে, একটি জলসার আয়োজন করা হয়েছিল। তখন তো পাড়ায় পাড়ায় এমন জলসা হতো। সারারাত ধরে বাঙালিরা সপরিবারে জলসা উপভোগ করতেন। সবাই হয়তো সারারাত জেগে থাকতে পারতেন না, কিন্তু কিছুটা সময় হলেও জলসা দেখতেন। বিশেষ করে প্রিয় শিল্পী থাকলে তো কথাই নেই!
মা ও সেবার জলসা দেখতে গিয়েছিলেন। মহুয়া আসবেন—এই খবরেই অষ্টাদশী বধূটির মনে আনন্দের ঢেউ উঠেছিল। একেবারে সামনের সারিতে বসেই মা সেই সুন্দর, স্বর্ণালী সন্ধ্যার জলসা উপভোগ করেছিলেন। ভূপেন হাজারিকার গান মা মুগ্ধ হয়ে শুনেছিলেন। তিনিও সেদিনের জলসার অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন। এছাড়াও আরও অনেক নামী-দামী শিল্পী উপস্থিত ছিলেন। অবশেষে উপস্থিত সকল দর্শকের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মঞ্চ আলো করে উপস্থিত হলেন মহুয়া রায়চৌধুরী।
তাঁর আলোকিত উপস্থিতিতে সেদিন যেন উদ্বেল হয়ে উঠেছিল গোটা পরিবেশ। মায়ের কাছ থেকেই শুনেছি—কী মিষ্টি তাঁর হাসি! অপরূপ সুন্দর দেখতে লাগছিল তাঁকে। পরনে ছিল সাদা-কালো প্রিন্টের সিল্কের শাড়ি। অসামান্য সুন্দর লাগছিল তাঁকে। দুই কানে ছিল সোনার চেইন লাগানো দুল, যার নিচের দিকে মুক্তো ঝুলছিল। নাকে হীরের নাকছাবিতে উঠছিল আলোর ঝিলিক।
তিনি সকলকে সুমিষ্ট কণ্ঠে বলেছিলেন— “আপনারা সকলে ভালো আছেন তো? সবাই খুব ভালো থাকবেন…” অপরূপা মহুয়াকে সেদিন এতটাই নয়নমনোহর লাগছিল যে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। মঞ্চে তিনি তাঁর অভিনীত কয়েকটি ছবির সংলাপ বলেছিলেন। দর্শকদের অনুরোধে তাঁর ছবির কয়েকটি গান থেকে দু-কলিও গেয়েছিলেন। সেদিন উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধতা আবারও প্রমাণ করে দিয়েছিল—তিনি সকলের নয়নের মণি, প্রিয় নায়িকা এবং অত্যন্ত পছন্দের অভিনেত্রী।মায়ের মতোই সেদিন উপস্থিত সকলেই তাঁকে এত কাছ থেকে দেখতে পেয়ে ভীষণ আনন্দিত হয়েছিলেন।
পরবর্তীকালে আমার বাবা, শ্রী নারায়ণ রায়, এই শহরের একজন নামকরা অর্গানাইজার হয়ে ওঠেন। সেই সূত্রে মুম্বই ও কলকাতার এমন কোনো বড় শিল্পী নেই, যাঁদের মা কাছ থেকে দেখেননি। শুধু তাই নয়, বহু শিল্পীর সঙ্গেই তাঁর বেশ ঘনিষ্ঠ আলাপও হয়েছিল। পরবর্তীতে বাবা চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হন এবং অভিনয়ও করেন। টলিউডের বহু নায়ক, নায়িকা ও শিল্পীর সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সম্পর্কও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এত কিছুর পরেও নববধূ মায়ের চোখে আজও সেই দিনের জলসায় দেখা সপ্রতিভ, অসামান্য রূপসী নায়িকা মহুয়া মন জুড়ে রয়েছেন। এত সহজ, হাসিখুশি একজন মানুষ—সত্যিই যেন সুবাসিত মহুয়া ফুল তিনি। তাঁর মিষ্টি সুবাসে আজও যেন আকাশ-বাতাস সুরভিত।
মা বললেন— “বড় ভালোবাসতাম তাঁর অভিনয় দেখতে। ভগবানের প্রিয় ছিলেন বলেই হয়তো এত তাড়াতাড়ি কাছে টেনে নিলেন তাঁকে। যেখানেই থাকুন, পরম শান্তিতে থাকুন—এটাই শুধু চাইব।” মায়ের সেই স্মৃতির কথাগুলো শুনতে শুনতে মনে হয়, মহুয়া রায়চৌধুরী শুধু পর্দার একজন জনপ্রিয় নায়িকা ছিলেন না—তিনি ছিলেন মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব।
আজও তাঁর হাসি, তাঁর সৌন্দর্য, তাঁর অভিনয় এবং তাঁর সহজ-সরল উপস্থিতির স্মৃতি মানুষের মনে জীবন্ত। সময় চলে গেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু মহুয়ার সেই মিষ্টি সুবাস আজও বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে অমলিন।
বায়োপিক গুনগুন করে মহুয়া - সন্ধ্যা রায়ের ভূমিকায় অভিনয় করবেন অভিনেত্রী রিধিমা ঘোষ
বায়োপিক গুনগুন করে মহুয়া—যা কিংবদন্তি বাংলা অভিনেত্রী মহুয়া রায়চৌধুরী-এর জীবনকাহিনি নিয়ে তৈরি হচ্ছে—এর শুটিং বর্তমানে চলছে। এই ছবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রবীণ অভিনেত্রী সন্ধ্যা রায়-এর চরিত্রায়ণ, যিনি মহুয়ার গুরু ও ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর অন্যতম পথপ্রদর্শক হিসেবে পরিচিত। এই ভূমিকায় অভিনয় করবেন অভিনেত্রী রিধিমা ঘোষ।
ছবির কাস্টে রয়েছেন অঙ্কিতা মল্লিক, যিনি মহুয়ার প্রাপ্তবয়স্ক চরিত্রে অভিনয় করবেন, এবং দিব্যাণী মণ্ডল, যিনি মহুয়ার তরুণ বয়সের ভূমিকায় থাকবেন। পাশাপাশি, তথাগত মুখোপাধ্যায় মহানায়ক উত্তম কুমার-এর চরিত্রে অভিনয় করবেন এবং লোকনাথ দে মহুয়ার বাবার ভূমিকায় থাকবেন।
মহুয়ার কর্মজীবনের শীর্ষ সময়ে তিনি বাংলা চলচ্চিত্র জগতে নিজের স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি করেছিলেন। তাঁর এই উত্থানের পেছনে বড় ভূমিকা ছিল সন্ধ্যা রায়ের, যিনি তাঁকে অভিনয়ের ক্ষেত্রে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই বায়োপিকে তাঁদের গভীর পেশাগত সম্পর্ক ও আবেগঘন বন্ধনের দিকগুলো তুলে ধরা হবে।
এক পুরনো সাক্ষাৎকারে সন্ধ্যা রায় রায় জানিয়েছিলেন, মহুয়া শুধু প্রতিভাবান অভিনেত্রীই ছিলেন না, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই তাঁর নাচের দক্ষতাও ছিল অসাধারণ। পরিচালক তরুণ মজুমদার তাঁর এই প্রতিভায় মুগ্ধ হন এবং মাত্র ১৩ বছর বয়সেই একটি ছবির জন্য তাঁর লুক টেস্ট করানো হয়। পরে তরুণ মজুমদারই সন্ধ্যা রায় রায়কে মহুয়াকে গড়ে তোলার দায়িত্ব দেন।
রিধিমা ঘোষ এই চরিত্রে কাজ করার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত। তিনি জানিয়েছেন, তিনি ইতিমধ্যেই সেই সময়কার নায়িকাদের নিয়ে পড়াশোনা করছেন এবং সন্ধ্যা রায় রায় ও মহুয়ার সম্পর্ক নিয়ে গভীরভাবে গবেষণা করছেন, যাতে চরিত্রটি যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়।
গুনগুন করে মহুয়া ছবিতে মহানায়ক উত্তম কুমারের চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যাবে তথাগত মুখোপাধ্যায়কে
রানা সরকারের প্রযোজনায় তৈরি হচ্ছে নতুন বাংলা চলচ্চিত্র ‘গুনগুন করে মহুয়া’। এই ছবিতে মহানায়ক উত্তম কুমারের চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যাবে তথাগত মুখোপাধ্যায়কে। বিষয়টি নিজেই নিশ্চিত করেছেন অভিনেতা।
