চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা ‘উল্টোরথ’-এর একটিমাত্র পৃষ্ঠা পাওয়া গিয়েছিল এবং তার লেখাটি নিম্নরূপ:
এক শ্রেণীর দর্শকদের কথা বাদ দিলে অধিকাংশ দর্শকই সিনেমার পর্দায় প্রথমেই দেখতে চান সুন্দর এক রোমান্টিক জুটি। উত্তম সুচিত্রার সরল সৌন্দর্যও বলা যেতে পারে তাদের জনপ্রিয়তার কারণগুলির একটি।
চলচ্চিত্রে দর্শকদের মনোরঞ্জনের জন্য সৎ ছবি যাঁরা তৈরী করেন তাদের অন্যতম তরুণ মজুমদার। বালিকা বধুর সাফল্য তরুণ বাবুকে অনুপ্রাণিত করে শ্রীমান পৃথ্বীরাজ তৈরী করতে। তিন এআর প্রেম কাহিনীর নতুন রোমান্টিক জুটি খুঁজতে গিয়েই আবিষ্কার হয় মহুযার। দমদমের রত্নাগড় বালিকা বিদ্যামন্দিরের ক্লাস এইটের ছাত্রী মহুয়া তখন কয়েকটি ছবিতে এক্সট্রার কাজ করছে। আর্থিক তাগাদাও ছিল। নায়িকা হবার বাসনা চোখের কোণে চিক চিক করত। কিন্তু টেকনিসিয়ান্স স্টুডিওতে এক পরিচিত পরিচালক তো সোজাসুজি মুখের ওপর বলেই দিয়েছিলেন 'তোমার দ্বারা হবে না'। কিছু ব্যথা আর অভিমান নিয়ে বাবার হাত ধরে মহুয়া ফিরছিল স্টুডিও থেকে। স্টুডিওর গেটেই দেখা হয়ে গেল জামাল হাসানের সাথে। জামালের সবচেয়ে বড় পরিচয় উনি ছিলেন সুচিত্রা সেনের মেক আপ ম্যান। জামালই জানালেন তরুণবাবু নতুন মেয়ে খুঁজছেন তাঁর ছবির জন্য।
দ্বিধা আর সংকোচকে দুপায়ে মাড়িয়ে পায়ে পায়ে মহুয়া হাজির হলো তরুণবাবুর কাছে। কয়েকটি মুহূর্ত। তরুণবাবু দেয়ালের পাশে সরে দাঁড়াতে বললেন। মহুয়া যন্ত্র মানবীর মত সরে এলো। মহুয়ার মাথার কাছে দেয়ালে একটা দাগ দেওয়া হল। মহুয়া দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দেখে তার দাগের কিছুটা উঁচুতে আর একটি দাগ।
মহুয়া ব্যাপারটা বুঝে ওঠার আগেই তরুণবাবুর আদেশ, ঘোমটা দাও। মহুয়া ঘোমটা দিল। শাড়ির আঁচল কাছ কোমর করে বাঁধা হল। তরুণবাবু দেখলেন। আরও কয়েক রকম ভঙ্গিমায় মহুয়াকে দাঁড়াতে হল। এতক্ষণে মহুয়ার কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার। দেয়ালে উচ্চতার ওপরের দাগটি ছিল অয়নের। পরবর্তীতে শ্রীমান পৃথ্বীরাজ তৈরী হল এই অয়ন মহুয়ার জুটি নিয়ে। অবশ্য তরুণবাবু সেদিনই মহুয়াকে তার পছন্দের কথা জানান নি। পরে দেখা করতে বলেছিলেন। মহুয়া শ্রীমান পৃথ্বীরাজ-এ নায়িকার ভূমিকায় নির্বাচিতা হলো।
ছবিতে আসার আগে থেকেই মহুয়া স্টেজে অভিনয় করেছে। নেচেছেও বহু অনুষ্ঠানে। সঙ্গী ছিল তিলক চক্রবর্তী। আজ তিলক শুধু তার নাচের অনুষ্ঠানেরই সঙ্গী নয় জীবন সঙ্গীও বটে। রীতিমত সাত পাকে বেঁধেছে তিলক। ছবির কাজ বা ঘরোয়া ব্যাপারেও স্বামীর মতামতকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় মহুয়া। ১৯৭৫-এর এক শুভদিনে চার হাত এক হলেও সে মনে মনে তিলককে স্বামী হিসেবে বরণ করে নিয়েছিল তার অনেক আগে। 'আনন্দ মেলা' ছবির শুটিং এর সময় মহুয়া তো রীতিমত হাবুডুবু খেয়েছে তিলকের প্রেমে। প্রথম কবে যে তিলককে ভালোবেসেছে মহুয়া নিজেই জানে না। যেদিন দুজনের কাছেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হলো, মহুয়া ছুটে গেল নিজেরই অজান্তে তিলক যে ব্যাঙ্কে চাকরী করে সেখানে।
তিলকের সঙ্গে আলাপের ঘটনাটাও সিনেমাটিক। "কোলকাতার বাইরে ফাংশান সেরে (তিলক সংগীত শিল্পীও বটে)। তিলক ফিরছিল, রাস্তায় ওর গাড়ি খারাপ হয়ে যায়। অপেক্ষা করছিল লিফট-এর জন্য।
আমিও ফিরছিলাম এক ফাংশান সেরে। আমি লিফট দিলাম। তখন থেকে তিলক আমার বাবাকে ডাকত নীলুদা বলে। আর আমি? আমি বলতাম তিলক কাকু। এর পর থেকেই দুজনেরই হোল প্রেম রোগের শিকার। বিয়েটা অবশ্য সহজে হয়নি। মহুয়ার বাবার মত ছিল না এ বিয়েতে। স্টুডিও পাড়ায় মহুয়ার বদনাম ভীষণ একগুঁয়েমির জন্য। বদনামকে সার্থক করে তুলতে বাবার অমতেই বিয়ে করলো মহুয়া। অভিনেতা তরুণকুমার, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেরা দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দেন।
বিয়ের প্রায় আট বছরের মধ্যে সংসার ও সিনেমায় মহুয়ার সাফল্য আর সাফল্য। বাংলা বা বোম্বে ছবির জগতে মহুয়ার মত সুখী নায়িকা খুব কমই আছে।
উৎস: একটি ম্যাগাজিন থেকে

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন