কমল বন্দোপাধ্যায় মহুয়া রায়চৌধুরীর 37 তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতি থেকে স্মরণ করেছেন

 দমদমের বাসিন্দা কমল বন্দ্যোপাধ্যায় শিল্পীকে একদম মেয়েবেলা থেকে দেখেছেন তাঁর দাদার বন্ধু হিসেবে। গত বছরও স্মৃতিচারণ করেছিলেন আজকের দিনে তাঁর হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকে নিয়ে। আজ আবার বললেন কিছু কথা। ছোট ছোট মণি মুক্তোয় ভরা সেই সব কথা হুবহু তুলে দিলাম।

❤️❤️ হয়তো আমাকে ভুলে যাবে
স্মৃতিতে আমাকে খুঁজে পাবে ❤️❤️
এবং
❤️❤️ আমি ভালো নেই ❤️❤️
-----------------------------------------------------------------------
** আর কয়েক ঘন্টা বাদেই আসতে চলেছে অভিশপ্ত ২২ জুলাই। " আশীর্বাদ" ছবির এই সংলাপ ও গানের কলি যে এতটা বাস্তব রূপ ধারণ করবে তা বোধহয় জুলাই,১৯৮৫-র আগে কেউ কল্পনাও করতে পারেননি।‌ যে নায়িকার ঠোঁটে এই সংলাপ ও গানের কলি চিত্রায়িত হয়েছিল তাঁর নাম মহুয়া রায়চৌধুরী।
** ২২ জুলাই, ১৯৮৫ , সোমবার, বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এক " অগ্নিদগ্ধ অভিশপ্ত" তারিখ যেদিন ইহজগৎ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ২৯ বছর বয়সী সকলের প্রিয় নায়িকা মহুয়া রায়চৌধুরী।‌ দেখতে দেখতে দীর্ঘ ৩৭ বছর অতিক্রান্ত, কিন্তু আমার কাছে মনে হয় এই তো সেদিনের ঘটনা। যখন‌ই ভাবি তখনই বহু পুরোনো স্মৃতি মনের মাঝে ভীড় করে আসে।
** ষাটের দশকের শেষার্ধ। সেই সময়ে স্কুলের লেখাপড়ার মেয়াদ উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ছিল ১১ শ্রেণী পর্যন্ত। সেই সময় স্কুলে একটি ছেলের সঙ্গে আলাপ হয়, পরিচয় হয়, বন্ধুত্ব ও হয়। নাম পিনাকী রায়চৌধুরী। ওর মা কলকাতা টেলিফোন অফিসে চাকরি করতেন। দমদমে যশোহর রোডে ক্লাইভ হাউসের পরেই ৫৭ এক্সচেঞ্জ টেলিফোন কোয়ার্টারে পিনাকীরা থাকতো। ওর দুই বোনের এক বোনের নাম ছিল শিপ্রা রায়চৌধুরী। শিপ্রার আরও একটা বিশেষ গুণ ছিল, খুব ভালো নাচতে পারতো। বিভিন্ন বিচিত্রানুষ্ঠানে নাচের অনুষ্ঠান করতো ঐ মেয়েটি। নাচের অনুষ্ঠানে ওঁর পরিচিতি ছিল " সোনালী" বলে। যেহেতু ওঁর মা কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারী ছিলেন, চাকরি করতে হতো তাই ওঁর বাবা নীলাদ্রীবাবু সোনালীকে সব অনুষ্ঠানে নিয়ে যেতেন। যেহেতু আমরা কয়েকজন পিনাকীর বন্ধুস্থানীয় ছিলাম তাই আমাদের সঙ্গেও শিপ্রার যথেষ্ট ভালো " দহরম মহরম" গড়ে উঠেছিল।