তিনি বলেন, “মহানায়ক উত্তম কুমারের মতো অসাধারণ একজন শিল্পীকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা আমার কাছে শুধু অভিনয় নয়, এটি এক গভীর মানসিক দায়িত্ব এবং শ্রদ্ধার জায়গা। তাঁর ব্যক্তিত্বের আলাদা বৈশিষ্ট্য, অভিনয়ের সংযত সৌন্দর্য আর আবেগের সূক্ষ্ম প্রকাশ—সবকিছুকে সম্মান জানিয়েই ‘গুনগুন করে মহুয়া’ ছবিতে আমি তাঁকে নতুনভাবে অনুভব করার চেষ্টা করেছি। আমার মনে হয়, তাঁকে হুবহু অনুসরণ করা সম্ভব নয়। বরং তাঁর অনুভূতি ও অন্তরের স্পন্দনকে নিজের মধ্যে ধারণ করে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই ছিল আমার মূল উদ্দেশ্য। এই পুরো যাত্রায় আমি চেষ্টা করেছি তাঁর প্রতি সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করতে। মহানায়ক হিসেবে তাঁর যে স্বকীয় গরিমা, সেই সৌন্দর্য ও মর্যাদাকে পর্দায় তুলে ধরার আন্তরিক প্রয়াস করেছি।”
এরই মধ্যে তথাগতর সঙ্গে শুটিংয়ের একটি ছবি রানা সরকার তাঁর সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেছেন। যদিও সেখানে তথাগতর মুখ স্পষ্টভাবে দেখানো হয়নি, তবু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায়—তিনি উত্তম কুমারের চরিত্রেই বসে আছেন। এমনকি আগে থেকে কিছু না জানলেও দৃশ্যটি দেখে আন্দাজ করা কঠিন নয় যে তিনি তথাগতই। গত কয়েক দিন ধরে উত্তর কলকাতার হেদুয়া এলাকার কাছাকাছি একটি বাড়িতে ছবিটির শুটিং চলছে। শুটিংয়ের শুরুতেই কলাকুশলীদের সঙ্গে কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গে ইমপা অফিসে সাংবাদিক সম্মেলনও করেন রানা সরকার ও ইমপা সভাপতি পিয়া সেনগুপ্ত। পরে ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের মধ্যস্থতায় সমস্যার সমাধান হয়। এরপর গত শনিবার থেকে পুরোদমে শুটিং শুরু হয়েছে, আর সেদিনই তথাগতর অংশের কাজ সম্পন্ন করা হয়।
এই ছবির পরিচালক রাজদীপ ঘোষ এবং কাহিনি ও চিত্রনাট্যের দায়িত্বে রয়েছেন অর্কদীপ মল্লিকা নাথ। মহুয়া রায়চৌধুরী যখন চলচ্চিত্র জগতে আসেন, তখন মহানায়ক উত্তম কুমারের ক্যারিয়ার ছিল তুঙ্গে—তিনি তখন ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম প্রধান অভিভাবক। বিভিন্ন সময়ে দেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, তিলক চক্রবর্তীর সঙ্গে বিয়ের পর মহুয়া রায়চৌধুরীকে নিয়ে তাঁর বন্ধুরা মহানায়কের বাড়িতে যান, যেখানে সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়া ও আনন্দে সময় কাটান।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ছবিতে মহুয়ার চরিত্রে অভিনয় করবেন অঙ্কিতা মল্লিক। পাশাপাশি, মহুয়ার তরুণ বয়সের ভূমিকায় দেখা যাবে দিব্যাণী মণ্ডলকে। এছাড়া, মহুয়ার বাবা নীলাঞ্জন রায়চৌধুরীর চরিত্রে অভিনয় করতে পারেন অভিনেতা লোকনাথ দে।
মহুয়া রায়চৌধুরীর বায়োপিকে অঙ্কিতার সঙ্গে থাকছেন দিব্যাণী ও দেবলীনা
দেবলীনা এর আগেও অভিনয় করেছেন। এই ছবিতে নায়িকার গাওয়া গানের জন্য কণ্ঠ দেওয়ার পাশাপাশি তিনিও অভিনয়ে থাকছেন। পর্দায় মহুয়ার কোন বয়সের চরিত্রে অভিনয় করবেন দিব্যাণী?
মহুয়া রায়চৌধুরীর বায়োপিকে দেবলীনা নন্দী থাকছেন গায়িকা ও অভিনেত্রী—দু’টি ভূমিকাতেই! শোনা যাচ্ছে, প্রয়াত অভিনেত্রীর বোনের চরিত্রে দেখা যেতে পারে তাঁকে।
এতেই শেষ নয় চমক। এই ছবিতে একই চরিত্রে অভিনয় করবেন ছোট পর্দার দুই জনপ্রিয় নায়িকা—অঙ্কিতা মল্লিক ও দিব্যাণী মণ্ডল!
এই ছবিতে মহুয়া রায়চৌধুরীর চরিত্রের জন্য গান গাইবেন দেবলীনা। খবর ছড়াতেই সোশ্যাল মিডিয়া ও টলিউডে হইচই পড়ে যায়। প্রযোজকের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে টলিউড।
দিব্যাণীকে পর্দায় তরুণ মহুয়া রায়চৌধুরীর চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যাবে। অন্যদিকে, অঙ্কিতা প্রাপ্তবয়স্ক মহুয়া রায়চৌধুরীর ভূমিকায় অভিনয় করবেন।
টুটুন থেকে মহুয়াঃ একজন প্রতিবেশীর চোখে
মহুয়াকে আমি চিনতাম আমাদের পাড়ার নীলুদার মেয়ে হিসাবে। সে তখন ছিল টুটুন, ভাল নাম ছিল শিপ্রা । নাচত। রেকর্ড ড্যান্স, অর্থাৎ রেকর্ড চালি তার সঙ্গে নাচত। হিন্দি বাংলা সব গানের সঙ্গেই। বিভিন্ন শিল্পীর নাচ নিখুঁতভাবে অনুকরণ করতে পারত। পাড়ার মেয়ে, স্বাভাবিকভাবেই পাড়ার সব অনুষ্ঠানেই ওর উপস্থিতি ছিল অপরিহার্য। বহু অনুষ্ঠানে টুটুনকে নিয়ে গিয়েছি। কখনও কিছু পারিশ্রমিক দিয়ে, কখনও কিছু না দিয়েই। ওর বাবার পাশে চুপটি করে বসে থাকত। রোগা ছিপছিপে চেহারা, কতই বা বয়স, দশ কিংবা এগার হবে।
নীলুদা একসময় উদয়শঙ্করের দলে ছিলেন, নাচগানের খুব শখ ছিল, ছবির জগতের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। সেই কারণেই বোধহয় নীলুদা চেয়েছিলেন তাঁর মেয়ে টুটুন নাচগান শিখুক, অভিনয় জগতে একজন সত্যিকারের শিল্পী হয়ে উঠুক। একদিন টুটুন তাই হয়েছে, তার পেছনে ছিল টুটুনের নিষ্ঠা আর নীলুদার প্রেরণা।
দমদম ক্লাইড হাউসের কাছে টেলিফোন কোয়ার্টারে ওরা থাকত। মা ছিলেন টেলিফোন অফিসের কর্মী। ছকবাঁধা জীবন, তাই বাবাই ছিলেন এর সর্বক্ষণের সঙ্গী। নাচের অনুষ্ঠানে কিংবা টালিগঞ্জ- গাড়ায় ছবিতে সুযোগের আশায় ও নীলুদার সঙ্গেই ঘোরাফেরা করত। বাবার হাত ধরে পরিচালক প্রযোজকদের কাছে যাওয়া-আস করতে করতেই ওর মনেও একজন বড় অভিনেত্রী হবার বাসনা দানা বেঁধে ওঠে। অভিনয়কে ভীষণভাবে ভালবেসে, নিজেকে তৈরি করতে থাকে। এরই মধ্যে দমদমের রাধাশ্রী সিনেমা হলে একটা হিন্দি ছবি মুক্তি পেল, নাম 'প্যার'। পরিচালক প্রহ্লাদ শর্মা। সেই ছবিতে নাকি টুটুন আছে! সারা দমদমে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল, সবাই ছুটল টুটুনকে ছবির পর্দায় দেখতে। ছবিটা খুবই নিম্নমানের, কারোরই ভাল লাগল না, তবু টুটুনকে ভাল লাগল। দমদমের মানুষের মনে কিছুটা অহমিকা বোধ জাগিয়ে দিল টুটুন ।
স্মৃতি সাঁতাই বড় বেদনার। আজ লিখতে বসে অনেক কথাই মনে পড়ছে। যদিও ঘনিষ্ঠতা বলতে যা বোঝায় তা ওর বা পরিবারের সঙ্গে আমার ছিল না, তবুও কোথায় যেন একটা আত্মিক যোগাযোগ ছিল। পাড়ার মেয়ে বলেই হয়তো ওর প্রতি আমার একটা আলাদা দুর্বলতা ছিল। দমদমেরই এক ভদ্রলোক একটা কিশোর প্রেমের গল্প লিখলেন। সেই গল্প নিয়ে ছবি করব, এই ভাবনা মাথায় চাপল । টুটুন হবে নায়িকা, নায়ক হবে পার্থ। একদিন আমি আর ক্যামেরাম্যান সুনীল চক্রবর্তী গেলাম ওদের বাড়ি। নীলুদা বাড়িতে ছিলেন না, বউদির সঙ্গেই কথা হল। বউদির মুখেই শুনলাম, তরুণ মজুমদার টুটুনের স্ক্রীন টেস্ট নিয়েছেন তাঁর পরের ছবি 'শ্রীমান পৃথ্বীরাজ'-এর জন্য। সুনীলবাবু ক্যামেরাম্যানের দৃষ্টি দিয়ে ওকে একবার দেখতে চাইলেন। ছাদে পিকনিক করছিল পাড়ার বাচ্চাদের নিয়ে। কিছুক্ষণ পর সারা গায়ে ঝালঝোল মাখা অবস্থায় এসে দাড়াল একটা টেপফ্রক পরা ছোট মেয়ে। সুনীল- বাবু দেখে বললেন, 'ইয়ারে এ যে একেবারেই বাচ্চা'। ঘটনাটি ১৯৭০ সালের গোড়ার। এই হল টুটুন। কোনো এক দৈনিক পত্রিকার দেখলাম লিখেছে ওর বয়স নাকি ৩০ বছর। কী করে হল, হিসাব মেলাতে পারছি না। তরুণবাবুর সেই ছবিতেই ও সুযোগ পেল। শিপ্রা হল মহুয়া রায়চৌধুরী। তারপর ওর এগিয়ে চলার ইতিহাস সকলেরই জানা। ছবির পর ছবি, যশ, খ্যাতি, প্রতিপত্তি।
তারপর ওকে আবার কাছ থেকে দেখবার সুযোগ হল সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে। ও তখন বাংলা চলচ্চিত্রের উঠতি নায়িকা। আমরা তখন বউবাজার অঞ্চলের বাসিন্দা, ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার সামনে একটা রেস্তোরায় আমাদের আড্ডা। বন্ধুবান্ধব সকলের মনেই চলচ্চিত্রকে ঘিরে নানা স্বপ্ন, কেউ অভিনেতা হতে চায়, কেউবা কাহিনীকার, কেউবা 'পরিচালক। সেই ব্যাঙ্ক অব ইণ্ডিয়াতেই চাকরি করে তিলক। এককালের শিশু অভিনেতা মাস্টার তিলক, কিশোর কন্ঠের সুগায়ক তিলক চক্রবর্তী। স্বাভাবিক- ভাবেই তাই তিলকের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ। আমাদের এক বন্ধু সুবোধ নাটক লিখল, 'ভোম্বল ঘটকের কেরামতি (পরে 'ঘটকালি' নামে চলচ্চিত্রে রূপায়িত )। সেই নাটকের মহড়া চলে, অভিনয় হয়, এই সময় তিলকের মনের মানুষ হিসাবে সেখানে টুটুনের আবির্ভাব। টুটুন তখন মহুয়া রায়চৌধুরী|
তারপর একদিন অনেক মানসিক টানা- পোড়েন, ঝড়ঝাপটার মধ্য দিয়ে ওদের বিয়ে হয়। মতাদা, বুড়োদা দাড়িয়ে থেবে সব কিছুর ব্যবস্থা করলেন। বিডন স্ট্রিটে ওরা প্রথম ঘর বাধে। তখনও আমরা গিয়েছি, দেখেছি তিলক-মহুয়ার সুখের সংসার। মহুয়া তখন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, অনেক সময় অনেক অনুরোধ, আবদার নিয়ে আমরা গিয়েছি, কথা রেখেছে, এতটুকু অহমিকাবোধ ওদের মধ্যে দেখিনি। কখনও কোনো অনুষ্ঠানে অতিথি- শিল্পী হয়েছে, কখনও 'ঘটকালি' নাটক করবে বলে বউবাজারের খোলা ছাদের ওপর ঘণ্টার পর ঘন্টা মহড়া দিয়েছে, মুড়ি-চানাচুর ভাগাভাগি করে খেয়েছে, নিজের পয়সা দিয়ে সিঙ্গাড়া মিষ্টি এনে খাইয়েছে। অভিনয়কে মনপ্রাণ দিয়ে ভালবেসেছে, কোনো মোহ বা উচ্চাশায় নয়, অভিনয়কে ভালবেসেই ও বড় অভিনেত্রী হয়েছে।
