ইস্টবেঙ্গলের প্রতি মহুয়া রায়চৌধুরীর ভালোবাসা - প্রতিবেদক রবি বসুর বক্তব্য থেকে নেওয়া

 মহুয়া রায়চৌধুরী ছিলেন ইস্ট বেঙ্গল ফুটবল ক্লাবের একজন ডাই হার্ড ফ্যান। রবি বসুর বইতে মহুয়ার অনেক ঘটনা রয়েছে এবং এই নিবন্ধটি সেই বই থেকে নেওয়া হয়েছে।



"ফুটবল খেলাটাকে প্রচন্ড ভালোবাসত মহুয়া। একদম ছোটবেলা থেকেই। ওর দাদা পিনাকী যখন বন্ধুদের নিয়ে ফুটবল খেলতে যেত , তখন মহুয়াও তাদের পেছন পেছন যেত মাঠে। কেবল দর্শক হিসেবেই নয় , প্লেয়ার কম পড়লে নিজে মাঠে নেমে পড়ে গোলে দাঁড়িয়ে যেত। সেখান থেকেই চিৎকার করে বিপক্ষের খেলোয়াড়দের শাসাত : এই , আমার গোলের দিকে জোরে বল মারবে না বলে দিচ্ছি। আমাকে গোল দিয়ে দিলে তোমাদের সঙ্গে রক্তারক্তি হয়ে যাবে কিন্তু। স্বপক্ষ আর বিপক্ষ উভয় দলের খেলোয়াড়রাই মহুয়ার কথা শুনে হেসে ফেলত।

যেদিন মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের খেলা থাকত , মহুয়া সেদিন সকাল থেকেই খুব টেনশনে ভুগত। কাজেকর্মে ভালো করে মন বসাতে পারত না। সেদিন স্টুডিওতে এসেই ডিরেক্টারকে বলত : আমাকে লাঞ্চের আগে যত পার খাটিয়ে নাও। বিকেলের দিকে খেলা আরম্ভ হলে আমাকে দু'ঘন্টা ছুটি দিতে হবে। ওই সময় আমি খেলা দেখব।
মহুয়াদের একটা ট্রানজিস্টার টিভি ছিল। হাত দুয়েক লম্বা সরু মতন। স্ক্রিনটা বোধহয় ছ'ইঞ্চি বাই ছ'ইঞ্চি হবে। ব্যাটারিতে চলত। তিলক অফিস যাবার সময় ওই টিভি-টা মহুয়াকে দিয়ে যেত। মহুয়া সেটাকে মেক-আপ রুমে কাজের মেয়েটির কাছে রেখে দিত। আমি স্টুডিওতে গিয়ে হাজির হলে বলত : এই রবিদা, আজ আমাদের টিমকে হারাবার চেষ্টা করবে না বলে দিচ্ছি। আমাদের টিম যদি হারে তাহলে তোমার সঙ্গে একচোট হয়ে যাবে কিন্তু।

আমি হাসতে হাসতে বলতাম : আজ তোমাদের টিম হারবেই। আমি আসবার সময় কালীঘাটে মোহনবাগানের হয়ে পাঁচসিকে পূজো দিয়ে এসেছি।

মহুয়া বলত : আমিও দক্ষিণেশ্বরের মায়ের কাছে আড়াই টাকা মানত করে রাখলাম। দেখি তোমরা ইস্টবেঙ্গলকে কেমন করে হারাও।
এইরকম নানা হাসি-ঠাট্টার মধ্যে দিয়ে মহুয়া তার টেনশন কাটাবার চেষ্টা করত। কিন্তু যত বেলা গড়াত ততই তার মুখটা শুকিয়ে যেত। মাঝে মাঝে বলত : কী হবে বলো তো রবিদা ?

আমি ওকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে বলতাম : এই মউ, ব্যাপারটাকে এত সিরিয়াসলি নিচ্ছিস কেন বল তো ! খেলাটা তো স্পোর্টস। এটাকে স্পোর্টিংলি নিতে পারিস না ? যারা ভালো খেলবে তারা জিতবে।

মহুয়া মুখ শুকনো করে বলত : না গো রবিদা, ইস্টবেঙ্গল হেরে গেলে বুকের ভেতর যে কী কষ্ট হয় তা তোমাকে বোঝাতে পারব না।
সব থেকে দুঃখের ব্যাপার সেদিন ইস্টবেঙ্গল সত্যিই হেরে গেল। মেক-আপ রুমে বসে ওরই টিভিতে আমরা দুজনে খেলাটা দেখছিলাম।
ইস্টবেঙ্গল হেরে যাবার পর মহুয়ার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে সে কি কান্না ! তখন মনে হচ্ছিল মোহনবাগান হেরে গেলেই বোধহয় ভালো হত। অনেক কষ্টে সেদিন ওর কান্না থামাতে পেরেছিলাম।
আজও যখন টিভিতে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের খেলা দেখি তখন মহুয়ার কথা বড্ড বেশি করে মনে পড়ে যায়। সে যেখানে গেছে সেখান থেকে কি খেলা দেখা যায় ?"

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন