পরিচালক বীরেশ চট্টোপাধ্যায়ের এখনও মনে আছে মহুয়ার সঙ্গে তাঁর বাড়িতে শেষ দেখা। সেই মর্মান্তিক দিনে, সন্ধ্যায় বীরেশ মহুয়ার সাথে তার বাড়িতে দেখা করে। এমনকি পরের দিনের শুটিং নিয়েও কথা বলেছেন তারা। বীরেশ চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য নীচে দেওয়া হল।
শেষ ছবি বীরেশ চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ‘আশীর্বাদ’। চিত্রগ্রাহক শক্তি বন্দ্যোপাধ্যায় ক্যামেরা বন্দি করলেন মহুয়ার শেষ শট।
আকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে ফোনে বলছে, ‘‘আমি ভাল নেই, আমি ভাল নেই। তুমি এসে আমাকে নিয়ে যাও। সে কি শুধু অভিনয় ছিল?’’

মহুয়া রঞ্জিত মল্লিকের বিপরীতে অনেক ছবিতে অভিনয় করেছেন যেমন অভিমান, লাল গোলাপ,কপালকুণ্ডলা, শঠে শাঠ্যং। মহুয়াকে নিয়ে রঞ্জিত মল্লিকের অনেক স্মৃতি রয়েছে এবং অভিমান চলচ্চিত্রের শুটিং সম্পর্কিত এমন একটি স্মৃতি:
"এখনও মনে পড়ে সে দিনটার কথা। মার খেতে খেতে মাটিতে পড়ে গেছে। তবু মুখ থেকে একটা আওয়াজ বেরোয়নি সুজিত গুহ-র ছবি ‘অভিমান’-এর শ্যুটিং চলছে। ও আর আমি স্বামী-স্ত্রীর ভূমিকায়। আমি খোঁড়া। অসহায়। খানিকটা ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স থেকেই দুর্ব্যবহার করি।
একটা দৃশ্যে হাতের ক্রাচ দিয়ে মারতে মারতে ওকে মাটিতে ফেলে দিয়ে আমার ডায়লগ ছিল। শেষ হবার পর সবাই বুঝতে পারল ভয়ংকর লেগেছে ওর। আমি উত্তেজিত হয়ে বেশ জোরেই আঘাত করে ফেলেছি। শক্ত শট। তাই যাতে রিপিট না হয় সেই জন্য টুঁ শব্দটি করেনি। কী ভীষণ একাগ্রতা!
পর পর বেশ কয়েকটা ছবিতে কাজ করেছি আমি আর মহুয়া। ‘লাল গোলাপ’, ‘অভিমান’, ‘কপালকুণ্ডলা’, ‘শত্রু’, ‘শঠে শাঠ্যং’....।
দু’যুগের বেশি কেটে গেছে তবু অরণ্যবালা কপালকুণ্ডলার সরল চাউনি, তার এক্সপ্রেশন— আজও জ্বলজ্বলে আমার কাছে।
আরেকটি দৃশ্যর কথাও কোনও দিন ভোলার নয়।
![]() |
| অভিমান |
‘শঠে শাঠ্যং’ ছবিতে বাবা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। মুখোমুখি মহুয়া। দরিদ্র বেকার প্রেমিককে বলে দিতে বলছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ধনীকন্যাকে বিয়ে করবার মতো রোজগার করে তবে যেন আসে। উত্তরে মহুয়া শুধু একদৃষ্টে তাকিয়েছিল বাবার দিকে!
অস্বীকার, অভিযোগ, ব্যথা এবং প্রতিবাদের ভাষা সব মিলেমিশে সে কী দৃষ্টি। প্রতিভা না থাকলে, চারপাশকে তীক্ষ্ণ ভাবে দেখার ক্ষমতা না থাকলে অমন জিনিস অভিনয়ে আনা সম্ভব নয়।"
প্রতিবেদক গৌতম ভট্টাচার্যের সাথে একটি সাক্ষাত্কারে রঞ্জিত মল্লিক মহুয়া সম্পর্কে তার একটি দুঃখজনক স্মৃতি প্রকাশ করেছিলেন। রঞ্জিত মল্লিক বলেন যে তিনি সাধারণত শুটিং থেকে রবিবার ছুটি নিতেন। কিন্তু মহুয়া রঞ্জিত মল্লিককে রবিবার শুটিংয়ের জন্য অনুরোধ করতেন। এটি বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে এবং অবশেষে রঞ্জিত মল্লিক পরিচালকের কাছে তার অসন্তোষ প্রকাশ করেন। পরিচালক রঞ্জিত মল্লিকের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করেন। রঞ্জিত মল্লিক জানতে পেরেছিলেন যে ঘরোয়া ঝামেলার কারণে, মহুয়া প্রতি রবিবার তার বাড়ির বাইরে থাকার চেষ্টা করে।
ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে মহুয়ার প্রথম মেন্টর ছিলেন সন্ধ্যা রায়। শ্রীমান পৃথ্বীরাজ ছিলেন মহুয়ার প্রথম ছবি এবং সন্ধ্যা রায় মহুয়াকে ছাঁচে ফেলার দায়িত্বে ছিলেন, মহুয়া তখন নিছক বাচ্চা। মহুয়ার স্বভাব ছিল খুবই আকর্ষণীয় এবং সকলেরই তাকে ভালবাসত। স্বাভাবিকভাবেই মহুয়াকে সন্ধ্যা রায় ভালোবাসতেন এবং মহুয়া - সন্ধ্যা রায়ের সম্পর্ক মহুয়ার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অটুট ছিল।
মহুয়া সম্পর্কে যা বললেন সন্ধ্যা রায়
![]() |
| দাদার কীর্তিতে মহুয়া ও দেবশ্রী |
দেবশ্রী রায় বলেন, “আমরা শৈশবে জনপ্রিয় নৃত্যশিল্পী ছিলাম।” তরুণ মজুমদার তাকে শ্রীমন পৃথ্বীরাজ ছবিতে কাস্ট করেছিলেন এবং তার নাম পরিবর্তন করে মহুয়া রাখেন। বিয়ে করার সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৭। মহুয়া রায়চৌধুরী তিলক চক্রবর্তীকে বিয়ে করেছিলেন, যিনি শিশু শিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে কাজ করেছিলেন কিন্তু এরপর সিনেমায় তেমন একটা ক্যারিয়ার গড়তে পারেননি। এইভাবে মহুয়া রায়চৌধুরী তার পরিবারের উপার্জনকারী হয়ে ওঠেন। মহুয়া রায়চৌধুরী মাঝে মাঝে বিষণ্ণ থাকতেন।
দেবশ্রী রায় বলেন, "মহুয়া-দি খুব মেজাজি ছিল. কখনও কখনও তিনি অত্যন্ত হাসিখুশি এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ হতেন এবং অন্য সময় তিনি কথাও বলতেন না, আমি তার থেকে বেশ জুনিয়র ছিলাম এবং তাই সে প্রায়ই আমাকে বলত কি করতে হবে আর কি করা উচিত নয়।"
দেবশ্রী রায় একটি আউটডোর শ্যুটের কথা স্মরণ করেছেন যেখানে তিনি মহুয়া রায়চৌধুরীর সঙ্গে ছিলেন। “আমরা শিমুলতলায় শুটিং করছিলাম। সেখানে বৈদ্যুতিক সংযোগ না থাকায় আমরা একটি জেনারেটর নিয়ে গিয়েছিলাম। আমরা একটি প্রাসাদ বাড়িতে থাকতাম এবং পুরো পরিবেশটি বেশ রোমাঞ্চকর ছিল। ঠাকুরের তৈরি আশ্চর্যজনক খাবার ছিল বলে আমরা একসাথে কিছু খুব ভাল সময় কাটিয়েছি। সন্ধ্যা রায়ও আমাদের সাথে ছিলেন এবং তিনি প্রায়ই আমাদের গাইড করতেন এবং বকাঝকা করতেন।”
সুবর্ণ গোলক (1981) ছবিতেও দেবশ্রী রায় মহুয়া রায়চৌধুরীর সাথে কাজ করেছিলেন। "আমি একরকম অনুভব করেছি যে সে কখনই সুখী ছিল না," সে বলেছিল। "সে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিল কিন্তু তারপর শান্তি পায়নি। সম্ভবত সে কারণেই তার এমন মেজাজ পরিবর্তন ছিল।"
দেবশ্রী রায় মনে করেন যে তার মৃত্যুর রহস্যের সমাধান হয়নি। "প্রকৃতপক্ষে, আমরা এখনও তার মৃত্যুর সত্য সম্পর্কে অন্ধকারে রয়েছি। এটা আমাদের জন্য বেশ হতবাক ছিল. সে সময় অনেক ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন এবং শুটিংয়ে বাংলাদেশে যাওয়ারও কথা ছিল।
1983 সালে, দেবশ্রী একটি হিন্দি ছবি করেছিলেন - জাস্টিস চৌধুরী, মহুয়া বিখ্যাত মেকআপ শিল্পী অরূপ গাঙ্গুলীকে ডেকে বলেন "বুড়ো [গাঙ্গুলীর ডাকনাম], দেবশ্রী, আমাদের কলকাতার মেয়ে, বোম্বেতে একটা ফিল্ম করেছে, আপনি কি আমাকে ক্যাসেটটা দিতে পারেন?" এটা শুনে বেশ আনন্দ হয়েছিল যে পরে তারা সবাই একসাথে বসে আমার ফিল্ম দেখেছিল।
মহুয়ার সাথে শেষ দেখা হওয়ার কথাও দেবশ্রী দুঃখের সাথে স্মরণ করে। তিনি বলেন, "তাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন মানুষ মনে হচ্ছিল।" সে সময়ের অন্যান্য শিল্পীর মতো মহুয়া ওয়ান ওয়াল, যাকে এখন যাত্রা বলা হয়, অংশ নিতেন। আমি ভালোবাসা ভালোবাসা (1985) এর শুটিং করছিলাম এবং সে ওয়ান ওয়াল করছিল, যখন সেটে আমাদের দেখা হয়েছিল। আশ্চর্যজনকভাবে, তিনি নিজেই আমার মেকআপ রুমে এসেছিলেন এবং জিজ্ঞাসা করেছিলেন আমি কেমন আছি। আমি তাকে একটি আসন অফার করেছিলাম।"
তখন মহুয়া রায়চৌধুরী বলেন, তিনি বেশ বিরক্ত। দেবশ্রী কেন জিজ্ঞাসা করেছিলেন এবং তিনি উত্তর দিয়েছিলেন যে তিনি একটি যাত্রা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে হবে এবং তার পুরো মেকআপ কিটটি চুরি হয়ে গেছে এবং সেখানে তার দামী জিনিস ছিল। "তারপর তিনি আমাকে ভালোবাসা ভালোবাসায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করার জন্য অভিনন্দন জানালেন এবং হঠাৎ আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন"
"সেদিন তিনি এতটাই স্নেহশীল ছিলেন যে এটি আমার জন্য আশ্চর্যজনক ছিল কারণ বেশিরভাগ সময়ই তিনি আমার সাথে বেশ কঠোর ছিলেন," দেবশ্রী রায় বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন। "তবে, সেদিন সে আমার সাথে খুব নরম ছিল। এবং কিছু দিন পরে, আমরা দুঃখজনক খবর পেলাম!"
সে এক আষাঢ় শেষের বেলা। বিরামহীন বৃষ্টি।
দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত নার্সিং হোমের আট তলায় ৭২২ নম্বর ঘর।
ঝলসানো শরীর অস্ফুট উচ্চারণে শুধু কয়েকটা শব্দ শোনা গিয়েছিল, ‘‘আমার গোলা রইল। ওকে দেখিস।’’
না, কোনও প্যারালাল সিনেমার দৃশ্য নয়।
এ এক জীবনের দলিল।
যে জীবনের নাম মহুয়া রায়চৌধুরী।
‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’-এ ঘোড়সওয়ার হয়ে যে মেয়েটা বাংলা ছায়াছবিতে এসেছিল। সে এক আবির্ভাব যেন!
এক্কেবারে আসা, দেখা, জয় করা। তবে কিনা নিজস্বতা বজায় রেখে। তার পরই দ্রুত প্রস্থান।
ঘোর বর্ষামুখর রাতেই ভয়ঙ্কর ভাবে আগুনে পুড়ে এগারোটা দিন মৃত্যুর সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধ শেষ করে অগুনতি মানুষকে চোখের জলে ভাসিয়ে বিদায় নিয়েছিল সে।
চলে গিয়েছিল স্বামীপুত্রের ভরাট সংসার ফেলে, বাংলা চিত্রজগতের নির্দেশক প্রযোজকদের এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে।
ঠিক তার আগে প্রাণের বন্ধু মাটুর হাত ধরে সাত বছরের গোলার কথা বলে যেতে পেরেছিল শুধু।
আত্মহত্যা না হত্যা?
নাকি নিছকই দুর্ঘটনা?
এ সংশয় রয়ে গেছে আজও।
ফেরা যাক বহু যুগ আগের সেই সন্ধেবেলায়।
‘দাদার কীর্তি’। তাপস পাল প্রথম ফ্লোরে এলেন। এতটাই কাঁচুমাচু জড়োসড়ো ভঙ্গি, যে পাঁচ বছরের শিশুটিও মুখের ভাষা পড়ে ফেলেছিল।
‘‘প্রথম প্রথম সকলেরই একটু অমন হয়। পরে সব ঠিক হয়ে যায়।’’
কার আশ্বাসবাণী?
নবাগত ছেলেটি অবাক হয়ে ফিরে দেখে, বাংলা ছবির ব্যস্ততম নায়িকার মুখ!
ছবিতে মহুয়ার ছোট বোন ছিল দেবশ্রী, স্টুডিয়োপাড়া যাকে চেনে চুমকি নামে। গোপন কথা, বকাবকি, আদর, মান-অভিমান সবটা জড়িয়ে অজান্তেই কখন যেন চুমকির ‘দিদি’ হয়ে যান মহুয়া।
একবার রীতিমত মনকষাকষি। আশেপাশে যাঁরা ওঁদের জানতেন, তাঁদের আশংকা নায়িকার সঙ্গে নায়িকার এমন বিরল সদ্ভাব এ বার বুঝি আর থাকে না! কিন্তু মহুয়া তো মহুয়াই।
কখন যে ঝোড়ো হাওয়ার মতো সব উড়িয়ে দু’হাত দিয়ে ফের আগলে ধরলেন তাঁর অভিমানী ‘বোন’-কে, টেরই পাওয়া গেল না।
মহুয়ার সব নায়ক অবশ্য আজ আর তাঁর প্রতি সমান সহমর্মী নন। এঁদেরই এক জন তো মহুয়া প্রসঙ্গে লেখালেখির যথার্থতাই খুঁজে পেলেন না। প্রায় ঠাট্টা করেই উড়িয়ে দিলেন।—‘‘মহুয়া! এটা একটা বিষয় হল!’’
মহুয়াকে স্বহস্তে যাঁরা প্রায় রচনা করেছেন, তাঁদের মধ্যেও কেউ আবার ওঁর সম্পর্কে একান্তই ব্যক্তিগত স্মৃতি ‘বাজার’-এ এনে ফেলতে চাইলেন না। কেউ যেন এড়িয়ে গেলেন।
ভয়? আজও? অনিশ্চয়তা এখনও? পাছে নিশ্চিত জীবনে বেয়াড়া আঁচ়ড় লেগে যায়! কে জানে!
প্রেম ছাড়া না কোনও শিল্প হয়, না কোনও শিল্পী বাঁচে! এক রত্তি মহুয়াও প্রেমে পড়ছিল তিলকের।
কিশোরকণ্ঠী তিলক তখন স্টেজে গান গায়। কোনও এক বৈশাখের দখিন হাওয়ার দোলায়, নাকি সেই প্রহর শেষের চৈত্রের রাঙা আলোয় দেখা হয়েছিল, সে আজ সময়ের অতলান্তে হারিয়ে গিয়েছে। বাড়ির মত ছিল না। এ দিকে বাঁধা পথে চলবার মেয়ে সে যে নয়। সহায় তখন মাটু। জনগণের চোখে যিনি কিনা অভিনেত্রী রত্না ঘোষাল। উজিয়ে এলেন সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, তরুণকুমার... আরও অনেকে।
মেয়ের এই সিদ্ধান্ত বাবা মেনে নেননি। কেন নেননি? কেউ বলেন, মেয়ের সামনে তখন প্রসারিত ভবিষ্যৎ। অপরিমেয় কাঞ্চনযোগ। অতি সাধারণ মধ্যবিত্তের পক্ষে তার হাতছানি অগ্রাহ্য করা নিশ্চিত কঠিন। এ ছাড়া রঙিন পৃথিবীর কাজল যার চোখে, খ্যাতির মোহপাশ সে বড় সহজে কাটাতে পারে না।
শিপ্রা থেকে মহুয়ার যাত্রাপথের যে আয়োজন স্বহস্তে করেছিলেন, তার ‘ভাগিদার’ মেনে নেওয়া হয়তো’বা সেদিন সম্ভব ছিল না নীলাঞ্জনের। হার মানলেন জেদি মেয়ের কাছে!
তিলকদের হেদুয়ার পুরনো বাড়ি। তুলনায় সচ্ছল। ব্যাংকের চাকুরে। শুরুটা ছিল ভারী সোহাগের। তিলকের দাদা অলোক চক্রবর্তী ওঁদের দুজনকে নিয়ে প্রযোজনা করলেন ‘আনন্দমেলা’। ছবি চলল না। কিন্তু মহুয়ার ডাক আসতেই লাগল অন্য পরিচালকদের কাছ থেকে। দু’জনে মিলে উঠে এল টালিগঞ্জের বাসাবাড়িতে। অল্প বয়স। বায়োস্কোপের পাত্রপাত্রী। মাঝরাতে বাইকভ্রমণ। মদ্যপান। ফুর্তির ফোয়ারা। এরই মধ্যে এল ফুটফুটে পুত্রসন্তান।
শিশুশিল্পী হিসেবে বাদশা ছবিতে তিলকের আত্মপ্রকাশ। সুখেন দাস-এর ‘প্রতিশোধ’-এ দু’জনে একসঙ্গে অভিনয় করে। উত্তমকুমারের বিপরীতে ‘সেই চোখ’, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে ‘মাটির স্বর্গ’। ‘হার মানিনি’ উত্তমকুমারের সঙ্গে অসম্পূর্ণ ছবি। কারণ উত্তমকুমারের মৃত্যু।
প্রথম জীবনে রোগা বলে বাদ পড়েছিল ‘নয়া মিছিল’ থেকে। বুকের মধ্যে সেই তুষের আগুন নিভতে দেয়নি। তাই পৃথুলা বলে যখন তপন সিংহ ‘আদমি ঔর আউরত’ থেকে বাদ দেবেন বলে ঠিক করলেন, মহুয়া মাত্র তিন সপ্তাহ সময় চেয়েছিল। যথাসময়ে যখন তপন সিনহা তাকে দেখে, এক রকম অবাক হতেও ভুলে গিয়েছিলেন।
দামাস্কাস আন্তর্জাতিক চলচিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার জয় করে বৃত্ত যখন সম্পূর্ণ করল, তত দিনে শুধুমাত্র চন্দ্রাভ সে মুখের স্মৃতিভারটুকু রেখে পুরস্কারের পাশে ‘মরণোত্তর’ কথাটুকু বসিয়ে দিয়ে মহুয়া চলে গেছে চিরকালের মতো। সব মায়ার ও পারে।