এরই মাঝে সুবোধের 'ঘটকালি' ছবি হয়েছে। মহুয়া তাতে নায়িকা হয়েছে। আমি একটা ছবি করেছিলাম 'চুপি চুপি', তাতে মহুয়াকে নিতে পারিনি, নিয়েছিলাম সোনালিকে। ছবির শুটিং চলাকালীন এক- দিন স্টুডিও-র মেকআপ রুমে হাসতে হাসতে বলেছিল 'কী ব্যাপার ! দমদমের লোকের ছবিতে আমিই বাদ।' ওকে কিছু বলিনি, হেসে কথাটা হজম করেছিলাম। মনের মধ্যে ইচ্ছা ছিল ভবিষ্যতে ছবি করবার সুযোগ পেলে ওকে নায়িকা করব। কিন্তু মানুষের সব আশা পূর্ণ হয় না, আমারও হল না।
মহুয়া রায়চৌধুরীর কথা বললেন অভিনেত্রী দেবিকা মুখোপাধ্যায়
মহুয়ার ডাগর-ডোগর মুখটা ক্লোজ আপে কী মিষ্টি লাগত! মহুয়ার রূপে কোনও উগ্রতা ছিল না। গায়ের রং কিন্তু শ্যামলা। মহুয়ার খুব সাধারণ মধ্যবিত্ত মানসিকতার চেহারা ছিল কিন্তু ক্যামেরার সামনে গ্ল্যামার নিয়ে আসত। এক সাক্ষাৎকারে, দেবিকা মহুয়া সম্পর্কে এই কথাগুলো বলেছিলেন
মহুয়া রায়চৌধুরীর ৪০ তম প্রয়াণ বার্ষিকীতে তাঁর কথা বললেন অভিনেত্রী দেবিকা মুখোপাধ্যায়। ৪০ বছর পর এই প্রথম মহুয়াকে নিয়ে মুখ খুললেন 'ছোট বৌ' দেবিকা।
মহুয়ার সঙ্গে দেবিকা বললেই তো মনে পড়ে 'আবির' ছবির কথা। যে ছবি মহুয়ার মৃত্যুর দু বছর পর রিলিজ করেছিল। একটু গল্প বলুন না?
আমাকে আগে কেউ কোনওদিন জিজ্ঞেসও করেননি এই বিষয়ে। অথচ মহুয়া আর আমি সহকর্মী ছিলাম এই ইন্ডাস্ট্রিতে।
'আবির' ছবির অফার নিয়ে কিন্তু পরিচালক কাজল মজুমদার মহুয়া মারা যাবার আমার কাছে এসেছিলেন। মহুয়ার সঙ্গে আমি এই ছবিতে কোনও শুটিং করিনি। কারণ ছবিটা যখন শুরু হয় আমি কোনও গল্পেই ছিলাম না। মহুয়া ছবিটা শেষ করে যেতে পারেনি। তখন ছবিটা শেষ করতে পরিচালক গল্পে আর একটি নায়িকা চরিত্র আমাকে নিয়ে এলেন। 'আবির' ছবিতে দেখা যায় আমার আর মহুয়ার একসঙ্গে দৃশ্য, বেশ কয়েকটা। কিন্তু ওগুলো সব সুচতুর এডিটিং। মহুয়া মারা যাবার পর তো ডিরেক্টর আমায় এই ছবির অফার দেন। আমি এই ছবিতে মহুয়ার সঙ্গে শুটিং করিনি। সেটা দর্শকরা ধরতে পারবেন না। 'আবির' ছবিটা ভালই চলেছিল। অল্প টাকার ছবি, আমরাও তো বেশি টাকা পাইনি সেসময়। কিন্তু চলেছিল। এই ছবিতে মাদ্রাজের একটা বিখ্যাত ট্রেনড কুকুর 'মোতি' ছিল। সে হিন্দি সিনেমাও অনেক করেছিল। যাকে দেখেতেও 'আবির' ছবিটা জনপ্রিয় হয়েছিল।
মহুয়ার সঙ্গে আর কোনও ছবিতে আপনি কাজ করেছিলেন?