‌ সেই শিপ্রাই বছর দুয়েকের মাথায় দেখি বাংলা চলচ্চিত্রে নায়িকা হয়ে উঠলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় পরিচালক সদ্যপ্রয়াত তরুণ মজুমদারের হাত ধরে। চলচ্চিত্র জগতে ওঁর নামটাও তরুণ মজুমদার মহাশয় পাল্টে দিলেন, নাম রাখলেন " মহুয়া" । এর আগেও অবশ্য তরুণ মজুমদার আর এক নবাগতা নায়িকা ইন্দিরা চ্যাটার্জীর নাম পাল্টে " মৌসুমী চ্যাটার্জী" রেখেছিলেন। টালিগঞ্জ ও বোম্বের চলচ্চিত্র জগতের নায়িকা মৌসুমী চ্যাটার্জীকে কে না চেনেন? সেই মৌসুমী চ্যাটার্জী আবার সঙ্গীতশিল্পী ও সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের পুত্রবধূ হন, সবাই জানেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ভবানীপুরের বাড়িতে মেনকা সিনেমা হলের পাশে আমি গেছি এবং কপালগুণে মৌসুমী চ্যাটার্জীর সঙ্গে কথাও বলেছি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ঐ বাড়িতে মৌসুমী চ্যাটার্জীর নাম কিন্তু ইন্দিরাই। যাক, আজকের প্রসঙ্গে আসি।
** " শ্রীমান পৃথ্বিরাজ" ছবিতে মহুয়া রায়চৌধুরীর আবির্ভাব। তারপর বহু ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় কি ছিল জানেন? এত নামডাক, এত টাকাপয়সা হ‌ওয়া সত্বেও যা তিনি তাঁর অভিনয় সত্তা দিয়ে আয়ত্ত্ব করেছিলেন মনটা কিন্তু রেখেছিলেন একেবারে খোলামেলা । কোনরকম কূটকাচালি জানতেন বলে আমার বিশ্বাস হয় নি। সবথেকে মজার ব্যাপার ছিল, নিজের দাদার মতোই আমাকেও " দাদা" বলে ডাকতেন সদাসর্বদা। ১৯৭৩ সালে আমার " উপনয়ন" উপলক্ষ্যে নিমন্ত্রণ করেছিলাম। মহুয়া এসেছিলেন রাত দশটা নাগাদ। ততদিনে তিনি নায়িকা হয়ে গেছেন।
** যখন টেলিফোন কোয়ার্টারে থাকতেন তখন তো প্রায় নিয়মিতই আমি যেতাম এবং সেটা বিকেলের দিকে। যারা ঐ টেলিফোন কোয়ার্টারটা চেনেন তাঁরাই জানেন, রাস্তার উল্টোদিকে মেয়েদের কলেজ আছে
" সরোজিনী নাইডু কলেজ" । যেদিন মহুয়া থাকতেন ঐ কলেজের পড়ুয়া মেয়েরা কী করে যেন জেনে যেতো " আজ মহুয়া আছেন" । কোয়ার্টারের সামনের মাঠটাতে ভীড় লেগে যেতো ঐ কলেজ পড়ুয়া মেয়েদের। একবার একটু চোখের দেখা দেখবার জন্য। আর আমিও ঐ ভীড় ঠেলে গটগটিয়ে দোতলায় উঠে যেতাম। একদিন তো মহুয়াকে বলেই ফেললাম ওদের কথা। ওহ! আমি তো মূল কথাটাই বলতে ভুলে গেছি। সেই ১৯৬৯ সাল থেকে যতদিন দুজনের কথাবার্তা হয়েছে একে অপরকে " তুই" বলেই সম্বোধন করেছি। আশির দশকে এত নামডাক হ‌ওয়া সত্বেও এই সম্বোধনের পরিবর্তন হয়নি। উনি আমাকে " দাদা" বলেই ডেকেছেন, আর আমিও ওনাকে একটা বিশেষ নামে ডাকতাম।‌
** আমি একদিন বলেছিলাম, "যা না, একবার ব্যালকনিতে গিয়ে দুটো মিনিট দাঁড়া না। তোকে দেখতে পেলে মেয়েগুলো বর্তে যাবে। " সেদিন বোধহয় মুড খুব ভালো ছিল। আমার কথা শুনে মেয়েগুলোকে হাত নেড়ে অভিবাদন করে এলো। ওমা, এসেই আমার ওপর চোটপাট। " আজকে বলেছিস বলেছিস, ফারদার আর এরকম রিকোয়েস্ট করতে আসবি না। তাহলে মেরে তোর নাকমুখ ফাটিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেবো। " বলেই সেই নির্মল হাসির ফোয়ারা। " শ্রীমান পৃথ্বিরাজ " ছবির সফলতার পর " মৃণালিনী " সিনেমা হলের উল্টোদিকে" কেরালা রেস্টুরেন্ট "- এ আমাদের কয়েকজনকে খাইয়েছিলেন এখনও মনে আছে। এখন তো যেদিকে তাকাই, সবদিকে ফ্ল্যাট বাড়ি বা বহুতল ভবনের ছড়াছড়ি। কিন্তু সত্তর দশকে খুব কম লোকেরই সাধ্যে কুলোতো একটা ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকার।‌ মহুয়া ঐ দশ বছরের মধ্যে তিন তিনটে ফ্ল্যাট বাড়িতে বাস করে গেছেন।
** ওনার কল্যাণে আমি বেশকিছু নামজাদা মানুষের সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ‌ও পেয়েছিলাম। উৎপল দত্ত, বিকাশ রায়, অনুপকুমার, অলকা গাঙ্গুলি, তাপস পাল, মাধবী মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা রায় প্রমুখ। একটা ঘটনার উল্লেখ করে প্রতিবেদন শেষ করবো। ১৯৭৯/৮০ সালের ঘটনা। একদিন হঠাৎ পিনাকী আমার বাড়িতে সকালে এলো। তখন আমি রীতিমতো কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারী, ডাক বিভাগের অন্তর্গত কলকাতা এয়ারপোর্ট সর্টিং ডিভিশন এ চাকরি করি। আগের রাতে নাইট ডিউটি করে বাড়িতে এসে শুয়ে আছি। পিনাকী এসে বললো, " আজ বিকেলে পাঁচটার সময় চলে আসবি।‌ বোন তোকে থাকতে বলেছে কিসব বলবে" । আমি তো গেলাম দেখি উনি ঘুমোচ্ছেন। প্রায় ছটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে ( গায়ে একটা কালো ফুল ছাপের নাইটি পরা) সোজা আমাকে পিটুনি। আমি বললাম " মারার জন্য ডেকে এনেছিস? ধুর, আমি চললাম। তোর চকলেট নে" । ওকে চকলেট খাওয়ানোটা আমার একটা কাজ ছিল। বললো " না রে, গায়ে হাত পায়ে একটু ব্যথা করছিল তোকে মেরে ঠিক করে নিলাম। আসলে কি জানিস আজকে সকালেই তো শিমুলতলা থেকে ফিরলাম তরু মামার ছবির শুটিং সেরে। ভাবলাম তোকে আগে গল্পটা বলে নেই। তাই ডেকেছি । তোর আজকে অফিস আছে নাকি? " আমি উত্তরে বলেছিলাম, ও এই ব্যাপার। তাহলে বলেই ফ্যাল শুনে নেই। " নিজের হাতে কফি বানিয়ে একটা প্লেটে করে চানাচুর ঢেলে সেন্টার টেবিলে রেখে দুম করে আমার গা ঘেঁষেই সোফায় বসে পড়লো। আমার শুধু এই ধাঁধাটা কোনোদিনই যাবে না যে, যে মেয়েটাকে আমি নিজের চোখে এতদিন স্টোভ বা গ্যাস ওভেন অন করে খাবার তৈরি করতে দেখেছি তাঁর মৃত্যু ওভাবে হ‌ওয়াটা যথেষ্ট আশ্চর্যের। যাক, তো সেদিন রাত দশটা পর্যন্ত ওঁর মুখে " দাদার কীর্তি " ছবির বহির্দৃশ্য ( outdoor) ) যেটা শিমুলতলাতে হয়েছিল তার গল্প শুনলাম। সেদিনের সন্ধ্যাটা ছিল আমার কাছে
" বিশেষ স্মরণীয় " । এই সৌভাগ্য কজনের হয়?
** বহু স্মৃতি জমা হয়ে আছে। পরে আবার কোনদিন বলবো খন।
অ্যাডমিন এই লেখাটা ভীষণ স্পর্শকাতর যা আমার জীবনে বাস্তব রূপে ছিল । অনুমোদন দিলে বাধিত হবো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কমল বন্দোপাধ্যায় মহুয়া রায়চৌধুরীর 37 তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতি থেকে স্মরণ করেছেন

  দমদমের বাসিন্দা কমল বন্দ্যোপাধ্যায় শিল্পীকে একদম মেয়েবেলা থেকে দেখেছেন তাঁর দাদার বন্ধু হিসেবে। গত বছরও স্মৃতিচারণ করেছিলেন আজকের দিনে তাঁ...