এক ব্যক্তির হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া কথা যিনি মহুয়া রায়চৌধুরীকে তার কৈশোর থেকে চেনেন

 কমল বন্দ্যোপাধ্যায়। শিপ্রা থেকে সোনালী, সোনালী থেকে মহুয়া হয়ে ওঠার পর্বে সে মহুয়াকে জানে  উনি স্মৃতিচারণ করছেন সেই সব সোনালী রাংতায় মোড়া দিনগুলোর :



'সত্তর আশি দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্র জগতে " ধূমকেতু " নায়িকা মহুয়া রায়চৌধুরী । মহুয়াকে নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলবেন আমি জানি। কিন্তু, আমার কাহিনীটা পুরোটাই অন্য ধাঁচের হয়ে যাবে, আমি এই বিষয়ে নিশ্চিত। দেরি না করে বলা শুরু করে দিই।

আমাদের পাঠক্রম ছিল 11+3 বছরের ডিগ্রি কোর্স। ক্লাস ইলেভেনে সরাসরি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল। ক্লাস নাইন থেকে বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও কলা বিভাগে পড়ার জন্য পাঠক্রম চালু ছিল। বিজ্ঞান ও কলা বিভাগ সব স্কুলেই মোটামুটি ভাবে পড়ানো হলেও বাণিজ্য বিভাগের লেখাপড়া সব স্কুলে সহজলভ্য ছিল না। তাই, যেসব স্কুলে নবম শ্রেণীতে বাণিজ্য ( Commerce ) বিভাগ ছিল সেসব স্কুলে নবম শ্রেণীতে কমার্স পড়তে আগ্রহী এরকম বহু ছাত্র অন্য স্কুল থেকে এসে নতুন করে ভর্তি হতো, কেননা সেসব স্কুলে কমার্স পড়ার সুযোগ ছিল না। এরকম ভাবেই আমাদের স্কুলে অন্যান্য স্কুলের বহু ছাত্র এসে ভর্তি হয়েছিল । সালটা ছিল 1969। আমি কমার্স নিয়েছিলাম । সেই বছরে অন্য এক স্কুল থেকে আসা এক সহপাঠীর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠলো, যার নাম ছিল পিনাকী রায়চৌধুরী।

পিনাকীর মা কলকাতা টেলিফোন বিভাগে চাকরি করতেন। দমদম 57 টেলিফোন এক্সচেঞ্জ কোয়ার্টারে ওরা থাকতেন। সেই পিনাকীর ছোট বোনের নাম ছিল শিপ্রা রায়চৌধুরী। ডাকনাম ছিল সোনালী। মেয়েটা ছিল ডানপিটে, নাচ করতে খুব ভালোবাসতো । বিভিন্ন জলসায় নাচের অনুষ্ঠানও করতো, সোনালী নাম দিয়েই। কেন জানি না, আমাদের চার পাঁচ বন্ধুর সঙ্গে ওর বেশ ভালো সখ্যতা গড়ে উঠলো। আমাকে " দাদা" বলে ডাকতো, আমিও একটা নামে ওকে ডাকতাম। 

1971 সালের কোনো একদিন জানতে পারলাম শিপ্রা বাংলা ছবিতে নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছে। পরিচালক তরুণ মজুমদার, ছবির নাম " শ্রীমান পৃথ্বীরাজ" । সেলুলয়েডের পাতায় শিপ্রা নাম পরিবর্তিত হয়ে হয়ে উঠলো " মহুয়া " । হলফ করে বলতে পারি, আমার সঙ্গে ওঁর করা ব্যবহারে প্রথমে কিছুটা আড়ষ্ঠতা থাকলেও পরে জলবৎ তরলম্ হয়ে উঠেছিল। রীতিমতো " তুই- তোকারি "র সম্পর্ক ছিল। 1982 সাল পর্যন্ত যথেষ্ট যোগাযোগ ছিল। দুটো ঘটনা বলি।

এক, 1973 সালের 5 মার্চ আমার উপনয়ন ( পৈতে ) ছিল। উনি ততদিনে নায়িকা হয়ে গেছেন। বলেই দিয়েছিলেন, রাতে আসবেন। রাত দশটা নাগাদ পিনাকীকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে এসে নিমন্ত্রণ রক্ষা করে গেছেন। অত রাতেও আমাদের বাড়িতে ওঁকে দেখতে লোকে লোকারণ্য। আমার মা আমাদের রান্নাঘরে ওঁকে বসিয়ে আলাদা করে খাইয়েছিলেন।

দুই, " দাদার কীর্তি " ছবির আউটডোর হয়েছিল শিমুলতলায় । ফেরার দিন খবর দেন, শুটিংয়ের গল্প শোনাবেন । আমরা চার বন্ধু সর্বপ্রথম " দাদার কীর্তি" ছবির আউটডোর শুটিংয়ের গল্প শোনার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলাম। 

বহু ঘটনা, বহু গল্পের সাক্ষী এই অধম। কত শিল্পীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে ওঁর সুবাদে। বলতে গেলে কয়েক দিনেও শেষ হবে না। দুঃখ একটাই রয়ে গেছে। ওঁর অকালমৃত্যুর পরপরই " ডাবলু"র সঙ্গে তোলা আমার চল্লিশ/বিয়াল্লিশটা ছবি আমি পাশের মাঠে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে ফেলি। মা বলেছিলেন, কি নষ্ট করলি, এখন বুঝবি না, বুঝবি সময় হলে। আজ মায়ের বলা ঐ কথাটা বড্ড বুকে বাজে।'



এই প্রসঙ্গে আমাদের কিছু প্রশ্ন আছে। কমল বাবু ছিলেন পিনাকী রায়চৌধুরীর (মহুয়া রায়চৌধুরীর বড় ভাই) বন্ধু। আমরা আশা করতে পারি যে মহুয়ার মৃত্যুর পর কমল বাবুর তার বন্ধুর সাথে যোগাযোগ ছিল। মহুয়ার মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে কমলবাবু কিছুই শুনেননি?

মহুয়ার স্বামী তিলক চক্রবর্তী আর নেই, সম্ভবত তিনি 2020 সালের সেপ্টেম্বরে মারা গেছেন। মহুয়ার বাবা আগেই মারা গেছেন। এই দুই ব্যক্তি সবই জানত কিন্তু আরও অনেকে জানে কিভাবে মহুয়ার মৃত্যু হয়েছে। মহুয়ার কাছের বেশিরভাগ মানুষ এখনও বেঁচে আছে কিন্তু মুখ খুলছে না। 'মহুয়া বিবাহিত জীবনে খুব অসুখী ছিল, মহুয়া প্রায়ই বিষণ্ণতা অনুভব করত', এইগুলি বেশিরভাগই তার সহ-অভিনেতারা বলেছেন তবে তার মৃত্যুর বিষয়ে তারা কী জানেন বা শুনেছেন তা প্রকাশ করতে কেউ প্রস্তুত নয়।

কমলবাবু হয়তো অনেক কিছু জানেন এবং একদিন সত্য বেরিয়ে আসবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কমল বন্দোপাধ্যায় মহুয়া রায়চৌধুরীর 37 তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতি থেকে স্মরণ করেছেন

  দমদমের বাসিন্দা কমল বন্দ্যোপাধ্যায় শিল্পীকে একদম মেয়েবেলা থেকে দেখেছেন তাঁর দাদার বন্ধু হিসেবে। গত বছরও স্মৃতিচারণ করেছিলেন আজকের দিনে তাঁ...