হ্যাঁ তপন সিনহার 'রাজা'। একই ছবিতে আমরা দু'জন ছিলাম। তপন সিনহার সঙ্গে কাজ করা আমার কাছে একটা স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। তার আগে 'বাঞ্ছারামের বাগান', 'আদালত ও একটি মেয়ে' করেছি। তবে তপনদার আর একটা ছবিতে আমি হিরোইন ছিলাম। যে রোলটা হিন্দিতে মহুয়া করেছিল। 'আদমি অউর অউরাত' ছবিতে অমল পালেকর আর মহুয়া রায়চৌধুরী ছিল। এই হিন্দি ছবিটার গল্প নিয়ে একটা বাংলা ছবিও হয়েছিল 'মানুষ'। মহুয়ার রোলটা আমি করি আর আমার বিপরীতে ছিলেন শমিত ভঞ্জ। মহুয়া মারা যাবার পর এই বাংলা 'মানুষ' ছবির আমার কাছে আসে। এই ছবিটা মুক্তিও পেয়েছিল পরে। কিন্তু এখন আর কোনও চর্চায় নেই। আমাকে শুধুই 'ছোট বৌ' বলা হয় চিরকাল। অথচ তপন সিনহার এতগুলো ছবি করেছি। 'মানুষ' ছবিতে হিরোইন আমি, তবু কজন আর জানল? ছবিটাই তো পাওয়া যায় না।
মহুয়া আমার থেকে একটু সিনিয়র ছিল। তবে আমার দু'জন দু'জনকে তুই করেই বলতাম। ওঁর চলে যাওয়া বড় মাপের নায়িকার প্রস্থান। ভীষণ ইমোশনাল অ্যাকট্রেস ছিল মহুয়া। গ্লিসারিন ছাড়া কাঁদতে পারত। যেটা এখন কেউ জানেই না, পারেই না। সব চোখে ড্রপ দিয়ে দিয়ে কাঁদে। নিজের বাস্তব জীবনের কষ্টটা মহুয়ার মনে পড়ত। তাই বলত 'কান্নার সিনে আমার গ্লিসারিন লাগে না'। একটা মেয়ে যখন ক্যামেরার সামনে হাউহাউ করে কাঁদতে পারে তখন তো তাঁর ভেতরের যন্ত্রনাগুলো বেরিয়ে আসে। আমিও পারতাম সেটা।আমি মহুয়াকে বলতাম 'আমার ছোটবেলায় বাবা মারা গেছে, বাবার কথা ভেবে আমি কেঁদে ফেলি'। মহুয়াও তখন বলত 'আমার জীবনেও অনেক কষ্ট আছে। সেগুলোর কথা ভেবে আমি কেঁদে ফেলি'।
ওঁর মৃত্যুর ৪০ বছর পরও অমন অভিনেত্রী আর পাওয়া যাবে না। মহুয়ার ডাগর-ডোগর মুখটা ক্লোজ আপে কী মিষ্টি লাগত! মহুয়ার রূপে কোনও উগ্রতা ছিল না। গায়ের রং কিন্তু শ্যামলা। মহুয়ার খুব সাধারণ মধ্যবিত্ত মানসিকতার চেহারা ছিল কিন্তু ক্যামেরার সামনে গ্ল্যামার নিয়ে আসত। ক্যামেরাতে ভীষণ ( ভীষণে জোর দিলেন দেবিকা) ভাল আসত। কিন্তু খুব ঘর-গেরস্থর মেয়ে ছিল। ওঁকে সামনে দেখলে কেউ বলবে না সিনেমা আর্টিস্ট। একটু ক্ষ্যাপাও ছিল। বাইরে কোথাও রাতে শো করে এসে, স্টুডিওর বাথরুমে স্নান করে নিল। আমি বললাম, 'বাড়ি যাবি না?' বলল 'দূর বাড়ি গিয়ে আবার স্নান কে করে!' স্টুডিওটাকেই মহুয়া ওঁর ঘর সংসার ভেবে ফেলত।