মহুয়ার হাতে কুড়িটা ছবি ছিল তার অকালপ্রয়াণের সময়।
৩ জুলাই-এর পর বাংলাদেশ চলে যাওয়ার কথা। মমতাজ আলমের ‘ঊশীলা’ ছবির নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করবার আয়োজন সম্পূর্ণ। অপেক্ষা শুধু ভিসা পাওয়ার।
সংশয় সন্দেহ আজও - মৃত্যুকালীন জবানবন্দি নেন এনসি বন্দ্যোপাধ্যায়, ডেপুটি সুপারিন্টেন্ডেণ্ট পুলিশ, সিআইডি এবং এএন দুবে, ইন্সপেক্টর। সাক্ষী হিসেবে সই করেন দাদা পিনাকী রায়চৌধুরী এবং সিস্টার ঊষা। উপস্থিত ছিলেন রত্না ঘোষাল।
বহু সংশয়ের নিষ্পত্তি আজও হয় নি। সেই সময়কার সংবাদমাধ্যমে ধরা আছে অগুনতি পরস্পরবিরোধী তথ্য।—
মাঝরাত অতিক্রান্ত।
বাড়িতে দু’জন পরিচারক। তবু মহুয়া নিজে খাবার বা দুধ গরম করতে গেল কেন?
তিলক কিন্তু ডিনারের পরেই দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছিল। মহুয়ার কথামতো তার অসাবধানতাবশত যদি দুর্ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে বাড়িতে চারজন মানুষের উপস্থিতি সত্ত্বেও কী করে এমন ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছিল?
স্টোভ বার্স্টের একটা তত্ত্ব পরিবারের তরফ থেকে বার বার খাড়া করা হয়েছে। পুলিশ অত্যন্ত কম কেরোসিন ভরা একটি স্টোভ রান্নাঘর থেকে প্রায় অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে, যেটা কোনও ভাবে কোনও দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে বলে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি।
পিঠে এবং শরীরের আরও কয়েক জায়গায় কালশিটের দাগ পাওয়া যায় যার কোনও সদুত্তর মেলেনি।
মহুয়ার মুখের ডান দিকে একটা ক্ষতচিহ্নের বিচিত্র ব্যাখ্যা মেলে বাবার কাছে।— কোনও কাপড়ের টুকরো আটকে যায় দুর্ঘটনার সময়, যেটা টেনে তুলতে গেলে মহুয়া ব্লেড দিয়ে কেটে নিতে বলে আর তাতেই নাকি এই বিপত্তি।
প্রায় সত্তরভাগ অগ্নিদগ্ধ মানুষের পক্ষে এ কি সম্ভব?
রান্নঘর এক রকম অক্ষত। অথচ শোবার ঘরে লেপ তোষক মায় বালিশ পর্যন্ত পোড়া।
নাইটি এবং বিছানায় এত কেরোসিনের গন্ধ কোথা থেকে এসেছিল?
স্টোভ বার্স্ট করলে পিঠ, তলপেট, ঊরু এমন ভয়াবহ দগ্ধ কেন?
নীলাঞ্জনের মাত্র তিনটি আঙুলের ডগায় সামান্য চোট ছিল। তিলক অক্ষত। শুধুমাত্র খুঁড়িয়ে হাঁটছিল।
অনেকেই মনে করেছিলেন, অমন মারাত্মক আগুন থেকে বাঁচাতে গেলে এ এক রকম অসম্ভব।
পরিবারের তরফ থেকে কোনও এফআইআর করা হয়নি। শোনা যায়, তদন্ত চলার কিছুদিনের মধ্যে কোনও এক অজ্ঞাত কারণে তা বন্ধের নির্দেশ আসে!