আমরা সহকর্মী ছিলাম। আমার সঙ্গে ওঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল না। রত্না দির (ঘোষাল) যেটা ছিল। কাজ করতে গিয়ে টুকটাক ব্যক্তিগত কথা যা হত। একবার টেকনিশিয়ান স্টুডিওর মেকআপ রুমের ভিতর ঢুকে দেখলাম মহুয়া মেকআপ করছে। আমিও মেকআপে বসব। ওঁর আর আমার আলাদা ছবি ছিল। কিন্তু আমরা এক মেকআপ রুম শেয়ার করছিলাম। তখন দেখি মহুয়ার মুখে মারের দাগ। ঠোঁটের কাছে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। মুখ মার খেয়ে ফুলে রয়েছে। কাটার দাগ। মেকআপ ম্যানকে মুখের দাগগুলো ঢেকে দিতে বলছিল মহুয়া। তখন মহুয়াকে বললাম 'এই অবস্থা তোর কে করল?' বলল 'তিলক, আমার বর!' আমি বললাম তোদের এত ঝগড়া, মারপিট হয় কেন? এত মার খাবি কেন? তখন বলল 'আমি একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছিলাম। সারাক্ষণ টাকা চায়। তাই মারপিট হয়ে যায়।' এটা তো আমি একদিনের ঘটনা বলছি, যা দেখেছিলাম। কিন্তু স্টুডিওপাড়ায় শুনতাম লোকমুখে ওঁরা স্বামী-স্ত্রী দু'জন হামেশাই মারপিট করত। আসলে বেশি জিজ্ঞেস করিনি। আমার তখন অত ম্যাচিউরিটি ছিল না। মহুয়ারও ছিল না। ব্যক্তিগত সংসার জীবন আর প্রফেশনাল জীবন এক করে ফেলত। আমি তাও ওঁকে বুঝিয়েছিলাম। কিন্তু আমার জ্ঞান সেদিন মহুয়া শোনেনি। সংসারে শান্তিটা ওঁর ছিল না। সেটা আমি ওকে দোষ দেব না। ওঁর স্বামীকেও চিনতাম না। আমি বলব আমি জানিনা। যা দেখেছিলাম সেটা খুব কষ্টের। কিন্তু আমি সবসময় ওঁর ভালটা তুলে ধরব। আমি নিজে একজন অভিনেত্রী হয়ে ওঁকে গুণী অভিনেত্রী হিসেবেই দেখব।
আমি তো গিয়েছিলাম তখন মহুয়ার এস এন রায় রোডের বাড়িতে। আমাদের ফিল্মের লোকজন অনেকেই ছিলেন। কিন্তু মহুয়ার মুখ তো ঢাকা ছিল। আগুনে পোড়া শরীর সম্পূর্ণ কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল। শবদেহটা দেখেছিলাম কিন্তু আমি তো মহুয়ার মুখ দেখতে পাইনি। সেখানে ওঁর বর, বাবা, ছেলে গোলা সবাইই ছিল। কী ভাবে আগুন লাগল আমি জানিনা। শুনেছিলাম সুইসাইড বা এতটাই অতিরিক্ত মদ্যপান করেছিল যে ছেলের দুধ গরম করতে গিয়ে কখন আগুন লেগে গিয়েছে গায়ে নিজেই বুঝতে পারেনি। ওরকম মৃতদেহর সামনে কী আর এত প্রশ্ন করা যায়! আমি কিছু জিজ্ঞেস করিনি। আমি ভাবতেই পারছিলাম না। ভগবান যাকে যখন নিয়ে নেন। ওঁর মতো অভিনেত্রী আর এল না ইন্ডাস্ট্রিতে।
ফিল্মি দুনিয়ায় মহুয়া রায়চৌধুরীর যাত্রা কীভাবে শুরু হয়েছিল
চলচ্চিত্রে দর্শকদের মনোরঞ্জনের জন্য সৎ ছবি যাঁরা তৈরী করেন তাদের অন্যতম তরুণ মজুমদার। বালিকা বধুর সাফল্য তরুণ বাবুকে অনুপ্রাণিত করে শ্রীমান...
-
মহুয়াকে আমি চিনতাম আমাদের পাড়ার নীলুদার মেয়ে হিসাবে। সে তখন ছিল টুটুন, ভাল নাম ছিল শিপ্রা । নাচত। রেকর্ড ড্যান্স, অর্থাৎ রেকর্ড চালি তা...
-
মহুয়ার ডাগর-ডোগর মুখটা ক্লোজ আপে কী মিষ্টি লাগত! মহুয়ার রূপে কোনও উগ্রতা ছিল না। গায়ের রং কিন্তু শ্যামলা। মহুয়ার খুব সাধারণ মধ্যবিত্ত ...
-
'আপনার মতে বাংলার সেরা অভিনেত্রী কে তৈরি করেছেন?' একজন প্রভাবশালী সাংবাদিক বন্ধুর প্রশ্নের জবাবে সত্যজিৎ রায় এক মুহূর্ত দ্বিধা ছাড়...