কিন্তু কেন? আজও জানা নেই তা’ও।
চূড়ান্ত অভিযোগ
ব্যক্তিগত ভাবে মাধবী চক্রবর্তী জানান মহুয়ার মৃত্যুর অনতিকাল পরে তার বাবা স্মরণসভা আয়োজন করবার প্রস্তাব নিয়ে তাঁর কাছে আসেন। মৃত্যুর যথোচিত কারণ না জানা পর্যন্ত এ ধরনের কোনও সভায় তিনি অংশগ্রহণ করবেন না বলে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।
দশ বছর পর প্রদেশ মহিলা কংগ্রেস আয়োজিত আন্তর্জাতিক নারীদিবস উপলক্ষে মাধবী চক্রবর্তী তাঁর ভাষণে মহুয়া রায়চৌধুরীকে পুড়িয়ে মারার অভিযোগ তোলেন।
মহুয়ার ফুটবলপ্রীতি ছিল যখন ও শিপ্রা, তখন থেকে। দাদা যখন মাঠে খেলতে যেত পিছন পিছন সঙ্গ নিত ছোট বোন। মন দিয়ে খেলা দেখত মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে। কখনও খেলোয়াড় কম পড়লে নিজেই মাঠে গোল আগলে দাঁড়াত। অন্য দলের এগিয়ে আসা প্লেয়ারদের রীতিমত শির-ফোলানো গলায় শাসাত। —‘‘খবরদার! যদি আমাকে গোল দিয়েছিস। দেখে নেব, পরে।’’ কী দুর্জয় সাহস! টগবগে প্রাণ! কী নিবিড় মনের বেড়। যা আমার, তা আমারই। জীবনে-মরণে, সতে-অসতে আমি তাকে রাখব।
ইস্টবেঙ্গল হেরে গেলে মাথা কুটে কাঁদে। আর তার আবেগের আধার? সে যেন অকুল দরিয়া! অসীম, অনন্ত। যা কিছু আপন, তার জন্য জান কবুল আর মান কবুল।
পেলেকে নিয়ে কসমস ফুটবল দল এল কলকাতায়। মোহনবাগানের সঙ্গে খেলতে। ’৭৭ সাল। গড়ের মাঠে খেলা হল সেপ্টেম্বরের চব্বিশ। মায়ের জন্মদিনের দিনই ভূমিষ্ঠ হল মহুয়ার ‘গোলা’। চতুর্দিকের ‘গোল গোল’ আওয়াজের তোড়ের মধ্যে যে মায়ের কোল আলো করল, পাঁড় ফুটবল ভক্ত তার কী নাম দেবে?— ‘গোলা’।
মহুয়া নায়িকা হয়েও দর্শকের কাছের মানুষ। ওর সাধাসিধে স্বতঃস্ফূর্ত আনাগোনা চলাফেরার মধ্যে একটা আটপৌরেপনা থেকেও কোথায় যেন সে অনন্যা। তত দিনে তিলক-মহুয়া উঠে এসেছে বেহালায়। সব বিবাদ চুকিয়ে বাবাও এসে বাস করতে শুরু করেছেন মেয়ের ঘরে। কচি গোলাকে দেখভাল করতে হবে তো! কিন্তু তা’তেও জীবন সুরে বাজল কই!
দুনিয়ার সব আলো তখন মহুয়ার জন্য। আশেপাশের কেউই সেই ছটার ধারেকাছেও নেই। প্রযোজক ‘অগ্রগামী’ থেকে নির্দেশক নব্যেন্দু চট্টোপাধ্যায়, তপন সিংহ সবাই ওর কথা ভাবতে শুরু করেছেন।
ওই মায়াময় দুটো চোখ, ঝিকিয়ে ওঠা হাসি, এক ঢাল চুল, ভেসে থাকা এক পানপাতা মুখ।— সবটা মিলে যেন ঠিক মানবী নয়!
দেবলীনা এর আগেও অভিনয় করেছেন। এই ছবিতে নায়িকার গাওয়া গানের জন্য কণ্ঠ দেওয়ার পাশাপাশি তিনিও অভিনয়ে থাকছেন। পর্দায় মহুয়ার কোন বয়সের চ...